মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

আমাদের এই বাজে স্বভাব কোনদিন যাবে না…

পরিচিত এক বড় ভাই কিছুদিন আগে ইউরোপ থেকে এলেন, বিমানের ট্রানজিট ছিল কাতারে। দেশে আসার পরে এই কথা সেই কথায় বিমান ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা উঠলো। বড় ভাইটি তখন নির্দ্বিধায় নিজের মতামত জানিয়ে দিলেন- বিমানে উঠলে বাংলাদেশীদের মতো অসভ্যতা বোধহয় আর কেউ করে না! কথাটা এর আগেও কয়েকজনের কাছে শুনেছি, হয়তো খানিকটা ভিন্ন সুরে। সেই অসভ্যতার আরও একটা দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো কয়েকদিন আগেও। লণ্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্ট থেকে সিলেট হয়ে ঢাকা আসার সময় এক উচ্ছৃঙ্খল যাত্রীকে তো দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল সিটের সঙ্গে! মদ্যপান করে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে ঝামেলা করছিল সেই লোক, এক যাত্রীর গায়েও হাত তুলতে দেখা গেছে তাকে!

গত ৪ জানুযারি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২০২ ফ্লাইটে এই ঘটনা ঘটে। বিমানটি লন্ডন থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় আসছিল। ওই যাত্রীর নাম-ধাম-পরিচয় জানা না গেলেও, ভিডিওতে তার কথোপকথন শুনে ধারণা করা হচ্ছে তার বাড়ি সিলেটে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের নাগরিক বলে মনে হয়েছে তাকে।

মোবাইলে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, ওই যাত্রী মাতালের মতো আচরণ করছেন। তিনি মদ্যপ বলেই দাবী অন্যান্য যাত্রীদের। বাকীদের সঙ্গে অযথাই তর্কে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি, এক যাত্রীর গায়ে তো হাতও তুলেছেন! তখন বাধ্য হয়েই বিমানটিতে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে মোটা রশি দিয়ে সিটের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন। পরে বিমানটি সিলেটে অবতরণের পরে সেই মাতাল যাত্রীকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।

এটা তো কেবল একটা ঘটনা, এরকম শত শত উদাহরণ আছে। আরেকটা ঘটনার কথা উল্লেখ করি। সিঙ্গাপুর/থাইল্যান্ড থেকে ঢাকায় আসার পথে বিমানের ভেতরে এক এয়ার হোস্টেজকে বাজে ইঙ্গিত করেছিল বাংলাদেশী দুই যাত্রী। ওই ভদ্রমহিলা প্রথমে পাত্তা দিতে চাননি, কিন্ত মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পরে কমপ্লেইন করেছেন বিমানের কর্তৃপক্ষের কাছে।

প্লেন তখনও টেক-অফ করেনি, এয়ার হোস্টেজের সেই অভিযোগের খানিক বাদেই এয়ারপোর্ট থেকে চার-পাঁচজনের একটা দল এসে ঢুকলো বিমানের ভেতরে। চ্যাংদোলা করে নামানো হলো সেই দুই যাত্রীকে। এই দুজনকে ছাড়াই ঢাকার পথে উড়লো বিমান। এই কালপ্রিটদের কপালে পরে কি শাস্তি জুটেছিল, সেটা জানা যায়নি।

আর বিমানকে পাবলিক বাস বানিয়ে ফেলার পুরনো সেই স্বভাব তো আমাদের আছেই! সিট নির্ধারিত থাকার পরেও সেটা নিয়ে কাড়াকাড়ি, বাথরুম নোংরা করে ফেলা, বিমানের ভেতরে সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করা, উচ্চস্বরে কথা বলা কিংবা মোবাইলে গান বাজানো, বাথরুমের সাবান-তোয়ালে গায়েব করে দেয়া, প্লেনের করিডোরে হেঁটে বেড়ানো, আরও কত কি! প্লেন অবতরণ করার আগে থেকেই নেমে যাওয়ার জন্যে তাড়াহুড়া শুরু করা- এসব আমরাই করি, মোটামুটি শিল্পে পরিণত করে ফেলেছি আমরা এই ব্যাপারগুলোকে।

কিছুদিন আগে আরেক ভিডিওতে দেখলাম, বিমানের ভেতরে দুই বাংলাদেশী একে অন্যকে ইচ্ছেমতো গালাগাল দিয়ে যাচ্ছেন, নিজেদের আঞ্চলিক ভাষায়। কে কত বেশি গালি জানেন, সেটারই প্রদর্শনীতে নেমেছিলেন তারা। অন্যান্য যাত্রীরা হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে ছিলেন তাদের দিকে। গালি দেয়া যাত্রীদের অবশ্য এত ভাবনা-চিন্তা নেই, তারা নিজেদের মনের সুখে গালির তুবড়ি বইয়ে দিতেই ব্যস্ত! কিন্ত কি লাভ হচ্ছে এগুলো করে? দুর্নাম আর অপমান ছাড়া আর কিইবা জুটছে কপালে?

লণ্ডন থেকে ঢাকা তো বড়জোর বারো-চৌদ্দ ঘন্টার যাত্রা, এই সময়টায় মদ না খেলে খুব বেশি অসুবিধা হয়ে যায়? বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে তো মদ পরিবেশনও করা হয় না, এই যাত্রী তো নিজের ব্যবস্থাতেই মদ্যপান করেছেন! তারপরে করেছেন অসভ্য আচরণ। কমনসেন্স নামের একটা জিনিস দুনিয়াতে আছে, সেটা নিজ গরজে নিজের ভেতরে কেউ ইনস্টল করে না নিলে জোর করে কেউ ঢুকিতে দিতে পারে না। আমাদের মধ্যে এই জিনিসটারই বড্ড অভাব!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button