ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

শেখ হাসিনা তার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে যা শিখেছেন…

রফিকুল্লাহ রোমেল:

বাংলাদেশ এবং এদেশের মানুষের মধ্যেকার গণতান্ত্রিক ধারণা নিয়ে যুগ যুগ ধরে গবেষণা হতে পারে। এদেশের মানুষের গণতন্ত্র আকাঙ্ক্ষা, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের ইতিহাস সুদীর্ঘ। কিন্ত এদেশের ইতিহাসের তিনজন সর্বসময়ের সর্বকালের জনপ্রিয় শাসক যথাক্রমে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা এবং জিয়াউর রহমান কেউই গণতন্ত্রের পুরো চর্চা করেছেন কিনা সেই নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন দুটোই আছে।

আবার এদেশের মানুষকে যদি কোন গণভোটে জিজ্ঞেস করেন কোন তিনটি দেশকে তারা সব চেয়ে বেশি ঘৃণা করে- ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে, অন্তত ৯৫% মানুষ যে তিনটি দেশের নাম বলবে তারা হলো, ১) ইসরাইল, ২) যুক্তরাষ্ট্র এবং ৩) ভারত। আবারো এই তিনটি দেশের চেয়ে বড় কোন প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের উদাহরণ এখনকার বিশ্বে পাবেন না। আবার যদি বিশ্বের কোন নেতাকে এই দেশের মানুষ সত্যিকার বড় নেতা মনে করে প্রশ্ন করেন দেখবেন পুতিনের নাম আসবে। এরদোয়ানের নাম আসবে। কিছু দিন আগ পর্যন্ত ও সাদ্দাম আর গাদ্দাফীর নাম আসত। ফেসবুকের বাইরে গিয়ে ট্রুডো টাইপ নাম আপনি খুব একটা পাবেন না।

আমার প্রায়ই মনে হয়, ভোট দিয়ে সরকার বদলানো ছাড়া এদেশের মানুষ আদৌ আর কোন গণতন্ত্রের উপাদান চায় কিনা বা আদৌ বোঝে কিনা?

ঠিক এই জায়গাটায় এসে মনে হয় শেখ হাসিনা তাঁর পূর্বসূরী বঙ্গবন্ধু আর জিয়াউর রহমান থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। আমাদের দেশের টাইপ গণতন্ত্রের মূল কথা হলো পাবলিকের কথা শোনা। তাদের পছন্দ অপছন্দকে পাত্তা দেয়া। সেটার উদাহরণ নাসির হোসেনকে দলে নেয়া থেকে শুরু করে কওমী শিক্ষায় ইংরেজী সিলেবাস ঢুকানো, আর তাদের চাকরির ব্যবস্থা করা পর্যন্ত যে কোন কিছু হতে পারে।

বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক

বঙ্গবন্ধু দেশের ভালোর জন্যই বাকশাল করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পাবলিকের কথা তার আগে তার কানে মোশতাকরা পোঁছতে দেয় নি। বাকশালের প্রি পাবলিক ডিমান্ড তৈরিই হয়নি।

জিয়াউর রহমান এসব শোনাশোনির মধ্যেই ছিলেন না। আজকে বহুল চর্চিত “অংশগ্রহমূলক গণতন্ত্র”-কে তিনিই প্রথম নিপুন হস্তে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দেন। আজকের এই যে “ইউ ডোন্ট ম্যাটার” গল্প, সেটার সব চেয়ে পারফেক্ট গল্পটি তিনিই লিখেছিলেন। যতজন যেইভাবে যেইখানে থেকে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের সবাইকে তিনি এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসেন। মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার, সরাসরি যুদ্ধাপরাধী, চরম ডান, ব্যাপক বাম, ইসলামী চরমপন্থী- সবাই এক প্ল্যাটফর্মে। শর্ত একটাই। এদের সবাইকে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের জানি দুশমন হতে হবে। এরা নিজের মধ্যে যাতে মোটিভেশন খুঁজে পায়, সেজন্য বললেন “মানি ইজ নো প্রবলেম”। আর যাতে ঝামেলা না করে সেজন্য বললেন, “আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট”, বাকীরা নিধন হলো। রক্তপাতও থেমে রইল না। জিয়াউর রহমান অনেক উন্নয়ন কাজে হাত দিয়েও এই টাইপ “গণতন্ত্র”-কে টেকাতে পারেননি। নিজের হাতে বোনা করুণ রাস্তাতেই তিনি চলে গেলেন।

