ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আবদুর রহমান বদি: গরীবের পাবলো এসকোবার!

নারকোস দেখেছেন? পাবলো এমিলিও এসকোবার গাভিরিয়ার জীবনী অবলম্বনে নির্মিত নেটফ্লিক্সের সিরিজ। কলম্বিয়ার সবচে ধূর্ত মাদক সম্রাটের নাম পাবলো এসকোবার। কোকেন পাচারের ইতিহাসে এসকোবার ছিলেন অঘোষিত ঈশ্বর, সবচেয়ে ধনী, সবচেয়ে প্রভাবশালী, সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা একজন। আমেরিকায় কোকেন পাচারের জন্য এসকোবারের গড়ে তোলা ‘মেডেলিন কার্টেল’ ছিল মাদকের স্বর্গরাজ্য। বাংলাদেশেও কিন্ত একজন পাবলো এসকোবার আছেন, আপনারা সবাই চেনেন তাকে। কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সাংসদ এবং আবদুর রহমান বদির কথা বলছি, মিডিয়া যার নাম দিয়েছে ‘ইয়াবা গড’! এসকবার আর বদির জীবনটাকে দুই পাল্লায় রেখে মেপে দেখুন, আবদুর রহমান বদিকে ‘বাংলার পাবলো এসকোবার’ খেতাবে দিতে দু’বার ভাবতে হবে না আপনাকে!

মিলটা আরও প্রকট হয়ে উঠছে আরেকটা কারণে। এসকোবারকে যখন কোনভাবেই বাগে আনতে পারছিল না কলম্বিয়া সরকার, তখন বাধ্য হয়েই সরকারের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে একটা চুক্তি করা হয়, যে চুক্তি অনুযায়ী এসকোবারের বিচার না করে তাকে স্বেচ্ছা কারাদণ্ডের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। শোনা যাচ্ছে, আবদুর রহমান বদিও নাকি স্বেচ্ছা কারাবরণ করতে চলেছেন অতি শীঘ্রই। মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এই মাসের মাঝামাঝি সময়েই নাকি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারেন বদি!

আত্মসমর্পণের প্রাথমিক শর্ত হিসেবে বদির ৩ ভাই-বোন ও ভাগ্নেসহ পরিবারের প্রায় ২০ জন সদস্য পুলিশ হেফাজতে চলে গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ফেব্রুয়ারির ১৫ অথবা ১৬ তারিখ সাবেক সংসদ বদি ও তার ভাই দেশের অন্যতম শীর্ষ ইয়াবা কারবারি আব্দুর শুক্কুর আত্মসমর্পণ করবেন বলেও জানা গেছে।

এতদিন ধরে বদি তার পরিবারের সদস্যদের ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে এলেও, এবার অনেকটা গ্যাঁড়াকলে পড়ে নিজেই দোষস্বীকার করে ভাই-বোনদের আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বদির ভাই-বোনসহ স্বজনদের ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকর কথা স্বীকার করে নেওয়ায় এবার তাকেই আত্মসমর্পণ করতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। দেশে ইয়াবাপাচার বন্ধের জন্য ইয়াবার ‘গডফাদার’ আব্দুর রহমান বদি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা তালিকার শীর্ষ ইয়াবা কারবারি আব্দুর শুক্কুরকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে। দুবাইয়ে পালিয়ে যাওয়া আব্দুর শুক্কুর কয়েকদিন আগে দেশে ফিরেছেন আত্মসমর্পণ করার জন্যেই।

শোনা গেছে, আত্নসমর্পণের পরে দ্রুত যেন জেল থেকে মুক্ত হতে পারেন, সেই লক্ষ্যে নাকি লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন বদি, ঢাকায় বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে বলেও খবর এসেছে। দ্রুত জামিনের নিশ্চয়তা চাইছেন তিনি। তবে তার লক্ষ্য, উপজেলা নির্বাচনের পরে আত্মসমর্পণ করবেন। এই নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে চান বদি। কক্সবাজার-৪ আসনে সাংসদ এখন তার স্ত্রী শাহীনা চৌধুরী, এলাকায় নিজের আধিপত্য যাতে বিস্তৃত থাকে সেই ব্যাপারে কোন ঝুঁকি নিতে রাজী নন বদি।

এসকোবারের কাছে ফিরে যাই আবার। দাপুটে এই মাদক সম্রাট ছিলেন উত্তর আর দক্ষিণ, দুই আমেরিকার ত্রাস। শোনা যায়, নব্বইয়ের দশকে এসকোবারের সম্পত্তির মূল্যমান ছিল ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলারের! এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আর স্বর্ণ কোন ব্যাংকে রাখতেন না এসকোবার, কলম্বিয়ায় নিজের রাজকীয় ম্যানশনের নিচে সুড়ঙ্গ করে সেখানে ভল্ট বানিয়ে রেখে দিয়েছিলেন সেগুলোকে! এসকোবার প্রতিদিন যে টাকা আয় করতেন, সেগুলো একসঙ্গে করতেই নাকি আড়াই হাজার ডলারের রাবার ব্যান্ড কিনতে হতো!

