ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

বিউটি বোর্ডিং- নস্টালজিয়ায় জড়ানো এক ঐতিহাসিক ‘আড্ডাঘর’

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষা চারশ বছরের পুরানো শহর আমাদের পুরাণ ঢাকা। কালের স্বাক্ষী হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে অগনিত স্থাপনা। আমাদের ইতিহাসেরা ঘুরে বেড়ায় এখনো পুরাণ ঢাকার অলিগলি জুড়ে। আজ তেমনি এক স্থাপনার গল্প ও ইতিহাস জানাবো আপনাকে৷ ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটির নাম বিউটি বোর্ডিং। বাংলাবাজারের শ্রীশ দাস লেনে অবস্থিত বিউটি বোর্ডিং। আজকের দিনে নিস্তরঙ্গ বিউটি বোর্ডিং দেখে আপনি জানতেও পারবেন না, এর সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস।

১৯৪৭ সালের আগে এই বাড়িটিতে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস। এখানেই মুদ্রিত হয়েছিল বিখ্যাত কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা। দেশভাগের সময়টায় সোনার বাংলা পত্রিকার অফিসটি স্থানান্তরিত হয় কলকাতায়। হলদে রঙ্গা দেয়ালে পড়ে আছে শ্যাওলা। দোতলা এই বাড়িটি দেখলে নিতান্তই সাধারণ মনে হলেও এই বাড়ির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য কিছু মানুষের ছাপ।

দেশভাগের পর যখন সোনার বাংলা পত্রিকা চলে গেল, তখন প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা এবং তার ভাই নলিনী মোহন সাহা দুইজন মিলে এখানে শুরু করেন বিউটি বোর্ডিং। এটা ১৯৪৯ সালের কথা। তার আগেও বাড়িটা এমনিতেই সারাদিন গম গম করতো মানুষে। রাজনৈতিক নেতারা এখানে এসে আড্ডা দিতেন। বৃটিশবিরোধী বিপ্লবীরা এসে তাদের রণকৌশল ঠিক করতেন আড্ডার আড়ালে। যখন এই বাড়িতে সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস ছিল তখন এখানে এসেছিলেন, পল্লীকবি জসীমউদ্দিন, নেতাজী সুভাস চন্দ্র বোসও!

বিউটি বোর্ডিং শুরু হওয়ার পর এটি হয়ে উঠে বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদদের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। অনেক কবি সাহিত্যিকের বেড়ে ওঠা এই বিউটি বোর্ডিংয়ের প্রাঙ্গনে। কবি শামসুর রহমান বিউটি বোর্ডিং নিয়ে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে লিখেছেন,

“মনে পড়ে, একদা যেতাম
প্রত্যহ দু’বেলা বাংলাবাজারের শীর্ণ গলির ভেতরে সেই
বিউটি বোর্ডিং-এ পরস্পরের মুখ দেখার আশায় আমরা কজন।”

আমরা কজন বললে হয়ত সংখ্যাটা বোঝানো যাবে না। আগে পরে এই বিউটি বোর্ডিং এর প্রাঙ্গনে এসেছেন এমন মানুষের সংখ্যা অনেক৷ বিউটি বোর্ডিং এর ভেতরের দেয়ালে লেখা আছে সংস্কৃতি অঙ্গণের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের নাম, যাদের পদধূলি পড়েছিল এই বিউটি বোর্ডিং এ।

অফিসের দেয়ালে লাগানো পোস্টারে নাম রয়েছে কবি শামসুর রাহমান,রণেশ দাসগুপ্ত, ফজলে লোহানী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, ব্রজেন দাস, হামিদুর রহমান, বিপ্লব দাশ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, আহমেদ ছফা, হায়াৎ মাহমুদ, সত্য সাহা, এনায়েত উল্লাহ খান, আল মাহমুদ, আল মুজাহিদী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ড. মুনতাসীর মামুন, ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, খান আতা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদ, গোলাম মুস্তাফা, খালেদ চৌধুরী, সমর দাশ, ফজল শাহাবুদ্দিন, সন্তোষ গুপ্ত, আনিসুজ্জামান, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল চৌধুরী, শহীদ কাদরী, ইমরুল চৌধুরী, সাদেক খান, ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মহিউদ্দিন আহমেদ, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুর হক, জুয়েল আইচ সহ আরো অনেকে।

মনে প্রশ্ন জাগতে পারে কেনো এই বাড়িটির নাম বিউটি বোর্ডিং? নলিনী মোহন সাহার বড় মেয়ের নাম বিউটি। আদরের কন্যার নামেই নামকরণ হয় এই বোর্ডিংটির। প্রথম দিকে দুই একটি ঘর ভাড়া দেয়া হতো আগন্তুকদের। পরে চাহিদা বাড়ায় কক্ষের সংখ্যা বাড়ানো হয়। মাত্র দুই-তিন টাকায় থাকা যেত এক রাত। খাবার মিলত এক টাকায়। স্বল্প খরচে এমন বোর্ডিংয়ে থাকতে কে না চাবে!