জিয়া, প্রথম বাংলাদেশ, জিয়া মুজিব হত্যা

শেখ হাসিনা রাজনীতি শুরু করেছেন এগুলো দেখেই। যখন এসেছিলেন আওয়ামী লীগ একটি অনুচ্চারিত নাম। বঙ্গবন্ধু নামই স্কুলের বাচ্চারা কোনদিন শোনেনি। গণতন্ত্রের অন্যতম মূল শর্ত আইনের শাসনের জায়গায় এসে দেখলেন নিজের বাবার এবং পুরো পরিবারের হত্যার বিচার চাওয়ার জায়গাটা পর্যন্ত নেই।

৯৬-এ ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক করার চেষ্টা করলেন। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে শক্ত করলেন আইন পাশ করে। বিরোধী দলীয় সাংসদদের সেগুলোর প্রধান করলেন। বিরোধী দলীয় সাংসদদের বিদেশ সফরে অন্তভুর্ক্ত করলেন সরকারের ট্রেইনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রোগরামের আওতায়। যারা তার গুষ্টিসহ নির্বংশ করে একুশ বছর ক্ষমতা থেকে দূরে রেখেছিল, তাদের নিয়ে “ঐকমত্যের সরকার” করে ইনক্লুসিভ সরকারও করতে গিয়েছিলেন।

কোন লাভই হয় নি। মাগুরা নির্বাচনের মত ঘটনা না ঘটা সত্ত্বেও বিরোধী দল সেই যে সংসদ থেকে গেল, আর ফিরে এল না। পরের নির্বাচনে জনগণ এই “প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র”-কে কোন মূল্যই দিল না। কারণ জনগণ এগুলো নিয়ে খুব মাথাই ঘামায়নি।

আমার ধারণা তখনই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন এদেশের মানুষ আসলে গণতন্ত্র বলতে কি বোঝে। ২০০৮ থেকে উনি এই মার্কেট রিসার্চের উপরেই দেশ চালাচ্ছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রেক্ষিতে শাহবাগ বলেন, সাকিব আল হাসানের সাসপেনশন ছয় মাস কমানো বলেন, কোটা কমিয়ে নিয়া আসা, শিক্ষায় ভ্যাট স্থগিত করা, সড়ক দূর্ঘটনা আইন পূনর্বিন্যাস করে শাস্তি বাড়ানো- সবখানেই তিনি পাবলিক ডিমান্ড নিয়ে সরাসরি এঙ্গেজ করেছেন।

একটা সময় মানুষের বাসার সামনের ডাস্টবিন পরিস্কার থেকে শুরু করে জনগণের ব্যক্তি সমস্যার সমাধানের জন্য লোকজন প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিতে শুরু করে। এরপর ফোন হটলাইন চালু হয়। আসতে থাকে হাজার হাজার ফোন। পাবলিক হিয়ারিং পয়েন্টের সেন্টার পয়েন্টে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী নিজেকেই বসিয়ে ফেলেন। উনি বুঝতে পারেন বাংলাদেশে গণতন্ত্র আসলে ওটাই।

নতুন মন্ত্রীসভা ঘোষিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম আর কার্যনির্বাহী কমিটি মিলিয়ে মাত্র ১৪ জন আছেন এখানে। এই সংখ্যাটি কখনোই ৩০ এর নিচে ছিল না এদেশে। বিএনপি জাতীয় পার্টি আমলে কত থাকত সেই আলোচনায় না যাই।

প্রথম আলোর “সৎ ও যোগ্য লোকের শাসন চাই” এর দ্বিতীয় কিস্তি তিনি আবার ওপেন করেছেন। আব্দুল মোমেন, সাধন চন্দ্র মজুমদার, গোলাম দস্তগীর গাজী, মহিবুল হাসান নওফেলদের যেমন চ্যালেঞ্জ তুলে দিয়েছেন, তেমনি আব্দুর রাজ্জাক, ডাঃ দীপুমণি বা মুন্নুজান সুফিয়ানকে মন্ত্রীসভায় ফেরত এনেছেন দলে তাদের অনবদ্য পারফরমেন্স এর জন্য।

