খেলা ও ধুলা

বিপিএল আতংকে কাঁপছে জি বাংলা?

নিন্দুকেরা কত কিছুই বলে। নিন্দুকেরই কাজই সমালোচনা করা। তাই বলে কি থেমে গেলে চলে?

কথাগুলো সুলায়মান সুখনের বলা কি না আমার মনে নেই। তবে যেই বলে থাকুক, এই অমর মোটিভেশনাল বাণীগুলোকে যেন অন্তরে গেঁথে নিয়েছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ তথা বিপিএল। বলা হয়ে থাকে টি২০ ক্রিকেটের আবিষ্কারই হয়েছে দর্শকদের বিনোদন দেয়ার জন্য। এই বিনোদনের প্রতিযোগিতায় সেরা নাম বলে দাবি করা হয় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ তথা আইপিএলকে। বিপিএলকে বরাবরই দ্বিতীয় সেরা বলে দাবি করা হয়। কিন্তু, আমার তো মনে হয় প্রকৃতপক্ষে ‘বিনোদন’ বিলানোর বেলায় আইপিএলেরও ওপরে বিপিএলের স্থান।

কি নেই বিপিএলে বলেন?

বুকে হাত দিয়ে বলুন তো! ভাল পিচ, হাই স্কোরিং ও টান টান উত্তেজনাকর ম্যাচ, হোম এন্ড এওয়ে ভিত্তিক ফিকশচার, ভাল মানের ক্যামেরা প্রোডাকশন, গ্যালারিভরা দর্শক, কোয়ালিটি আম্পায়ারিং, স্নিকোমিটার, হটস্পট আর ওয়ার্ল্ডক্লাস কমেন্ট্রি বাদে আর কোনকিছুর ঘাটতি কি আপনার নজরে পড়েছে?

অথচ ফেসবুক খুললেই শুধু দেখা যায় সমালোচনা আর সমালোচনা। প্রকৃতপক্ষে এই সবই আসলে হিংসে। বিপিএলের জনপ্রিয়তায় ইর্ষান্বিত মানুষের ষড়যন্ত্র! কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, বিপিএলের জনপ্রিয়তার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে জি বাংলা’র মত চ্যানেলের অস্তিত্ব!

এই আমার কথাই বলি। আগে মন খারাপ থাকলে জি বাংলায় কিংবা ইউটিউবে মীরাক্কেল দেখতাম। সেই আমিই আজকাল অবসরে বিপিএল দেখি। আমার খালা, যে বাংলা সিনেমা বলতে অজ্ঞান, সেও বিপিএল দেখে। আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের অনেকে যারা বলিউডের সিনেমার পোঁকা তাদের মুখেও সারাক্ষণ বিপিএল আর বিপিএল। এতো বিপিএল যেন কেউ জীবনেও দেখেনি!

ইংরেজি ভাষায় ‘সাসপেন্স’ বলে একটা শব্দ আছে। যার ভাল বাংলা এই মুহুর্তে আমার মনে পড়ছে না। ব্যাখ্যা করে বুঝানোর চেষ্টা করি। সাসপেন্স তৈরি করা মানে হচ্ছে দর্শকের মনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা, পরের দৃশ্যে কী হতে যাচ্ছে। এই সাসপেন্স বিবেচনায় তিন গোয়েন্দা, ফেলুদা কিংবা কাকাবাবুকেও হার মানিয়ে চলেছেন বিপিএলের আবিষ্কার টিনো বেস্ট।

মাইক হাতে তিনি যখন দুই অধিনায়ককে নিয়ে টস করতে এগিয়ে যান তখনি দুরু দুরু কাঁপতে থাকে তাদের বুক। ভাবতে থাকেন, আজ আমাদের নাম ঠিকভাবে বলতে পারবে তো? মাশরাফিকে মুশরাফা কিংবা মুশফিককে মাশফিক বলে ডেকে বরাবরই তাক লাগাতে ওস্তাদ এই টেকো মাথার ক্যারিবিয়ান।

শুধু তাই না। আজ তো তিনি নিজেকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ম্যাচের আগেই দুই অধিনায়কে পরীক্ষায় ফেলার দারুণ চিকন বুদ্ধি এঁটে নিয়ে প্রথমে ঢাকা ডাইনামাইটসে বললেন ঢাকা রাইডার্স। এরপর শুধু রংপুর বলেই ইচ্ছা করে থেমে গেলেন। তৈরি করলেন এক অনবদ্য সাসপেন্স। জী বাংলা হলে একেক করে ক্যামেরায় ধরা হতো দুই অধিনায়কের মুখ আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজোতো বাজ পড়ার শব্দ। কে বলতে পারবে? কে বলতে পারবে? শেষ পর্যন্ত ঢাকার অধিনায়ক সাকিবের মুখ থেকেই আদায় করে ছাড়লেন রংপুরের আমের বাকি অংশ, ‘রাইডার্স’!

