অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ভারত পারে, আমরা কেন পারি না?

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর রিজার্ভ ফোর্সের গাড়িবহরে আত্মঘাতি হামলা চালিয়ে প্রায় পঞ্চাশজন সেনাকে খুন করেছে জঙ্গীরা, এই খবরটা ইতিমধ্যে পুরনো হয়ে গেছে। পাকিস্তানী জঙ্গী সংগঠন ‘জয়েশ-ই মোহাম্মদ’ এই হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতিও দিয়েছে। আত্মঘাতি হামলাকারী আদিল আহমদকে নিজেদের কর্মী বলে দাবী করে আদিলের একাধিক ভিডিওবার্তাও প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। পুরো ভারত এখন ক্ষোভে ফুঁসছে, উরি’র মতো আরেকটা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের দাবী উঠেছে সর্বত্র। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিকভাবে এখনও বড় কোন সিদ্ধান্ত নেয়া না হলেও, এই হামলার পেছনে পাকিস্তানকে সরাসরি দায়ী করছে ভারতের মানুষ, আর মোটামুটি সব জায়গাতেই পাকিস্তান এবং পাকিস্তানী পণ্য বর্জন করা শুরু হয়ে গিয়েছে।

বলিউড দিয়েই শুরু করা যাক, মুম্বাইয়ের ফিল্ম সিটির সঙ্গে পাকিস্তানীদের যোগাযোগ অনেক পুরনো। পাকিস্তানী শিল্পীরা সেই দেশভাগের সময় থেকেই ভারতীয় সিনেমায় কাজ করেছেন, গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর চাপে পাকিস্তানী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বলিউডে সুযোগ না মিললেও, রাহাত ফতেহ আলী খান কিংবা আতিফ আসলামের মতো গায়কেরা ঠিকই সিনেমায় প্লেব্যাক করছিলেন। তবে পুলওয়ামায় হামলার ঘটনায় সেখানেও সম্ভবত দাঁড়ি পড়ে গেল।

ভারতীয় টেলিভিশন এন্ড ফিল্ম ডিরেক্টর’স এসোসিয়েশনের সভাপতি অশোক পণ্ডিত জানিয়েছেন, এখন থেকে বলিউডের কোন পরিচালক, প্রযোজক বা সংস্থা পাকিস্তানী কোন শিল্পীকে নিয়ে কাজ করতে পারবেন না। এই ঘোষণায় পাকিস্তানী শিল্পীদের বলিউডে কাজ করার ব্যাপারে অফিসিয়ালি নিষেধাজ্ঞা চলে এলো। অবশ্য এমনটা যে হতে পারে, সেটা অনুমান করা যাচ্ছিল আগে থেকেই। ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষ্যে টি সিরিজের ইউটিউব চ্যানেলে পাকিস্তানী গায়ক আতিফ আসলামের একটা মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল। পুলওয়ামা হামলার ঘটনার পরপরই সেটা সরিয়ে নেয়া হয় তড়িঘড়ি করে।

নভোজিৎ সিং সিধুকে তো সবাই চেনেন। ভারতীয় জাতীয় দলের সাবেক এই ক্রিকেটার এখন রাজনীতির মাঠের পাকা খেলোয়াড়। সেইসঙ্গে ভারতীয় টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য কপিল শর্মা শো’তেও তাকে দেখা যায়। এবার সেই শো থেকে বাদ দেয়া হয়েছে তাকে। সিধুর অপরাধ, পাকিস্তানের হয়ে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। সিধু বলেছিলেন, দুই-একজনের কর্মকাণ্ডের জন্যে পুরো একটা দেশ বা জাতিকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না।

