অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

আমাজনের আগুন ও একজন অর্বাচীন প্রেসিডেন্ট!

ক’দিন আগে আমাজানে আগুন লাগার ঘটনায় পুরো বিশ্ব যখন উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জায়ার বোলসোনারো তখন হেসে হেসে মন্তব্য করলেন- ‘আগুন লাগায় এত উদ্বিগ্ন হবার কি আছে? জঙ্গল কমে যাওয়াই ভালো, আমাদের চাষের জন্যে কৃষিজমি দরকার, গরুর র‍্যাঞ্চ বানানোর জন্যে জায়গা দরকার। এতসব গাছপালা দিয়ে কি হবে?’ একটা দেশের প্রেসিডেন্ট যে মাথার ভেতরে গাধার মগজ নিয়ে ঘুরতে পারে, এমন অর্বাচীনের মতো মন্তব্য করতে পারে, সেটা বোলসোনারো না থাকলে জানাই হতো না।

আমাজানের ওপর বোলসোনারোর ক্ষোভ অবশ্য অনেক আগে থেকেই। আমাজানকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের শতকরা বিশ শতাংশ উৎপন্ন হয় এই রেইনফরেস্ট থেকে। পৃথিবীর মানুষ আর জীবজন্তুর বেঁচে থাকার জন্যে আমাজানের টিকে থাকাটা খুব দরকারী, আমাজান না থাকলে মানবসভ্যতা থাকবে না- এটা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কথা।

সেই আমাজানের সঙ্গে বোলসেনারোর কিসের শত্রুতা? প্রেসিডেন্ট হবার আগে এই লোক কাঠের ব্যবসা করতেন, এখন তার পরিবারের সদস্যেরা সেই ব্যবসা চালায়। আমাজান থেকে গাছ কেটে বাইরে কাঠ রপ্তানি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কামিয়েছেন বোলসেনারো, তারপর রাজনীতিতে এসেছেন, কাঁচা টাকা ঢেলেছেন, ব্রাজিলের রাজনীতিবিদদের ভ্রষ্টাচারের সুযোগ নিয়ে দেশের প্রেসিডেন্টও হয়ে গিয়েছেন। কিন্ত কয়লা ধুইলে যেমন ময়লা যায় না, সেরকমই প্রেসিডেন্ট হবার পরেও নিজের সেই ‘কাঠ ব্যবসায়ী’ রূপটা ভুলতে পারছেন না।

আগুন লাগার পরে সবাই যখন ব্রাজিল সরকারের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় অবাক হয়েছেন, তখন সাংবাদিকদের সামনে এসে বোলসেনারো হেসে হেসে বলেছেন- ‘আগে আমাকে লোকে চেইন-করাত নামে ডাকতো, এখন আমি নিরো হয়ে গেছি, আমাজনে আগুন লাগিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছি।’

হ্যাঁ, বোলসেনারো আক্ষরিক অর্থেই বাঁশি বাজানোর কাজ করেছেন। ভয়াবহ দাবানলে পৃথিবীর ফুসফুস যখন একটু একটু করে পুড়ে ছাই হচ্ছে, তখন তিনি মনের সুখে সেটা উপভোগ করেছেন। গাছপালা তার কাছে ব্যবসা, বন-জঙ্গল তার চোখে ঝামেলা, তিনি চান গাছ কেটে কাঁচা টাকা কামাতে, জঙ্গল সাফ করে চাষাবাদের জমি বানাতে।

আমাদের দেশে মন্ত্রীর পদে থাকা লোকজন ভবন ধ্বসে পড়ে হাজারো মানুষ মারা গেলে মন্তব্য করেন, অমুক দলের কর্মীরা ধাক্কাধাক্কি করায় ভবন ধ্বসে পড়েছে! কিংবা চামড়া ব্যবসায়ীরা যখন সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম পানির চেয়েও কমিয়ে ফেলে, এতিমের হক মেরে কোটিপতি হবার রাস্তা বানায়, তখন মন্ত্রীয়া বলেন- ‘বিএনপি-জামাত চামড়া নষ্ট করায় চামড়ার দাম কমে গেছে!’

ভাববেন না যে এমন অদ্ভুত লোকজন শুধু আমাদের দেশেই আছে, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট আমাদের মন্ত্রী-এমপিদের চেয়েও এক কাঠি সরেস। আমাজানে আগুন লাগার ঘটনায় তিনি সরাসরি দায়ী করেছেন আমাজান সংরক্ষণে কাজ করা এনজিওগুলোকে। বলেছেন, এসব এনজিও নাকি তার সরকারের ‘ভাবমূর্তি’ নষ্ট করতেই আমাজানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে!

এনজিওগুলোর সঙ্গে বোলসেনারোর বিরোধের মূল কারণ অবশ্যই গাছ কাটা। ব্রাজিলের সরকার আমাজানকে সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রচণ্ড উদাসীন, আর এনজিওগুলো নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে আমাজানের পরিবেশ আর সেখানকার আদিবাসীদের ওপর। বোলসেনারো চান জঙ্গল উজাড় করে গরুর খামার আর কৃষিজমি তৈরি করতে, এনজিওগুলো সেটা হতে দিচ্ছে না। আর সেকারণেই এসব সংস্থার পেছনে লেগেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট।

যাই হোক, সআরাবিশ্বেই উগ্র ডানপন্থীরা একটা জিনিসই বোঝে- ব্যবসা, পুঁজিবাদ। বোলসেনারোও তার ব্যতিক্রম নন। ব্রাজিলের প্রধান রপ্তানীযোগ্য পণ্য গরুর মাংস, আর সেকারণেই বন উজাড় করে গরুর খামার গড়ার দিকে তার যতো মনযোগ। গত দশ বছরে গরুর খামার গড়ার জন্যে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ হেক্টর জমির গাছপালা উজাড় করা হয়েছে, ধ্বংস করা হয়েছে বনাঞ্চল। ২০১৮ সালেও ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন গোমাংস রপ্তানি করেছে ব্রাজিল। আর গরুর অস্থি-মজ্জা এবং অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো ফেলা হয়েছে নদীতে, দূষিত হয়েছে পানি।

বোলসেনারোর মতো লোকেরা যতোদিন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন, ততদিন বনাঞ্চলের পরিমাণ কমতেই থাকবে, পৃথিবী হতে থাকবে বসবাসের অনুপযোগী। উগ্র চিন্তাচেতনায় বিশ্বাসী এই অমানুষেরা ব্যবসা বোঝে, টাকা বোঝে। তাদের মনে প্রকৃতির প্রতি, পরিবেশের প্রতি কোন মায়া নেই, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যে সুন্দর একটা পৃথিবী গড়ার আগ্রহ নেই তাদের কারো মধ্যে। এরা জানে না, প্রকৃতির প্রতিশোধ বড় নির্মম হয়, প্রকৃতির অভিধানে ক্ষমা বলে কোন বস্তু নেই, সেটা এরা জানে না…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button