রকমারিরিডিং রুম

বইমেলায় ‘সততা’ স্টল প্রথমবার, নেই কোনো বিক্রেতা!

বই পড়লে নাকি মানুষের মন উদার হয়, মানুষের নৈতিক ভিত্তি শক্ত হয়। যারা বই পড়েন, তাদের মন মানসিকতা অন্যদের চেয়ে উন্নততর হয়। আর বইপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা, উৎসবের স্থল তো আমাদের ঐতিহ্যবাহী বইমেলা। এবার এই মেলাতেই অভিনব একটি স্টল আছে, যে স্টলে নেই কোনো বিক্রেতা। পাঠকরা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেরা বই দেখবেন, পছন্দ করবেন, মূল্য হিসেব করে সেটা পরিশোধ করে চলে যাবেন। মানুষের মধ্যকার সততা, নৈতিকতার ভিত্তিকে মজবুত করতেই এই ধরণের উদ্যোগ।

আমরা অনেকে এই ধরণের উদ্যোগের নাম শুনেছি। দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষত স্কুলে সততা স্টোর নামক কিছু দোকানের খবর হয়ত কারো অজানা নয়। এসব দোকানে কোনো বিক্রেতা থাকে না। ক্রেতারা নিজেরা সৎ থাকেন, সততার পরীক্ষা দিয়ে তারা দ্রব্য কিনে মূল্য পরিশোধ করেন নিজেদের মতো। বইমেলায় এ ধরণের উদ্যোগ অবশ্য এবারই প্রথম। বিদ্যানন্দ প্রকাশনী নামক একটি প্রকাশনী এবারের বইমেলায় বিক্রেতাবিহীন এই স্টলটি দিয়েছে।

সততা স্টোর, বইমেলা, বিদ্যানন্দ প্রকাশনী

বিদ্যানন্দ প্রকাশনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, “৭০০ এর অধিক স্টল দিয়েছে দেশের নামীদামী প্রতিষ্ঠানগুলো। তাঁদের তুলনায় আমরা খুবই নগণ্য, হয়তো শেষদিকেই থাকবো বেচাবিক্রিতে। তবুও আমাদের সে ছোট স্টলটি আলোড়ন তৈরি করে নিয়েছে পুরো বাংলাদেশে। মানুষকে কিভাবে বিশ্বাস করতে হয়, কিভাবে অনুপ্রানিত করতে হয় সেটাই শিখতে দর্শনার্থীরা আছে আমাদের স্টলে।”

মানুষও আসলে বিশ্বাসের প্রতিদান দিচ্ছে। সততার পরীক্ষায় সকলেই উর্ত্তীণ। এই স্টলের সামনে গেলেই আসলে নজরে পড়ে অভিনব কিছু দৃশ্য। এই প্রসঙ্গে বিদ্যানন্দ প্রকাশনীর ফেসবুক পেজে বলা হয়, “এক হাজার টাকার জাল নোট নিয়ে নয়শ টাকার ভালো নোট নিয়ে হাঁটা ধরলেন এক ক্রেতা। এমনটা হবে ভয় পাচ্ছিলাম। না, একজনও সে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আসেননি, জাল নোট কিংবা বেশী খুচরা কেউ নেননি, উল্টা কেউ ছেড়ে দিলেন ভাংতি টাকাগুলো। কেউ কেউ অনেকটুকু হেঁটে খুঁজে খুঁজে স্টলে এসেছেন, অভিজ্ঞতা নিয়েছেন ভিন্ন স্বাদের কেনাকাটায়, বিশ্বাসের অনন্দটুকু।” 

উল্লেখ্য, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন বরাবরই সামাজিক সংগঠন হিসেবে ভিন্নধর্মী কাজ করে গেছে। ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশ। সারা দেশের আটটি এলাকায় এই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ‘এক টাকার আহার’ বিতরণ করা হয়। যারা খাবার খেতে পায় না, অসহায়, দুস্থ, পথশিশুদের খাবার দিয়ে থাকে বিদ্যানন্দ। কিন্তু তারা যেন এটাকে ভিক্ষাবৃত্তি না ভাবে, এজন্যে খাবারের মূল্য রাখা হয় ‘এক টাকা’। শুধু তাই নয়, এরপর এই শিশুদের শিক্ষা দেয়ার কাজটিও করে থাকে ফাউন্ডেশনটি। প্রথমদিকে দেখা যেত যারা খাবার খেতে আসত, এই শিশুরা অনেকেই অর্থ পরিশোধ করত না। হয়ত তারা মনে করত এক টাকা দিলেই কি, না দিলেই কি! কিন্তু, একটাকার সততাও যে অনেক বড় সততা এই বিষয়টি বিদ্যানন্দ ধীরে ধীরে তাদের বুঝিয়েছে। এরপর থেকে তাদের কাছে টাকা না থাকলেও পরে এসে হলেও তারা পরিশোধ করে। বিদ্যানন্দ পরে তাদের স্কুল, কোচিংয়ে সততা স্টোর চালু করে যেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা উপকরণ কিনে নিজেরা অর্থ পরিশোধ করে রেখে যায়।

সততা স্টোর, বইমেলা, বিদ্যানন্দ প্রকাশনী

এই ফাউন্ডেশনের প্রকাশনী বিদ্যানন্দ। এই প্রকাশনীর বইয়ের বিক্রয়লব্ধ অর্থও সামাজিক সেবায় ব্যয় করে থাকেন তারা। এই প্রকাশনী শিশুদের নিয়ে বই প্রকাশের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক, জনরাভিত্তিক অন্যান্য বইও প্রকাশ করে থাকে। সততার চর্চাকে এবার তারা এই প্রকাশনীর স্টলের মাধ্যমেই বইমেলাতেও নিয়ে এসেছে! বিখ্যাত লেখক নাজিম উদ দৌলা, যার মৌলিক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘ব্রিজরক্ষক’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৭ সালে বিদ্যানন্দ প্রকাশনী থেকেই, তিনি বলছিলেন, ‘বিদ্যানন্দ এক অন্যরকম ভালোবাসার নাম। আর বাকিদের সাথে বিদ্যানন্দের তফাৎ, ওরা স্রেফ চমক দিয়েই থেমে যায় না। প্রতিটা কার্যক্রমই এগিয়ে নিয়ে যায় সামনের দিকে। একটি প্রকাশনী থেকে বই কিনছেন এমন সততা আর বিশ্বাসের প্রয়োগের মাধ্যমে, তারপর সেই টাকাও চলে যাচ্ছে মানুষের উপকারেই! এরচাইতে অসাধারণ আর কী হতে পারে!’ 

বইমেলায় অনেকেই গিয়েছেন, অনেকেই যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন হয়ত সামনে। তারা অবশ্যই একবার ঢুঁ মারতে পারেন এই ব্যতিক্রমধর্মী বইয়ের স্টলটিতে। আমাদের দেশে মানুষের সততার কিছুটা অভাব তেমনি মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসেরও অভাব। বিদ্যানন্দ প্রকাশনীর এই আয়োজন এই অভাবটা দূর করতে একটু হলেও ভূমিকা রাখবে। এই স্টলের মাধ্যমেই প্রমাণ হচ্ছে যে, মানুষকে বিশ্বাস করাটা খারাপ কিছু নয় এবং সব মানুষ অসৎ নয়। বরং, বেশিরভাগ মানুষই সৎ এবং ভাল কিছুকে তারা সুযোগ পেলে গ্রহণ করতে পারে..

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button