অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের চিকিৎসক সমাজের যা শেখার আছে!

কদিন আগের কথা। মাশরাফি একটি হাসপাতাল পরিদর্শন করতে গিয়ে অন ডিউটিতে পাননি চিকিৎসককে। ফোন দিয়ে তিনি সেই চিকিৎসকের কাছে জবাবদিহিতা চেয়েছিলেন। এই ঘটনায় অনেকে মাশরাফির প্রশংসা করলেও চিকিৎসক সমাজের একটা বড় অংশ ক্ষেপে গিয়েছিল। সত্যি বলতে ঢালাওভাবে চিকিৎসক সমাজের সমালোচনা করতে পারলে অনেকের হয়ত ভাল লাগে। সব সমালোচনার হয়ত ভিত্তিও থাকে না। তবে একথা সত্য যে, আমাদের চিকিৎসক সমাজের প্রতিনিধিত্বকারীদের কেউ কেউ মাঝে মধ্যে সমালোচনা এবং অভিযোগের প্রেক্ষিতে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকেন। বিশেষ করে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে কর্মবিরতি পালন করার মতো কর্মসূচি যখন তারা দেন, সেটা খুব ভাল দৃষ্টান্ত না আসলে।

এছাড়া সরকারি হাসপাতালে যখন ডিউটিতে থাকবার কথা তখন অনেককেই খুঁজে পাওয়া যায় না, অথচ মানুষ অনেক আশা করে তাদের কাছে আসেন। চিকিৎসকদের ভূমিকা কিন্তু অনেক বিশাল। তাদের এই পেশাটির মাহাত্ম্য অনেক গভীর। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং। যিনি চিকিৎসক পেশা থেকে রাজনীতিতে এসেছেন, তিনি এই পেশাটাকে এতটাই ভালবাসেন যে, এখনো তিনি এই কাজ ছাড়েননি। রাজনীতি, প্রধানমন্ত্রীত্ব এসবের বাইরেও তিনি প্রতি সপ্তাহে একদিন সময় রাখেন। সেদিন তিনি পুরোপুরি চিকিৎসক বনে যান। ভদ্রলোক বাংলাদেশে এসেছিলেন কিছুদিন আগে। তার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে আসলে।

১। তিনি বাংলাদেশে যখন এসেছিলেন তার ময়মনসিংহ মেডিক্যালে পড়ার সময়কার স্মৃতিচারণ করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, তিনি কিভাবে পড়াশুনা করতেন। ডাক্তারি লাইনের পড়াশুনা এমনিতে বেশ কঠিন। তিনি তাই যেদিন যে টপিক পড়ার তারিখ, সেদিন তিনি আগেই বিষয়টা নিজে পড়ে আসতেন। ক্লাসে আবার ডিসকাশন করতেন বন্ধুদের সাথে। বাংলাদেশি ছাত্র যারা মেডিক্যালে পড়ছেন, তারা এমনিতেই কঠোর প্রক্রিয়া ও পরিশ্রমের মধ্যে পড়াশুনা করেন। তবুও, অন্যদের চাইতে নিজেকে এগিয়ে রাখতে তারা লোটে শেরিংয়ের পড়াশুনা কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা গ্রহণ করতে পারেন।

২। লোটে শেরিংয়ের একবার এপেন্ডিসাইটিস হয়। তখন ডাক্তার এবং প্রফেসর খাদেমুল ইসলামের কথা তাকে ভীষণ মুগ্ধ করেছিল। খাদেমুল ইসলাম বলেছিলেন, “আমি তিনশো-চারশো এপেন্ডিসাইটিস অপারেশন করেছি। বাবা তোমার ভয় নেই। তোমার বাবা মা দূরদেশে থাকে। তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে আমাদের কাছে। তুমি পুরোপুরি নিরাপদ আমাদের হাতে।”

image courtesy- Dhaka Tribune

ডাক্তারদের কাছে রোগীর সবচেয়ে প্রত্যাশা কি থাকে আসলে? আমার ধারণা একজন ডাক্তারের প্রধান কাজ রোগীকে সাহস দেয়া, রোগীকে অভয় দেয়া যে তিনি রোগীর পাশে আছেন। আমাদের দেশে যারা ডাক্তারি পেশায় আছেন, আসতে চান তারা এইদিকটা একটু খেয়াল রাখলে কি দারুণ ব্যাপার হবে। খাদেমুল ইসলামের এই ব্যাপারটি পরবর্তীতে নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন লোটে শেরিং।

৩। লোটে শেরিংয়ের কথা হলো, একজন রোগী যখন একজন ডাক্তারের কাছে আসেন ওই এক দুইবারের অভিজ্ঞতা দিয়ে সারাজীবন সেই ডাক্তারকে তিনি স্মরণ রাখেন। তাই রোগীকে সাধ্যের সেরাটুকু দিয়ে সেবা দেওয়া উচিত। আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালে অনেকসময় রোগীকে অবহেলা করার যেসব খবর আমরা পাই, সেটা আসলে ডাক্তারি চেতনার সাথে যায় না। লোটে শেরিংয়ের ফিলসফি থেকে তাই আমাদের ডাক্তারদের এই জায়গাটায় শেখার আছে অনেককিছু।

৪। ডাক্তারদের জন্য লোটে শেরিং খুব সহজ একটা ফর্মুলা দিয়েছেন। তিনি কাউকে আকাশছোঁয়া গল্প শুনাননি, তিনি বলেননি তোমাকে সেরা ডাক্তার হতেই হবে। তিনি শুধু বলেছেন, সব কিছুর আগে একজন ভাল মানুষ হতে হবে। অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করতে হবে৷ আমাদের ডাক্তারদের জন্যেও কথাটা সমানভাবে সত্যি। মানুষের সেবা দেয়ার পেশায় যেহেতু আপনারা এসেছেন, ভাল মনুষ্যত্ব আপনাকে মানুষের হৃদয়ে ঠাই দিতে পারে। হয়ত সবসময় সব কিছু আপনার ফেভারে থাকবে না, কিন্তু আপনি নিজের কাজে সৎ থাকলে তার প্রতিদান পাবেনই।

ভুটান প্রধানমন্ত্রী, লোটে শেরিং

৫। লোটে শেরিং যখন ভুটানে রাজনীতি শুরু করলেন এবং যেবার জিতলেন তখন আরো চারটা দল সেখানে রাজনীতি করত। কিন্তু, তার ধারণা তাদের ইশতেহারে হেলথ সেক্টর নিয়ে বলা পয়েন্টগুলো বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। তাই জনগণ ভোট দিয়েছে তাদের। তিনি যে আসলেই স্বাস্থ্যখাতকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন, তার প্রমাণ এখন তিনি সপ্তাহের অফ ডেতে সার্জারি করেন। রোগীদের সাহায্য করেন। আমাদের ডাক্তারদেরও নিজ কর্মক্ষেত্রটির প্রতি এমন ভালবাসা যদি থাকত সবার! অনেকেই সরকারি কাজে নিয়োজিত থাকলে বেসরকারি হাসপাতালে সময় দেন বেশি। কিন্তু, প্রথম প্রায়োরিটি নিজ কর্মক্ষেত্রের প্রতি থাকাটাই কি বেশি উচিত নয়?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button