খেলা ও ধুলা

বেঞ্জামিন ‘ইনহিউম্যান’ স্টোকস!

দুই পাশে দুই হাত ছড়িয়ে গর্জে উঠলেন, এক হাতে ব্যাটটা ধরে রাখা। উত্তেজনার ছাইচাপা আগুনটা এতক্ষণ চেপে রেখেছিলেন, দুয়ার খুলে দিলেন, বেরিয়ে এলো সেটা। তার সঙ্গে মিশে গেল জয়ের আনন্দ আর প্রাপ্তির উদযাপন। লিডসের গ্যালারি থেকে তখন উদ্বাহু গর্জন, উন্মাতাল সাগরের ফেনীল ঢেউ আছড়ে পড়ছে সেখানে। অস্ট্রেলিয়ানরা তো দূরে থাক, খোদ ইংরেজ সমর্থক কিংবা দশজন ক্রিকেটারও যেটা কল্পনা করতে পারেননি, সেটাই বেন স্টোকস ঘটিয়ে ফেলেছেন বাইশ গজে দাঁড়িয়ে!

এর আগে টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে সাড়ে তিনশো রান চেজ করে কখনও জেতেনি ইংল্যান্ড। তার ওপরে দলটা প্রথম ইনিংসে অলআউট হয়েছে মাত্র ৬৭ রানে! এই ম্যাচ হারলেই অ্যাশেজ জেতার সুযোগ শেষ, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার এরচেয়ে ভালো উদাহরণ আর হতে পারে না। আগের দিন রুট-ডেনলি প্রতিরোধ গড়েছিলেন, ডেনলি আউট হবার পরে উইকেটে এসে বিকেলের অনেকটা সময় দাঁতে দাঁত চেপে কাটিয়েছিলেন স্টোকস। একটা সময় তো ৭৩ বলে মাত্র তিন রান ছিল তার নামের পাশে।

আজ সকালে যখন রুটও ফিরলেন ড্রেসিংরুমে, তখন ইংল্যান্ডের জয়ের পথে বাজী ধরার মতো লোকজন আতস কাঁচ দিয়েও খুঁজে পাওয়া যেতো না বোধহয়। বেয়ারস্টো-স্টোকসের জুটিতে আশা জাগলো আবার, হ্যাজেলউড-প্যাটিনসনদের দাপটে সেটা মিইয়ে যেতেও সময় লাগতো না। ইংল্যান্ড যে জিততে পারে, সেটা বিশ্বাস করার মতো পুরো দুনিয়াতে হয়তো একজন মানুষই ছিলেন- বেঞ্জামিন স্টোকস!

একপাশে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছেন সতীর্থদের আসা-যাওয়া। দেখেছেন, কিভাবে ভেঙে যাচ্ছে বালির বাঁধ, কিভাবে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে ম্যাচটা। বিরুদ্ধ স্রোতে লড়াই করছিলেন অনেকক্ষণ ধরেই, ভীষণ একপেশে সেই যুদ্ধ, একদম একাকী লড়েছেন তিনি। ১৯৮১ অ্যাশেজে লড়েছিলেন বোথাম, ২০০৫ অ্যাশেজে ফ্লিনটফ; আর আজ স্টোকস!

স্টুয়ার্ট ব্রড যখন নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হলেন, তখনও জয়ের সঙ্গে ইংল্যান্ডের ব্যবধান ৭৩ রানের। ম্যাচ শেষ হতে একটা বল দরকার, সেই বলটাই আসতে দিলেন না স্টোকস। জ্যাক লিচকে আগলে রেখে নিজে পড়ে রইলেন স্ট্রাইকে, আন-অর্থোডক্স সব শটে বের করতে থাকলেন রান, অস্ট্রেলিয়ান বোলারেরা মরলেন মাথা কুটে। ছড়িয়ে রাখা ফিল্ডারদের মাথার ওপর দিয়ে একটার পর একটা বিগ শট করেছেন, সেগুলো গন্তব্যেও পৌঁছেছে দারুণভাবেই।

জয় থেকে দুই রান দূরে থাকতে লায়নের বলে লেগ বিফোরের আবেদনে আম্পায়ার সাড়া দিলে গল্পটা হয়তো অন্যরকম হতে পারতো, কিন্ত আজকের দিনটা তো স্টোকসের, সেই দিনে গল্পটা তার নামেই লেখা হবে। এমন একটা লড়াইয়ের পরে স্টোকসকে পরাজিতের দলে স্বয়ং ভাগ্যদেবীই হয়তো দেখতে চাননি। নইলে থার্ডম্যান এরিয়াতে হ্যারিস কেন ক্যাচটা মিস করবেন?

কামিন্সের মাঝারি উচ্চতার ডেলিভারিটাকে কাভার অঞ্চল দিয়ে সীমানাছাড়া করার পরেই উদযাপনে মেতেছেন, এর আগে সেঞ্চুরী পূরণ হলেও আনন্দের আভা দেখা যায়নি স্টোকসের চোখেমুখে, ম্যাচ না জিতে কাজ শেষ করতে চাননি তিনি। স্কোরবোর্ডে স্টোকসের নামের পাশে ১৩৫ রান, প্রতিটা রানের মূল্য কত, সেটা যারা ম্যাচটা দেখেছেন, তারাই জানেন।

বিশ্বকাপ ফাইনালের পরে আরও একবার অতিমানবীয় মূর্তিতে হাজির এই অলরাউন্ডার, এবারও দলকে জিতিয়েই মাঠ ছেড়েছেন স্টোকস। জানিনা স্টোকসের কেমন লাগছে, এমন একটা ইনিংস নিজের চোখে দেখে যে কি অসম্ভব ভালোলাগায় মন আর্দ্র হয়, সেই অনুভূতিটা ব্যক্ত করাই তো আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button