সামান্য একটা টস। তার মধ্যেই এমন সাসপেন্স, এমন হিউমার, এমন নাটকীয়তা কি আর কোন টুর্নামেন্ট সৃষ্টি করতে পেরেছে?

কিংবা মনে করেন আদম ব্যাপারীদের কথা। তাদের ব্যাবসাও হুমকির মুখে ফেলেছে বিপিএল। একটা সময় ছিল উন্নত জীবন-যাপনের জন্য সর্বস্ব বিক্রি করে আদম ব্যাপারীদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতেন অনেকেই। সেই কাজটিকেই যেন ছেলের হাতের মোয়া কিংবা মেয়ের হাতের ললিপপ বানিয়ে ফেলছেন বিপিএলের হোস্ট আর ধারাভাষ্যকাররা।

তাই তো পাসপোর্ট-ভিসা, গ্রিন কার্ড কিংবা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির ঝামেলা ছাড়াই শিল্পীর সুনিপুণ দক্ষতায় কাগজের উপর কলমের আলগা আঁচড়ে শুভাগত হোমকে বিদেশি খেলোয়াড় ঘোষণা করছেন পিয়া আপু। কিংবা আমেরিকান বোলার আলী খানকে ঠোঁটের হালকা মোচড়ে আফগানিস্তানের নাগরিকত্ব বিলিয়ে দিচ্ছেন শামীম চৌধুরী!

সাসপেন্স নামক ক্লাইম্যাক্স যেমন আছে, তেমনি এন্টি-ক্লাইম্যাক্সেরও অভাব নেই এই বিপিএলে। সবাই যখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দেখার জন্য কারা হয় এবারের আসরের চ্যাম্পিয়ন, সেখানে মাছরাঙা টেলিভিশনের হোস্ট শ্রাবণ্য আগেই ঘোষণা করা দিলেন এবারের আসরের চ্যাম্পিয়ন। তবে অবশ্যই সরাসরি বলেননি, নিয়েছেন অভূতপুর্ব কৌশল।

রংপুর রাইডার্সকে ২রানে হারালো ঢাকা ডাইনামাইটস। তাও আবার ম্যাচের শেষ বলে। আর দর্শকদের উদ্দেশ্যে শ্রাবণ্য ছুঁড়ে দিলেন এক প্রশ্ন। যেই প্রশ্নে লুকিয়ে থাকলো অন্য এক প্রশ্নের উত্তর। বললেন, “দর্শক কী বলা যায়? এবারের আসরের ফাইনাল ছিল এটা?’

এমন আরো অনেক নতুনত্ব আর নাটকীয়তায় মোড়া বিপিএলের কারণে আজ হুমকির মুখে জি বাংলা কিংবা বলিউডের রাজত্ব। যেন বিপিএল নেশায় বুঁদ হয়ে আছে বিশ্ব। আর বিপিএল এই জনপ্রিয়তা দেখে আতংকে কাঁপছে জি বাংলা, কিংবা বলিউড অথবা সারা পৃথিবী!

এই বিপিএলে মুগ্ধ হয়ে কবি কাজী বজরুল ইসলাম লিখেছিলেন এক অমর কবিতা:

বোকার সাধ

আমি হব বিপিএলের পাখি
সবার আগে মিরপুরেতে উঠবো আমি ডাকি।
দুপুর বেলা হবার আগেই ছাড়বো টিভি জেগে,
‘হয়নি বিকেল, ঘুমো এখন’- মা বলবেন রেগে।
বলব আমি, ‘আলসে মেয়ে ঘুমিয়ে তুমি থাক,
হয়নি বিকেল- তাই বলে কি খেলা হবে না কো!
আমরা যদি না দেখি মা কেমনে বলো হবে?
বিশ্বের মাঝে সেকেন্ড সেরা, বোঝো ঠ্যালা তবে!

দেখবে জগৎ, গরম তাওয়া, উঠবে যে পিচ ফুঁড়ে
আর বেরুবে টায়ার, রবে বাউন্ডারি জুড়ে!
১১৯ বয়স, তবু বুড়িয়ে যাবার নয়
বলব আমি ‘হে পৃথিবী, দেখতে তোরা আয়!
আপন ভাইয়া বলবে হাসি, ‘জমছে ভালই, নাকি?’
বলবে সুজন, ‘সহমত ভাই, পা’দুটা দেন দেখি!’

মরা পিচে রান ছোটাবো, এইচডিতে কালো
গামিনী কাকু বলবে হেসে, ‘পিচটা কেমন, ভাল?’
বলব ‘মামা, বিদেশি আনার, সময় নাইকো আর
দেশেই দেখো বাড়তি ফলন, অশোকা আর দার।’
আনবো মোরা বিশ্বকাপই, বিপিএল কাপ দিয়ে
বিগ ব্যাশ আর সিপিএলরা দেখবে চেয়ে চেয়ে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button