অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

এমন বিসিএস ক্যাডারদেরকেই আমাদের অনেক বেশি দরকার!

ছোটবেলায় আমাদের সবার একটা কমন রচনা লিখতে হয়েছে, এইম ইন লাইফ বিষয়ে। সেখানে আমরা প্রায় বেশিরভাগ মানুষ ডাক্তার হব বড় হয়ে এমন কথা লিখতাম। আমরা লিখতাম, দেশের কল্যাণে কাজ করতে হলে ডাক্তার না হয়ে কোনো গতি নেই। আমরা লিখতাম, ডাক্তার হয়ে আমরা মানবসেবা করব, অবসর সময়ে আমরা গ্রামে গিয়ে গরীব দুখী মানুষদের চিকিৎসাসেবা দিব। আমাদের মুখস্থ কিছু লাইন থাকত, গুছিয়ে লিখতে পারলে চাক্কা নাম্বার!

বড় হয়ে গেলে ওসব রচনার কথা, রচনায় লিখা মানবসেবা করার প্রলাপ আমরা ভুলে যাই। সাইন্স, কমার্স, আর্টসের ভাগাভাগিতে স্বপ্ন ভাগাভাগি হয়ে যায়। চিন্তা বদলে যায়। তবুও, প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মানুষের সাদা এপ্রোন পড়ার সৌভাগ্য হয়। তারা একদিন ডাক্তার হন, কেউ কেউ বিসিএস দিয়ে স্বাস্থ্যক্যাডারের মাধ্যমে সরকারি সেবায় নিযুক্ত হন। এই মানুষগুলোর অধিকাংশ ভীষণ ব্যস্ততায় দিন পার করেন৷ কেউ কেউ প্রাইভেট হাসপাতালেও সেবা দেন। সন্ধ্যার পর রোগীদের লম্বা সিরিয়াল। এত কিছুর মধ্যে দাতব্য করার সময় কোথায়? কেউ কেউ যে নিজ উদ্যোগে গরীব রোগীদের জন্য কাজ করেন না তা বলছি না, তবে আমাদের পারসেপশন হয়ে গেছে, বড় ডাক্তার, বিসিএস ক্যাডার মানে সেই ডাক্তারের সময় কম, অনেক বেশি ফিস। এদের সেবা পেতে হলে অনেক অর্থ গুণতে হবে।

ডাক্তারদেরকে অনেকে বিভিন্ন শব্দে নেতিবাচকভাবে বিশেষায়িত করেন। অনেকেই বিরক্ত ডাক্তারদের উপর। ডাক্তার মানেই অনেকের কাছে ‘কসাই’ যারা শুধু টাকাই চিনে! মানুষের এসব ধারণা এমনি এমনি হয়নি৷ কিন্তু, সব ডাক্তার একরকম নন, কেউ কেউ থাকেন যারা সব ধারণার বাইরে গিয়ে ছোট বেলার এইম ইন লাইফ রচনার মতো সৎ থাকেন নিজের পেশায়। যারা ডাক্তারি পেশাটার মাহাত্ম্য আমাদের সামনে এনে হাজির করেছেন, যাদের দেখে সত্যিই মনে হয়, এমন ডাক্তাররাই তো দেশ বদলাবেন!

এক টাকার চিকিৎসা সেবা, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন

যাদের গল্প বলছি, এরা হাতুড়ি ডাক্তার নন, এরা সত্যিকারের ডাক্তার। শুধু ডাক্তার নন, এরা বিসিএস ক্যাডারও। স্বাস্থ্য ক্যাডারে উর্ত্তীণ হয়ে তাঁরা সরকারি মেডিক্যালে কর্মরত আছেন। আপাতদৃষ্টিতে তাদের আরামে থাকবার কথা, কর্মঘন্টা লামসাম ভাবে পার করে দিয়ে কোনো প্রাইভেটে এসির তলায় বসে হাজার হাজার টাকা প্রতিদিন ভিজিট ফি কামানো এদের জন্য কোনো কঠিন কাজ নয়। তারউপর বিসিএস ক্যাডার যেহেতু, নিজেকে রাজা ভেবে ধরাকে সরা জ্ঞ্যান করার মনোভাব নিয়ে থাকলেও হয়ত কেউ ঘাটাত না এদের৷ কিন্তু সত্যিটা হলো, যাদের নিয়ে এই লেখা, সেই ডাক্তাররা একটু বেশি ব্যতিক্রম।