দেশভাগের পর বাংলাবাজার জমে উঠে। নতুন নতুন কবি সাহিত্যিকদের আনাগোনা বাড়ে এই অঞ্চলে। তাদের আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যায় এই বিউটি বোর্ডিং। ঘন্টার পর ঘন্টা চায়ের কাপ ঘুরতে থাকে, চলে অফুরন্ত আড্ডা। চায়ের কাপ ঝড় উঠা যাকে বলে। সাথে চপ কাটলেট থাকাটা যেনো আরো লোভনীয় করে তোলে আড্ডাকে।

কবি শামসুর রাহমানরা এক কালে এখানে চুটিয়ে আড্ডা মেরেছেন। তিনি থাকতেন আশেক লেনে। লক্ষ্মীবাজার থেকে আসতেন কবি শামসুল হক। কবি শহীদ কাদরির তো নিজস্ব আস্তানাই ছিল বিউটি বোর্ডিং-এর ধারে এক দালানে। বিকেল হলেই একে একে সবাই আসতেন। সঙ্গে যোগ দিতেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমানের মতো কবিরাও।

বিউটি বোর্ডিং সেই সময়কার উদীয়মান সৃজনশীল মানুষদের আঁতুড়ঘর। এখানে বসেই অনেকে নিজের জীবনের সেরা লেখাটি লিখেছেন। আহমদ ছফার ‘স্বদেশ’ সাহিত্য পত্রিকার উত্থানও এখান থেকেই। পূর্ব পাকিস্থানের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর পরিকল্পনা এখানে বসেই করেন আবদুল জব্বার খান।

১৯৭১ সালে পাকিস্থানের হানাদার বাহিনীর হাতে খুন হন বিউটি বোর্ডিং এর অন্যতম মালিক প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা সহ ১৭ জন। রাজাকাররা দখলে নিয়ে নেয় বিউটি বোর্ডিংকে। এই পরিবার তখন প্রাণ বাঁচাতে চলে যায় ভারতে। মুক্তিযুদ্ধের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে এলে দুই ছেলে তারক সাহা ও সমর সাহাকে নিয়ে ফিরে আসেন প্রহ্লাদ সাহার সহধর্মিণী প্রতিভা সাহা। তিনি এসে আবার নতুন উদ্যমে শুরু করেন বিউটি বোর্ডিং।

স্বাধীনের পর কবি বেলাল চৌধুরী ও শহীদ কাদরি আবারো আড্ডা বসান, কিন্তু আগের মতো জমে না। পুরনো সেই দিনের কথা, পুরনো স্মৃতিই শুধু থেকে যায়। একসময় অভিমানী শহীদ কাদরি তো দেশ ছেড়েই চলে গেলেন।

বিউটি বোর্ডিংয়ে যারা আড্ডা জমাতেন তারা আজ প্রায় সকলেই পাড়ি জমিয়েছেন অন্যলোকে। কোথাও কেউ নেই এখন আর। কালের স্বাক্ষী হয়ে শ্রীশ দাস লেনে দাঁড়িয়ে আছে শুধু হলুদ রঙ্গা নোনা দেয়ালে জড়ানো সাথে এক চিলতে উঠান নিয়ে দাঁড়িয়ে বিউটি বোর্ডিং। চাইলে ইতিহাস জড়ানো এই জায়গাটায় এক রাত কাটিয়ে আসতে পারেন, কিংবা বন্ধু বান্ধব নিয়ে চাইলেই কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে আসতে পারেন।

বিউটি বোর্ডিংয়ে বর্তমানে ২৭টি আবাসিক কক্ষ রয়েছে। এগুলোর কোনোটি সিংগেল বেডের আবার কোনোটি ডাবল বেডের। এগুলোর ভাড়া ২৫০ থেকে শুরু করে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত।

একসময় এখানে পিঁড়িতে বসে মেঝেতে থালা রেখে খাওয়ানো হতো। বিউটি বোর্ডিং এর খাবারের বিশাল নামডাক ছিল একটা সময়। এখনো খাবার ঘরটিতে ঢুকার সাথে সাথেই বাহারি সব খাবারের ঘ্রাণে মন ভাল হয়ে যাবে আপনার। খাবারের তালিকায় রয়েছে ভাত, ডাল, সবজি, শাকভাজি, ভর্তা, বড়া, চড়চড়ি, সরিষা ইলিশ, রুই, কাতলা, বাইলা, তেলাপিয়া, চিতল, পাবদা, ফলি, সরপুটি, শিং, কৈ, মাগুর, ভাংনা, চিংড়ি, চান্দা, বোয়াল, কোরাল মাছ, আইড় মাছের ঝোল সহ বিচিত্র পদ।

ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে খরচ করতে হবে ১৮০ টাকা। মুরগি ও খাসির মাংস ১০০, খিচুড়ি প্রতি প্লেট ৪০ টাকা, পোলাও ৫০ টাকা, সবজি ৩০ টাকা, বড়া ১০, চচ্চড়ি ৩০ আর একবাটি মুড়িঘণ্ট মিলবে মাত্র ৭০ টাকায়। এ ছাড়া এখানে ৩০ টাকা মূল্যে দই পাওয়া যায়।

সময়ের ঢেউ মানুষকে কোথায় থেকে যে কোথায় নিয়ে যায়! মান্না দে’র গানের কথা মনে পড়বে আজকের বিউটি বোর্ডিংয়ে গেলে। এখনো এই জায়গাটাতে ঘুরতে মানুষ আসে। যারা একটু উদাসী তারা এখানে এসে অনুভব করে সেই ষাটের দশকের জমজমাট উত্তাল সময়টাকে। আর মনে মনে নিশ্চয়ই ভাবে, কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button