আর তাতেই আগুনে ঘি ঢালা হয়ে গেছে। চারদিক থেকে প্রবল প্রতিক্রিয়া ছুটে এসেছে, বেচারা সিধু পরে বলেছেন, তার বক্তব্যকে নাকি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল! যদিও সনি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ এতসব ঝামেলায় যেতে চায়নি, তারা সরাসরিই অনুষ্ঠান থেকে সিধুকে বাদ দিয়ে দিয়েছে, এবং সিধুর সেই বক্তব্যকেও ‘অমার্জনীয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে ভারত থেকে প্রত্যাহারের কথাবার্তা চলছে, অর্থনৈতিকভাবে বেকায়দায় ফেলার জন্যে পাকিস্তানী পণ্যের ওপরে দুইশো পার্সেন্ট বাড়তি কর আরোপ করা হয়েছে গতকাল থেকে। হাতে পরেও মারা যাবে, আপাতত ভাতে মারি- এই হচ্ছে ভারতের মনোভাব। বাড়তি কর সংযোজন করার ফলে বছরে প্রায় দুইশো কোটি ডলার লোকসান হবে পাকিস্তানের, দুইশো পার্সেন্ট কর দিয়ে পাকিস্তানের পণ্য ভারতে কিনবেই বা কে?

পাকিস্তান সুপার লীগ বা পিএসএল শুরু হয়েছে কয়েকদিন আগে। ভারতীয় টিভি চ্যানেল ডি স্পোর্টস এই টুর্নামেন্ট সম্প্রচারের দায়িত্বে ছিল, গতকাল থেকে তারা সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ভারতসহ এশিয়ার বেশকিছু দেশ থেকে এবছরের পিএসএল আর দেখা যাবে না। এমনকি ভারতীয় স্পোর্টস ওয়েবসাইট ক্রিকবাজও পিএসএলের লাইভ স্কোর আপডেট থেকে যেকোন ধরনের খবর প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনকি পিএসএল নিয়ে তৈরি করা ফ্যান্টাসী লীগও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ক্রিকবাজে!

ভাবুন তো, পঞ্চাশজন সৈন্য জঙ্গী হামলায় নিহত হলো, এই ঘটনার পেছনে পাকিস্তান রাষ্ট্র বা সেদেশের সেনাবাহিনীর মদদ আছে কিনা সেটা এখনও প্রমাণীত হয়নি; তাতেই ভারতীয়রা একজোট হয়ে পাকিস্তানকে বয়কট করে ফেলছে! অথচ ত্রিশ লক্ষ শহীদ, দুই লক্ষ নির্যাতিতা নারী আর এক সাগর রক্তের দামে স্বাধীনতা পেয়ে আমরা সবকিছু ভুলে গিয়েছি! এখনও আমরা পাকিস্তানকে ধর্মের ‘ভাই’ মনে করি, পাকিস্তানীদের সমর্থন করা উচিত নয় বললে ছাগলের মতো চিৎকার করে বলি, ‘কালার সাতে রাগনীতি মেশাবেন না!’

আমার দেশের মন্ত্রী একটা টুর্নামেন্ট জেতার আনন্দে আবেগের আতিশয্যে পাকিস্তানী খেলোয়াড়ের বগলের ভেতরে ঢুকে যান, আমার দেশের তরুণীরা ‘ম্যারি মি আফ্রিদী’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে মাঠে খেলা দেখতে যান! একাত্তরে বাঙালীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, এরকম একটা হায়েনার মৃত্যুতে এদেশে সরকারীভাবে শোক পালন করা হয়, এদেশে পাকিস্তানের সমালোচনা করলেও কারো কারো গুহ্যদ্বারে অসম্ভব জ্বালাপোড়াও শুরু হয়। নির্লজ্জভাবে তারা পাকিস্তানের পক্ষে দালালী করে যায়, ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ বীরাঙ্গনার আত্মদানের চেয়ে পাকিস্তানী ক্রিকেটাদের ফর্সা চেহারাটা তাদের বেশি আকর্ষণ করে!

আমরা উঠতে-বসতে ভারতীয়দের গালি দেই, অথচ ওদের মতো দেশপ্রেমিক যদি আমরা হতে পারতাম, তাহলে যে কি হতো সেটা ভেবেই আফসোস লাগে। পঞ্চাশ জন সৈন্যের মৃত্যুতে পাকিস্তানকে একঘরে করার সব বন্দোবস্ত ভারত করে ফেলেছে, অথচ আমরা কি নির্লিপ্তভাবে ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ বীরাঙ্গনার আত্মত্যাগের কথা ভুলে গিয়ে পাকিস্তানকে বুকে টেনে নেই!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button