সরকারি হাসপাতালের কর্মঘন্টার পর অবসরে তারা ছুটে যান একদম গ্রামের দিকে, দারিদ্রতায় নিমজ্জিত কোনো অঞ্চলে কিংবা কোনো দুর্গম চরে। কেন যান? কারণ, সেখানকার মানুষদের হয়ত বড় ডাক্তারদের সেবা পাওয়ার সুযোগ সবসময় হয়ে উঠে না। সেই দুর্গম অঞ্চল কিংবা বহুদূরের কোনো গ্রামের নিম্নবিত্ত মানুষদেরকে এই ডাক্তাররা চিকিৎসা সেবা, পরামর্শ দিতে ছুটে যান। শুনেন কার কি সমস্যা। দরিদ্র মানুষগুলো হয়ত অপার বিস্ময়ে আবিষ্কার করে, পৃথিবীতে এখনো মানবিক টান আছে, এখনো এমন বিসিএস ক্যাডার আছেন, ডাক্তার আছেন যাদের কাছে অর্থ, ক্ষমতার চেয়ে অনেক বড় জাদু আছে। মানুষকে ভালবাসার জাদু৷ নিজের অবসর সময়টাকে, নিজের যোগ্যতা, দক্ষতাকে অর্থমোহের বাইরে গিয়ে মানুষের কাজে লাগানোর স্বদিচ্ছা অনেকের আছে। তবে তারা কিন্তু এই সেবা বিনামূল্যে দেন না, ফিস নেন। কত টাকা ফিস জানেন? মাত্র এক টাকা! ছবিতে যে অর্থের পরিমাণ দেখছেন এই ‘বিশাল’ অর্থ হলো ৫৭৭ জন রোগী দেখার ভিজিটিং ফিস!

এক টাকার চিকিৎসা সেবা, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন

একজন ডাক্তারের নাম নিতে পারি। মানুষটার নাম ডাক্তার আসমা আক্তার। তিনি ২০১৪ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উর্ত্তীণ ক্যাডার হয়ে সরকারি পেশায় যোগ দেন। অবসরে তিনি এক টাকার চিকিৎসা সেবার এই কার্যক্রমে সময় দেন। এটাই তার ‘প্রাইভেট প্র‍্যাকটিস’। তিনি বলেন, “একাজ করে আমি যে  আনন্দ আমি পাই তা লাখ-কোটি টাকার চেয়ে বেশি। আমি একটা সরকারি চাকরি করি, যা বেতন পাই তাতে তৃপ্ত, এর চেয়ে বেশি টাকার প্রয়োজন বোধ করি না। অন্য সময় লাখ টাকা রোজগারের চাইতে এক টাকায় মানুষের সেবা করাই আমার কাছে পরম তৃপ্তির।”

ডা. আসমা আক্তার ছাড়াও সংগঠনের হয়ে নিরলসভাবে করে যাচ্ছেন ডা. নেসার আহমেদ, ডা. সৌরভ দেবনাথ, ডা. রাগিব, ডা. ফারজানা, ডা. সাদিয়া, ডা. নাজনীন রনি, ডা. সাবিনা সুমি, ডা. কামরুন নাহার কেয়া, ডা. কাফি, ডা. ইউসুফ, ডা, মিজান, ডা. সুমি সহ আরো অনেকেই যুক্ত এই মহতি উদ্যোগের সাথে।

এক টাকার চিকিৎসা সেবা, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন

‘এক টাকার আহার’ প্রজেক্টের কথা আপনারা শুনে থাকবেন অনেকে, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন এক টাকায় পথশিশুদের খাবার প্রদান করে আসছে অনেকদিন ধরে৷ এক টাকার চিকিৎসা সেবার মেডিক্যাল ক্যাম্পগুলোও তাদের তত্ত্বাবধানে হচ্ছে। এই মহতি উদ্যোগের পাশে আপনিও সামিল হতে পারেন৷ তার জন্য বিসিএস ক্যাডার কিংবা ডাক্তার হতে হবে না। মানুষের মতো মানসিকতার হলেই যথেষ্ট। “এক টাকার আহার – 1 taka meal” নামক ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করতে পারেন, যদি কেউ মনে করেন এই মেডিক্যাল ক্যাম্পের ঔষধ কেনার ব্যাপারে কোনোভাবে আপনি সাহায্য করতে পারেন৷

এই ডাক্তারদের মানসিকতা সবাই ধারণ করলে কি দারুণ ব্যাপার হতো! মাসে একদিন হলেও যদি কোনো ডাক্তার নিজ গ্রামে গিয়ে রোগী দেখেন, এমন কোনো গ্রাম কি বাদ থাকবে যারা বড় চিকিৎসকের সেবার আওতার বাইরে থাকবে? একদিন নিশ্চয়ই হবে। বিসিএস ক্যাডার হলেই আজকাল ফুল দিয়ে বরণ করার চল নেমেছে। ফুল দিয়ে একজন ক্যাডারকে আসলে তখনই বরণ করা উচিত যখন তিনি যে সেবাকার্যের জন্য মনোনীত হয়েছেন সেটা আন্তরিকতার সাথে করতে পারেন। কর্তব্য থেকে শুধু নয়, যে কাজটায় ভালবাসাও থাকবে সেই কাজের জন্য ফুল দেয়া উচিত। স্বাস্থ্য ক্যাডারের এই ডাক্তারদেরকে সামনে পেলে আমি নিশ্চিত ফুল দিতাম এবং শ্রদ্ধা জানাতাম। বিসিএস ক্যাডাররা এমন মনোভাব নিয়ে সেবা দিলে দেশ দুইশভাগ বদলে যাবে! এমন বিসিএস ক্যাডারদেরকেই আসলে আমাদের বেশি বেশি দরকার, যারা ছোটবেলার ‘এইম ইন লাইফ’ রচনার মতো সৎ!

Facebook Comments

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button