সিনেমা হলের গলি

সাহিত্যের পাতা থেকে রুপালী পর্দার সৃষ্টিশীল এক মানুষ

১৯৫৪ সাল, ফ্রান্সে বসেছে ৭ম কান চলচ্চিত্র উৎসব। বিশ্বের সেরা সেরা সিনেমাগুলোর মিলনমেলার এই উৎসবে সেইবারের আসর ভারতীয়দের জন্য ছিল ব্যতিক্রম। প্রথমবারের মতো তাদের কোনো চলচ্চিত্র এই উৎসবের অংশীদার হয়েছে। তবে এইটুকুইতেই শেষ নয়, সবচেয়ে বড় চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছিল উৎসবের শেষদিন পুরস্কারের মঞ্চে। একের পর এক ঘোষনা হচ্ছে পুরস্কৃত সিনেমাগুলোর নাম, তখনই উচ্চারিত হলো ‘Two Acres of land’। দর্শকসারিতে উপস্থিত থাকা সিনেমার নির্মাতার কাছে স্বপ্নের চেয়েও অবিশ্বাস্য মনে হল। কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করেই অর্জন করলো সেরা আর্ন্তজাতিক সিনেমার পুরস্কার, এটা ভারতবাসীর জন্য ছিল এক অভূতপূর্ব সাফল্য। সিনেমার নাম ‘দো বিঘা জমিন’, আর এই কালজয়ী সিনেমার নির্মাতা হচ্ছেন যার হাত ধরে কান চলচ্চিত্র পুরস্কার উৎসবে ভারতীয় উপমহাদেশের নির্মাতাদের পথ সুগম হয়েছিল। তিনি ভারতের তথা হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা অগ্রজ শ্রেষ্ঠ নির্মাতা ‘বিমল রায়’।

ভারতের বোম্বের আরব সাগর পাড়ে অবস্থিত বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের নাম অধিষ্ঠিত করা এই গুণী ব্যক্তিত্বর জন্ম বাংলাদেশের ঢাকার সূত্রাপুরে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)। বুড়িগঙ্গার পাড়ে শৈশব কাটিয়েছেন। জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময় বাবার অকালমৃত্যু হওয়ার কারণে নিজেদের জমিদারত্ব ছেড়ে, পূর্ব বাংলার মাটি ছেড়ে বিধবা মা ও সাত ভাই-বোন নিয়ে পাড়ি দিলেন পশ্চিম বাংলা তথা কলকাতায়!

যতটুকু জানা যায়, ক্যামেরার প্রতি ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। তৎকালীন প্রভাবশালী প্রযোজনা সংস্থা নিউ থিয়েটার্সের হয়ে নিতিন বোসের সহকারী ক্যামেরাম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন। সেই সুবাদে কিংবদন্তি প্রমথেশ বড়ুয়ার ছায়াছবির প্রচারের জন্য ছবি তোলার কাজ পান। ১৯৩৫ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার দেবদাসের সিনেমাটোগ্রাফার ও সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে প্রতিভা। প্রায় কাছাকাছি সময়ে ত্রিশের দশকের শুরুতে ব্রিটিশ সরকারের হয়ে দুটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন, তবে পরিতাপের বিষয় এই দুটি তথ্যচিত্র কোথাও সংগ্রহে নেই। প্রমথেশ বড়ুয়ার তৎকালীন ছবি মুক্তি, মায়া, বড় দিদি তেও চিত্রগ্রাহক ছিলেন বিমল রায়।

