খেলা ও ধুলা

এই লজ্জা কোথায় রাখি?

২০০৩ বিশ্বকাপে কানাডার কাছে হারের পর এটাই সম্ভবত বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে লজ্জার দিন। এই লজ্জা রাখার কোন জায়গা আছে? টেস্ট আঙিনায় একেবারেই নবীশ একটা দলের বিপক্ষে নিজেদের মাটিতে শেষ দিনে সতেরোটা ওভার যে খেলোয়াড়েরা দাঁতে দাঁত চেপে কাটিয়ে দিতে পারে না, তাদের কি আদৌ টেস্ট খেলার নৈতিক অধিকার আছে? বিশ্বকাপে সীমাহীন ব্যর্থতার পর শ্রীলঙ্কায় ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ, আর এবার ঘরের মাঠে আফগানিস্তানের কাছে এমন শোচনীয় পরাজয়- বাংলাদেশের ক্রিকেটের কফিনে শেষ পেরেকটা কি মেরে দেয়া হলো না? এমন অজস্র প্রশ্ন উঠছে, ওঠাটাই স্বাভাবিক। ব্যর্থতার চোরাবালিতে ক্রমশ ঘুরপাক খেতে থাকা দলটা এরচেয়ে ভালো কোন আলোচনা ডিজার্ভও করে না।

চার উইকেট হাতে নিয়ে উনিশটা ওভার টিকে থাকার মিশন ছিল, বিশ বল বাকি থাকতেই সেই মিশনে সফলভাবে ফেল করলো বাংলাদেশ। একটু ধরে খেলি, টিকে থাকি এই একটা ঘন্টা- এই জিনিসটা কারো মাথায় কাজ করলো না। অবশ্য, পুরোটা টেস্ট জুড়েই বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা প্রমাণ দিয়েছেন যে, টেস্ট ম্যাচের বেসিকটা তারা বোঝেন না। উনিশ বছর, একশোর বেশি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা- সবকিছুই হার মানলো মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলা আফগানদের সামনে।

টেস্টের প্রথম দিনের প্রথম সেশন থেকেই জানপ্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আফগানিস্তান, প্রতিটা মূহুর্তে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, ম্যাচটা জেতার জন্যেই মাঠে নেমেছে তারা। ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং, প্রতিটা জায়গাতেই নিজেদের সর্বোচ্চটা ঢেলে দিয়েছেন রশিদ-নবী কিংবা রহমত-আসগির আফগানরা। সেখানে আমরা কি করেছি? নখদন্তহীন বোলিং, গা ছাড়া ফিল্ডিং, উইকেটের পেছনে মুশফিকের জঘন্য সব মিসের পরেও জোর করে কিপিং গ্লাভস আঁকড়ে ধরে থাকা, আর ব্যাটিঙের কথা তো মুখেই আনা উচিত না। নিকৃষ্ট, জঘন্য- এই দুটো শব্দও আসলে যথেষ্ট নয় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কৃতিত্বকে বর্ণনা করার জন্যে।

সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা প্রত্যেকেই পঞ্চাশের বেশি টেস্ট খেলে ফেলেছেন (রিয়াদের টেস্ট সংখ্যা ৪৫) ইতিমধ্যে, কিন্ত দুই টেস্ট খেলা রহমত শাহ কিংবা আসগর আফগানরা যেভাবে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাটিং করলেন, তার এক শতাংশও দেখা গেল না আমাদের এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের মধ্যে। উইকেটে ভালো ব্যাটসম্যান সবসময় লোয়ার অর্ডারের সতীর্থকে আগলে রাখবেন- এই বেসিকটা যদি মাত্র একটা টেস্ট খেলা আফসার জাজাই বুঝতে পারেন, তাহলে গত তিন বছর জাতীয় দলে থেকে পঁয়ত্রিশটা ওয়ানডে খেলে ফেলা মোসাদ্দেক কেন কথাটা ভুলে যাবেন? তিনে নেমে উইকেটে টিকে থাকার বদলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে কেন উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসবেন?