দক্ষিণ আমেরিকায় তখন এসকোবার হুকুম দিলে অন্যের মাথা কেটে নেয়ার মতো লোকের অভাব ছিল না। সাসপেক্ট যে-ই হোক, কোন সমস্যা নেই! এমনকি খোদ আইনমন্ত্রী থেকে শুরু করে কল্মবিয়ার প্রেসিডেন্টকেও এসকোবার খুন করিয়েছিলেন, কারণ তার মাদক ব্যবসার পথে অন্তরায় হয়েছিলেন তারা! একটা পর্যায়ে রাজনীতিতেও এসেছিলেন এসকোবার, গরীব মানুষের জন্যে টাকা-পয়সা খরচ করে রবিনহুড টাইপের একটা ইমেজ তৈরি করেছিলেন নিজের। বিশ্বের শীর্ষ দশজন ধনীর একজন ছিলেন তিনি তখন। কলম্বিয়ায় বিশ বর্গকিলোমিটারের যে বিশাল ম্যানশনে তিনি থাকতেন, সেটা ছিল দুর্ভেদ্য এক দূর্গ। সেখানে প্রাইভেট এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে চিড়িয়াখানা- সবই ছিল!

পাবলো এসকোবার, কিং অফ কোকেন

এসকোবার যেমন দুই আমেরিকার মাদক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন, বদিও তেমনই নিজের রাজ্যে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী একজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষস্থানীয় মাদকব্যবসায়ী হিসেবে তার নাম থাকার পরেও এতগুলো বছর ধরে কেউ তার টিকিও ছুঁতে পারেনি- এই ব্যাপারটাই তো অবিশ্বাস্য! এসকোবারের সঙ্গে সরকারের বিরোধ ছিল, আর বদি তো সরকারেরই একজন হয়েছিলেন এতদিন, সংসদ সদস্য হিসেবে আইনপ্রণেতার কাজ করেছেন, অন্যদিকে নিজেই আইন ভেঙেছেন। এই কীর্তি তো এসকোবারেরও নেই! কখনও তিনি বিএনপি, কখনও আওয়ামী লীগ, তবে ইয়াবার বন্ধু তিনি সবসময়ই!

দেশের আনাচে-কানাচে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে বদির অবদানটা সবচেয়ে বেশি। টেকনাফের মানচিত্রটা একটা টানেলের মতো, মায়ানমার থেকে এখান দিয়েই বাংলাদেশে ঢোকাটা সবচেয়ে সহজ। ইয়াবার জন্মস্থান এই পার্শবর্তী দেশটা, এখান থেকে স্রোতের মতো ইয়াবা আসতে শুরু করে বদি এমপি হবার পর থেকেই। টেকনাফ হয়ে ওঠে মাদকের রাজধানী, কিংবা আলাদা একতা রাজ্য, যেখানে আবদুর রহমান বদির কথাই শেষ কথা, তার সিদ্ধান্তই শিরোধার্য্য! শতশত কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তির অধিকারী বদি এবং তার পরিবার, দাবী করেছে মিডিয়া। ইয়াবা ব্যবসাটা সংক্রামক ব্যধির মতো করে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো টেকনাফে, তারপর পুরো কক্সবাজার জেলাতেই, আর এখন পুরো বাংলাদেশে। নগর পুড়লে কি আর দেবালয় রক্ষা পায়?

আবদুর রহমান বদিকে তাই পাবলো এসকোবারের বাংলাদেশী ভার্সন বললে ভুল হবে না মোটেও। কিংবা বলা যায়, গরীবের পাবলো এসকোবার। কিন্ত গরীবের হোক কিংবা ধনীর; এসকোবার বা বদি- প্রত্যেকেই মানবসভ্যতার জন্যে বিভীষিকাস্বরূপ। কারণ তারা ইয়াবা সভ্যতা বা কোকেনসভ্যতার অগ্রদূত!

আরও পড়ুন-

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button