সিনেমা হলের গলি

ববিতা- ডাগর চোখের স্বপ্নের নায়িকার গল্প!

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সত্তর ও আশির দশকের পর্দা কাঁপানো নায়িকা ববিতা। যার পুরো নাম ফরিদা আকতার পপি। ববিতা ১৯৫৩ সালে আগষ্ট মাসে যশোরে জন্মগ্রহন করেন। বাবা ছিলেন একজন সরকারী কর্মকর্তা, মা ছিলেন ডাক্তার। ববিতার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে যশোরে। ৩ ভাই ৩ বোনের মধ্যে বড় বোন সুচন্দা ও ছোটবোন চম্পা চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান তাঁর ভগ্নিপতি এবং নায়ক রিয়াজ তার চাচাতো ভাই। ববিতার পরিবারের অনেকেই ছিলেন চলচ্চিত্র জগতের, তবুও মায়ের মতো তারও ডাক্তার হবার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি হয়ে যান বাংলা চলচ্চিত্রের ডাগর চোখের অসাধারন সুন্দর প্রতিভাবান অভিনেত্রী।

বড় বোন সুচন্দার হাত ধরে চলচ্চিত্রে আগমন তার। ১৯৬৭ সালে “সংসার” চলচ্চিত্রে শিশু চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন তার নাম ছিল সুবর্না। জহির রায়হানের “জালতে সুরজ কা নীচে” ছবিতে “ববিতা” নাম ধারন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে জহির রায়হানের শেষ পর্যন্ত ছবিতে নায়িকা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর নিজ প্রতিভাগুণে একের পর এক সাড়া জাগানো ছবি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন। তৎকালীন সময়ে তিনি ফ্যাশনের ক্ষেত্রে শহরের তরুনীদের ভীষনভাবে প্রভাবিত করেন।

১৯৭৩ সালে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত অশনি সংকেত ছবিতে অভিনয় করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হন। এ পর্যন্ত প্রায় ২৫০টি চলচ্তিত্রে অভিনয় করেছেন. উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো- 

●●●টাকা আনা পাই, এক মুঠো ভাত, অনন্ত প্রেম, নয়ন মনি, সোহাগ, বাদী থেকে বেগম, রাতের পর দিন, মিস লংকা, আলোর মিছিল, ডুমুরের ফুল, বসুন্ধরা, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, লাঠিয়াল, সূর্য গ্রহন, জন্ম থেকে জলছি, মিন্টু আমার নাম, অশনি সংকেত, রামের সুমতি, love in singapur, স্বরলিপি, তিন কন্যা, অবুঝ রিদয়, প্রতিগ্গা, প্রেমিক, মানুষে মন, নেপালী মেয়ে, চ্যালেন্জ, নিশান, নাগ পূর্ণিমা, পীচ ঢালা পথ, কি যে করি, সহ আরো অনেক ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করেছেন। ববিতার সর্বশেষ ছবি হচ্ছে ২০১৬ সালে নার্গিস আকতার এর পরিচালনায় “পুত্র এখন পয়সা ওয়ালা”। 

ববিতা, বাংলা সিনেমা, নায়িকা, গোলাপী এখন ট্রেনে

●পুরষ্কার এবং সম্মাননা- ববিতার পুরস্কার এবং সম্মাননার পাল্লাটা অনেকটাই ভারী।

●১৯৭২ সালে- জহির রায়হান পদক
●১৯৭৩ সালে- অশনি সংকেত এর জন্য জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন পুরষ্কার
●১৯৭৫সালে- বাদী থেকে বেগম(জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার)
●১৯৭৬সালে- নয়নমনি (জাতীয় চল্চ্চিত্র পুরস্কার)
●১৯৭৮ সালে- বসুন্ধরা (জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার)
●১৯৮০ সালে- বাচসাস
●১৯৮৫ সালে- রামের সুমতি(জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার)
●১৯৮৯ সালে- এরশাদ পদক
●১৯৯৬ সালে- পোকা মাকড়ের ঘর বসতি (জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার)

এছাড়াও সরকারী ও বেসরকারী অনেক সম্মাননা পান তিনি। 

ছায়াছবিতে অসংখ্য গানে তিনি অভিনয় করেছেন। পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে ববিতা বলেছিলেন নিজের লিপে তার সবচেয়ে প্রিয় গান হচ্ছে আলোর মিছিল ছায়াছবির “এই পৃথিবীর পরে, কত ফুল ফোটে আর ঝরে”। 