রশিদ খানকে বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশী সমর্থকেরা ধুয়ে দিয়েছিলেন, রশিদ নাকি বাংলাদেশকে প্রাপ্য ‘সম্মান দিয়ে’ কথা বলেন নি। বাংলাদেশ কতটুকু সম্মান ডিজার্ভ করে, সেটা দুই ইনিংসে এগারো উইকেট শিকার করে রশিদ বুঝিয়ে দিয়েছেন। রশিদ জানেন তার স্ট্যান্ডার্ডটা কোন জায়গায়, আমরাই ভুলে গেছি, নিজেদের লেভেলটা নামতে নামতে কোথায় এসে ঠেকেছে। অন্ধ অহমিকায় আক্রান্ত হয়ে এশিয়ার ক্রিকেটে নিজেদেরকে ভারতের সাথে তুলনা করি আমরা, আর আফগানিস্তান এসে চট্টগ্রামের মতো জায়গায় হেসেখেলে হারিয়ে দেয় আমাদের।

একটা সময় ছিল, শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে বৃষ্টির বাধায় কোনরকমে ড্র করতে পারলে বর্তে যেতাম আমরা, আনন্দে লাফানো শুরু করতাম। আজ প্রতিপক্ষের জায়গাটা আফগানিস্তান দখল করেছে, তাদের বিপক্ষে ম্যাচ বাঁচানোর জন্যেও বৃষ্টির দিতে তাকিয়ে থাকি আমরা। আর কত অধঃপতনের সাক্ষী হতে হবে, সেটা আমাদের জানা নেই।

তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমে দ্বিতীয় জয় তুকে নিয়েছে আফগানিস্তান, দেশের বাইরে জিতেছে প্রথম টেস্ট, তাও কি অসাধারণ প্রভাব বিস্তার করে! টেস্টে দ্বিতীয় জয়ের দেখা পেতে আমাদের খেলতে হয়েছিল ৬০টা ম্যাচ, অপেক্ষা করতে হয়েছিল দশ বছর। শুধু মেরিট দিয়ে টেস্ট জেতা যায় না, প্ল্যানিং লাগে, সেই পরিকল্পনাটা ঠিকঠাকমতো মাঠে বাস্তবায়ন করা লাগে। আমাদের তো কোন প্ল্যানই নেই, ফলাফল আসবে কোত্থেকে? আফগানিস্তানের বিপক্ষে আমরা স্পিন ট্র‍্যাক বানিয়ে নামি, এই সেদিন টেস্ট অভিষেক হওয়া রশিদ খানেরা আমাদের মাথার ওপরে ছড়ি ঘুরিয়ে আমাদেরই মাঠ থেকে টেস্ট জিতে চলে যায়, আমরা চেয়ে চেয়ে দেখি। এর বেশি কিছু আমাদের করার নেই, ছিলোও না।

আমরা পারবো কেবল অজুহাত দিতে, মিরাজ যেমন সংবাদ সম্মেলনে এসে দিয়েছিলেন, আফগানিস্তান টেস্ট আঙিনায় নতুন বলে নাকি তাদের রোমাঞ্চ বেশি, তাই তারা ভালো খেলছে। বাংলাদেশের কাছে টেস্ট খেলাটা পুরনো হয়ে গেছে, তাই ভালো খেলার তাগাদা নেই! কি অদ্ভুত যুক্তি! তাহলে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া অ্যাশেজ জেতার জন্যে জান দিয়ে দেয় কেন? ভারতের চেতেশ্বর পূজারা কেন টেস্ট খেলার জন্যে আইপিএল থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন? ব্যার্থতার পক্ষে একেকটা যুক্তি শুনলে মন চায় মাটি খুঁড়ে কয়েকশো ফুট নিচে চলে যাই!

একটা সময় জিওফ বয়কটেরা আমাদের পারফরম্যান্স দেখে বলতেন, বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস কেড়ে নেয়া উচিত। এখন তার কথাটাই সত্যি বলে মনে হচ্ছে। এমন মানসিকতা নিয়ে টেস্ট খেলা যায় না, এই চিন্তাভাবনা নিয়ে কেউ সাদাপোষাকে মাঠে নামলে টেস্ট ক্রিকেটকে অপমান করা হয়। আমাদের জন্যে ওয়ানডেটাই ঠিক আছে, দু-চার ম্যাচ জিতে উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়াটা মানানসই। আমরা আসলেই টেস্ট ক্রিকেট খেলা ডিজার্ভ করি না।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button