১৯৪৪ সাল, যেই নিউ থিয়েটার্সের হয়ে কাজ করার সুবাদে স্বপ্ন দেখেছিলেন নির্মাতার হওয়ার, সেই স্বপ্ন অবশেষে এই প্রযোজনা সংস্থা থেকেই নির্মাণ করলেন নিজের প্রথম সিনেমা ‘উদয়ের পথে’। বাংলার ছেলে বাংলা সিনেমা দিয়েই যাত্রা শুরু করেছিলেন এই নির্মাতা। তৎকালীন স্বাধীনতাকামী ব্রিটিশ ভারতে এই সিনেমাটি বেশ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল,খুব প্রশংসিত হয়েছিল। এর ঠিক পরের বছর নির্মাণ করেন প্রথম হিন্দি সিনেমা ‘হামরাহি’৷ স্বাধীনতার পর নিউ থিয়েটার্সের প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে থাকে, এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। তখন অশোক কুমারের পরামর্শে যোগ দেন মুম্বাইয়ের বিখ্যাত বোম্বে টকিজে। এই সংস্থা থেকে নির্মাণ করেন ‘মা’। সেই সময় উনার সাথে বোম্বে পাড়ি জমিয়েছিলেন সলিল চৌধুরী, হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়, শচীন দেব বর্মনরাও। এদের সবাই বিমল রায়ের সিনেমাতে নানা বিভাগে নিজেদের মেধার প্রমাণ দেখিয়েছিলেন।

১৯৫৩ সাল ছিল বিমল রায়ের ক্যারিয়ারের অন্যতম বিশেষ বছর। দর্শক থেকে সমালোচক সবার কাছে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার বছর। শরৎসাহিত্য নিয়ে উনার অনুরাগ ছিল প্রবল, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস ‘পরিণীতা’ নিয়ে বানালেন নিজের চতুর্থ ছবি। অশোক কুমারের প্রযোজনায় এই ছবিটি ছিল তৎকালীন সময়ের বেশ বড় বাজেটের সিনেমা। অশোক কুমারের পাশাপাশি ললিতা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মীনা কুমারী। ঠিক সেই সময়েই নিজেই প্রযোজনা সংস্থা খুলে বসেন, স্বল্প পরিসরে একটি সিনেমা বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। ইতালির বিখ্যাত সিনেমা ‘বাইসাইকেল থিফস’ দেখে তিনি এই সিনেমাটি বানানোর অনুপ্রেরণা পান। উনার খুব কাছের মানুষ সলিল চৌধুরীর ছোট গল্প ‘রিক্সাওয়ালা’ অবলম্বনে সিনেমা নির্মানে হাত দেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা দুই বিঘা জমির নাম থেকে অনুপ্রানিত হয়ে সিনেমার নাম দেন ‘দো বিঘা জমিন’। অভিনয়শিল্পী হিসেবে নির্বাচন করলেন বলরাজ সাহনি ও নিরুপা রায়। পরিণীতা সিনেমার শূটিং এর ফাঁকে ফাঁকে বানাতে থাকেন এই ছবি। যথাসময়ে পরিণীতা মুক্তি পেল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে দর্শক আনুকূল্য পায় নি। অন্যদিকে ‘দো বিঘা জমিন’ মুক্তির পর নতুন ভাবে উচ্চারিত হতে লাগলো বিমল রায়ের নাম। ভারতের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে যুক্ত হলো এক দারুন শৈল্পিক সিনেমা। মুক্তির পরের বছরেই ছবিটি জায়গা পেল কান চলচ্চিত্র উৎসবে,প্রথম অংশগ্রহণেই জিতে নিল পুরস্কার। এছাড়া ইতালি সহ বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল। আর্ন্তজাতিক সম্মাননার রেশ কাটতে না কাটতেই জাতীয় পুরস্কার পেয়ে গেলো ছবিটি,বিমল রায় হলেন পুরস্কৃত। ফিল্মফেয়ারের প্রথম আসরেই পেলো সেরা ছবির সম্মান। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে ‘দো বিঘা জমিন’ স্থান করে নিল কালজয়ী সিনেমার তালিকায়।