এখন নতুন মন্ত্রীসভার সবাইকে শেখ হাসিনার লাইনে খেলতে হবে। এদের সবাইকে পাবলিক হিয়ারিং পয়েন্টের সেন্টারে থাকতে হবে। নইলে যে কোন সময় পদ খুইয়ে বসতে পারেন। আর তোফায়েল, আমু, হাসনাত আব্দুল্লাহ, মাহবুবুল হানিফ, নাসিম সাহেবদের কাজ “মেক আওয়ামী লীগ গ্রেট এগেইন” ক্যাম্পেইনে যাওয়া। যদি সেটা পারেন, তাদের সুযোগও থাকবে রাজ্জাক দীপুমনিদের মতো।

ক্লিয়ার ম্যাসেজ।

আর সবচেয়ে বড় ম্যাসেজ সেই যে পাবলিক হিয়ারিংয়ের সেন্ট্রালে থাকা। তাদের যে কোন মতকে মূল্য দেয়া। “বেকা হাসির শাহজাহান খানের কাছে শেখ হাসিনা বন্দী” বাণীটাকেও একটা বাঁকা হাসি দিয়েই বিদায় দেয়া। সত্যিকার হাইব্রিড ইনু মেননদের এখন অখন্ড অবসর। আগে একবার হজ্ব করেছিলেন। এবার নিশ্চয়ই ওমরাহটাও সেরে ফেলতে পারবেন। বিন্দুমাত্র প্রশ্ন উঠার সুযোগ না দিয়ে শেখ পরিবারের কাউকে, এমনকি বেয়াইকেও আর ক্যাবিনেটে না রাখা, এমনকি প্রচুর একাডেমিক সাকসেস থাকার পরেও পাবলিকের যাতে “রাবিশ” শুনতে শুনতে কান পঁচে না যায় সেই ব্যবস্থা করা।

ম্যাসেজ খুব ক্লিয়ার। পাবলিক হিয়ারিং পয়েন্টকে মূল্য দেয়া।

তবে অনভিজ্ঞ মন্ত্রীসভার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। দুনিয়ার সব কাজ প্রধানমন্ত্রী একা করবেন না। ওভাবে চলেও না। তারা যদি সেই লোড শেয়ার না করেন তাহলে “সৎ ও যোগ্য লোক” বলেই গাড়িতে ফ্ল্যাগ নিয়ে চলতে পারবেন বলে মনে হয় না। একজন আসাদুজ্জামান নূর পারেননি। পারেননি তারানা হালিমও। কিন্তু তারা “এ টিমে” রয়ে গেছেন। যে কোন সময়েই ফেরত আসবেন। বিকল্পধারার মাহী বি চৌধুরীকেও আপাতত প্ল্যান বি নিয়াই থাকতে হবে। আশরাফ ভাইয়ের আত্মাটা এই ধরাধম ত্যাগ করার সময় প্রফেসর আলবাস ডাম্বলডরের মত যেন খান, ইনু আর মেননের গদিও টলিয়ে দিল।

সব মিলিয়ে দুর্দান্ত একটা কম্বিনেশন। দলেও। মন্ত্রীসভাতেও।

শুরুর আলোচনাটা দিয়ে শেষ করি। আমরা বাংলাদেশীরা, আমাদের কারো কারো আসল চেহারা তথা আমাদের গণতন্ত্রবোধকে শেখ হাসিনা কেমন যেন একটা জাদু আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। “ইউ ডোন্ট ম্যাটার” ন্যারেটিভের টুঁটি চেপে ধরেছেন।

আমরা ব্যাপক স্বচ্ছ নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দলের বাইরে থেকে আমদানী করে মরহুম সাকা চৌধুরী, আলী আহসান মুজাহিদ আর মতিউর রহমান নিজামীকে মন্ত্রী বানাবো, নাকি একটা ফ্যাসিস্ট বাকশালী মার্কা নির্বাচনে জয়ী হয়ে দীর্ঘদিন দলকে সার্ভিস দেয়ার পরেও পাবলিক সেন্টিমেন্টকে প্রাধান্য দিয়ে শাজাহান খান (নিরাপদ সড়ক), আবুল মাল আব্দুল মুহিত (ভ্যাট আন্দোলন), নুরুল ইসলাম নাহিদ (প্রশ্ন ফাঁস ও কোটা)-কে ছুঁড়ে ফেলে দিব?

হে জাদু আয়না, তুমিই বলো, গণতন্ত্র আসলে কোনটা?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button