ববিতার প্রেম

অভিনয় জীবনে ববিতার সঙ্গে বেশ কয়েকজন নায়কের প্রেমের গুঞ্জন শোনা যায়। শুরুতে নায়ক জাফর ইকবালের সংগে ববিতার দারুন একটা সম্পর্ক ছিল, দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত বোঝাপড়াটাও চমৎকার ছিল। এরপর নায়ক সোহেল রানা সিনেমায় এলে ববিতার সাথে ভাল একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। সোহেল রানাকে অনেক বছর আগের এক টিভি ইন্টারভিউতে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলাম ববিতার প্রতি তার ভাল লাগা, ভালবাসার কথা। সেখানে তার উত্তরটাও স্পষ্টই ছিল (এ সাক্ষাৎকারটা ইউটিউবে আছে)। ‘মিন্টু আমার নাম’ ছবিটা করার সময় তাদের সম্পকটা অনেকটা কাছাকাছি হয় (নায়ক সোহেল রানা’র মুখেই শোনা অফ এয়ারে)। এই প্রেমের কারনেই জাফর ইকবাল আর সোহেল রানার মধ্যে একটা নীরব দ্বন্দ্ব ছিল। নায়ক ফারুকের সাথে ববিতার প্রেমের গুন্জন শোনা যায় (এটা ফারুক ভাই অফস্ক্রীনে বলে থাকেন, তার মুখেই শোনা)। নায়ক মাহমুদ কলিও ববিতাকে খুব পছন্দ করতেন, কিন্ত সেটা বেশী দূর এগোয়নি আর! এছাড়াও ববিতার অসংখ্য ভক্ত রয়েছে যারা এখনো ববিতাকে “স্বপ্নের নায়িকা” বলে ভাবেন!

বাস্তবের ববিতা

ববিতার প্রয়াত স্বামী ছিলেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। এক ছেলে অনিক, ইন্জিনিয়ার, কানাডাতে থাকেন। বর্তমানে ববিতা ঢাকা, কানাডাতেই আসা-যাওয়া করেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কাজে জড়িত হয়েছেন, শুভেচ্ছাদূত হয়েছেন ডি. সি .আই এর।ববিতা তাঁর অভিনয়, গ্ল্যামার, নৃত্যকৌশল সর্বোপরি স্ক্রিন পারসোনালিটির কারণে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আসনটি পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ববিতা এক উজ্জল নক্ষত্রের নাম। 

আমার কথা

ছোটবেলায় হলে গিয়ে ববিতার কোন ছবি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তারপরও মা, বড় বোনদের কাছে ববিতার গল্প শুনে শুনে নিজের মনের মধ্যে কখন যে ঠাঁই করে নিয়েছিলাম তাকে বুঝতেই পারি নি। বিটিভি-তে যখন ববিতার গান, ছবিগুলো দেখাত অপলক শুধু চেয়েই থাকতাম। পুরনো সিনেপেপার, মাগাজিন থেকে ববিতার ফটোগুলো কেটে ফেলতাম, সেগুলো পড়ার খাতায় আঠা দিয়ে সযতনে এলবাম করে সাজিয়ে রাখতাম। মনে আছে মিস লংকা ছবির “চুরি করেছো আমার মনটা” গানের দৃশ্যায়নে ববিতার পরনের ড্রেসটা বানিয়েও ছিলাম, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর মতন করে হেয়ার স্টাইল করতাম, কাজল আঁকতাম, হাসতাম, কথা বলতাম! এরপর, ২০০০ সালের কথা, তখন আমি বিটিভির নতুন ঘোষিকা হয়ে আসি। সে সময় বিটিভিতে লাইভ অনুষ্ঠান ঘোষনা করতাম। অবচেতন মনে অনএয়ারে নিজেকে সাজাতাম তারই মতন করে। এভাবে ক’দিন যেতেই অনেকের চোখে ধরা পড়ে গেলাম! পরিচিত, অপরিচিত অনেকে তখন হেসে আমাকে বলতো “তোমার সাজটা পুরাই ববিতার মতই লাগছে!”

সৌভাগ্যক্রমে সে সময় বিটিভির সৌজন্যে তাকে আমি সামনাসামনি দেখেছিলাম। সেদিন শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে!
সেই নায়িকা, আমার স্বপ্নের নায়িকা “ববিতা”! 

লেখক- বুশরা চৌধুরী কৃতজ্ঞতা- বাংলা চলচ্চিত্র ফেসবুক গ্রুপ

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button