১৯৫৪ সালে আবার শরৎ সাহিত্য নিয়ে সিনেমা বানান ‘বিরাজ বহু’,কামিনী কুশলের অভিনয়সমৃদ্ধ এই সিনেমাও জাতীয় পুরস্কারে সেরা সিনেমার সম্মান পায়,একই বছর নির্মাণ করেন বাপ-বেটি ও নৌকরি নামে দুটি সিনেমা,তবে এই দুইটি সিনেমা সেভাবে আলোচনায় আসেনি।

যেই প্রমথেশ বড়ুয়ার সিনেমার ক্যামেরার পেছনে কাজ করার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন,তার ঠিক বিশ বছর পর তিনি নিজেই সেলুলুয়েডের পর্দায় তুলে ধরলেন শরৎ সাহিত্যের অমর সৃষ্টি ‘দেবদাস’। বিমল রায়ের নিপুণ দক্ষতায় দীলিপ কুমার হয়ে উঠলেন সমগ্র ভারতের সেরা দেবদাস,সঙ্গে পার্বতী রুপে বেছে নিয়েছিলেন বাংলার মহানায়িকা সুচিত্রা সেন কে,তখন অবশ্য তিনি নবীন ছিলেন,চন্দ্রমুখী চরিত্রে বৈজয়ন্তীমালার অনবদ্য অভিনয় দর্শকরা এখনো মনে রেখেছে। ছবিটি জাতীয় পুরস্কার ও পেয়েছিল। ২০০৫ সালে ইন্ডিয়া টাইমসের জরিপে সেরা ২৫ সিনেমার তালিকায় রেখেছিল বিমল রায়ের এই কালজয়ী সৃষ্টিকে।

কথিত আছে,মুম্বাইয়ে বিমল রায়ের গ্রহনযোগ্যতা ভালো চোখে দেখতেন না বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক। বিমল রায় উনার কাছে গল্প চাওয়ায় পুর্ণজন্ম নিয়ে একটি সাধারণ গল্প দিয়েছেন। কিন্তু এই সাধারণ গল্পই বিমল রায়ের দক্ষ চিত্রনাট্যে হয়ে উঠলো এক অসাধারণ চলচ্চিত্র। সিনেমার নাম ‘মধুমতি’। দিলীপ কুমার,বৈজয়ন্তীমালা অভিনীত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই সিনেমার গ্রহনযোগ্যতা ষাট বছর পরেও সকল সিনেমাপ্রেমীদের জানা,ক্ল্যাসিক সিনেমা হিসেবে পেয়েছে বিশেষ মর্যাদা। মধুমতি ছবিটি তখন ৯ টি শাখায় ফিল্মফেয়ার পেয়ে রেকর্ড করেছিল।

ভারতে চরম শ্রেণীবৈষম্যের বিরুদ্ধে বিমল রায়ের জাগরনী সিনেমা ‘সুজাতা’,অভিনয় করেছিলেন নূতন ও সুনীল দত্ত। দো বিঘা জমিনের পর আবার বিমল রায়ের কোনো ছবি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল। নিজের আগের সিনেমাগুলো থেকে বেরিয়ে এসে নতুন ভাবনায় সিনেমা বানালেন ‘পরখ’,১৯৬০ সালের এই ছবিতে তিনি অর্থলোভ নিয়ে দারুন এক স্যাটায়ার সিনেমা বানিয়েছিলেন,এই ছবির বিষয়বস্তু এখনো সমকালীন। হিন্দি সিনেমার সাফল্যের মাঝেও নির্মাণ করেছেন বাংলা সিনেমা ‘নদের নিমাই’,ছবিটি বেশ আলোচিত ছিল। উত্তম-সুচিত্রার মাইলস্টোন ছবি সাগরিকার হিন্দি রিমেক ‘প্রেমপত্র’ বানিয়েছিলেন,তবে ছবিটি চলেনি।

বিমল রায়ের পরিচালনায় সর্বশেষ সিনেমা ‘বন্দিনী’,মুক্তি পায় ১৯৬৩ সালে। জরাসন্ধর গল্প ‘লৌহ কপাট’ অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিটিকে বেশিরভাগ চিত্রসমালোচক ই বিমল রায়ের সেরা ছবি হিসেবে বিবেচিত করেন। সুজাতার নূতন কে এই বন্দিনীর মাধ্যমে নতুন ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন,নূতন ও নিজেকে দারুণ ভাবে বিকশিত করেছিলেন,সঙ্গে ছিল শচীন দেব বর্মনের যথাযথ সঙ্গীত আয়োজন।

বিমল রায়ের প্রযোজনায় ১৯৬৪ সালে ‘বেনজীর’ নামে সিনেমা নির্মিত হয়েছিল,পরিচালক এস খলিল। এছাড়া ‘কাবুলিওয়ালা’ সহ বিভিন্ন ছবি প্রযোজনা করেছেন। এই ছবিগুলোর পাশাপাশি তৎকালীন সময়ে বিমল রায় তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন- Immortal Stupa (1961), Life and Message of Swami Vivekananda (1964) I Gautama The Buddha (1967) তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসমাপ্ত থেকে গেছে- Amrit Kumbh I The Mahabharata|

বিমল রায় আরো কিছু তথ্যচিত্র বানাতে চেয়েছিলেন তারমধ্যে পলাশির যুদ্ধ, শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের জীবনী, নেহরুর ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ ও রামায়ণ-কে নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে জয়েন্টভেঞ্চার সহ কালকূটের ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ থেকে তারাশংকরের ‘মহাশ্বেতা’ কাহিনী নিয়েও ছবি বানানোর প্রবল ইচ্ছা ছিল।

দো বিঘা জমিন,বিরাজ বহু,দেবদাস,মধুমতি,সুজাতা,বন্দিনী এই সিনেমাগুলো জাতীয় পুরস্কারে সেরা ছবি হয়েছিল,ফিল্মফেয়ারে উনার ছবিগুলোর থাকতো জয়জয়কার। স্বয়ং উনি নিজেই দুইবার হ্যাটট্টিক সহ মোট সাতবার পরিচালক হিসেবে ফিল্মফেয়ার পেয়েছিলেন,যা আজ পর্যন্ত কেউ পারেন নি। মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের প্রথম আসরর জুরি বোর্ডের সদস্য ছিলেন। ভারতের চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির সভাপতি ছিলেন।

১৯০৯ সালের আজকের এই দিনে অর্থাৎ ৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন,আজ উনার ১১০ তম জন্মবার্ষিকী। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে ১৯৬৬ সালের ৮ই জানুয়ারি তিনি ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। আর বেশকিছু বছর আয়ুষ্কাল পেলে হয়তো আমরা বেশ সংখ্যক নন্দিত ও সমাদৃত সিনেমা পেতাম।

বিমল রায়ের মৃত্যুর পর ভারতের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় উনার সম্পর্কে বলেছিলেন ” বিমল রায়ের চলচ্চিত্র জীবন শুরু কলকাতায় ক্যামেরাম্যান হিসেবে। পরবর্তী ৩০ বছর তিনি সঁপে দিয়েছিলেন ভারতীয় সিনেমায়। একটি অতি সাধারণ গল্পটিকেই তিনি রূপ দিয়েছেন ফিল্মি আঙ্গিক ও বাঙালির আবেগে। সবচেয়ে কম সময় মুম্বাই ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে একের পর এক বিখ্যাত বিখ্যাত সিনেমার জন্ম দিয়েছেন তিনি। একেই বলে বাঙালি। বিমল রায় বাংলা গল্প ও উপন্যাসের স্বাদ তিনি বহু অবাঙালির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন হিন্দি ছবির মাধ্যমে।”

বলিউডের প্রেমী তথা উপমহাদেশের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে তিনি চিরঅমর হয়ে থাকবেন উনার সৃষ্টিশীল কর্মের মাধ্যমে। বিনম্র শ্রদ্ধা। 

Facebook Comments

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button