রিডিং রুমলেখালেখিসিনেমা হলের গলি

এপার-ওপার, ঘটি-বাঙাল করে রেখেছো, বাঙালি করোনি!

ওপার বাংলার নায়ক জিৎ এর ‘শেষ থেকে শুরু’ নামের একটি সিনেমা বেরিয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্র নামের একটি গ্রুপ এ কোনো এক বন্ধুর দ্বারা অপ্রত্যাশিতভাবে অ্যাড হওয়াতে সেই শেষ থেকে শুরু নামের সিনেমাটির একটি রিভিউ আমার চোখে পড়লো কয়েকদিন আগে। রিভিউয়ার বলেছেন ছবিটি তার ভালো লেগেছে, যার অনেকগুলো কারণের একটি হলো- এই ছবিতে জিৎ নাকি ঢাকার ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং ঢাকার ভাষায় কথা বলেছেন। শাকিব খানের মতো জিতেরও যে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এবং মফস্বলে একটি নির্দিষ্ট দর্শক রয়েছে, তা জানতাম কিন্তু এরকম বাণিজ্যিক ছবির গুরুগম্ভীর রিভিউ লেখার মতন অনুরাগীও যে আছে, সেটা অজানা ছিল।

রিভিউ পড়ে বিস্মিত হলাম এবং ঢাকার ভাষা ব্যাপারটা কী জানার জন্য অদ্ভুত এক কৌতূহল অনুভব করলাম। পুরোনো ঢাকার একটি ভাষা আছে, সেটা আমাদের জানা। সেটি নিয়ে আমরা মাঝে মাঝে হাসাহাসি করি তাও কারো অজানা নয় , কিন্তু শুধু ঢাকার ভাষা কী সেটা তো অজানা। অতএব ছবিটি না দেখলেই নয়…

একটু ইততস্ত করে (যেহেতু জীবনে এর আগে কোনোদিন এরকম কমার্শিয়াল বাংলা ছবি দেখিনি) টিভির সামনে বসলাম এবং হকচকিয়ে গেলাম। সেই রিভিউয়ার ভাই সম্ভবত জানেন না যে তারা যেই বাংলায় কথা বলেন, ওটা ঢাকার বাংলা নয়, তাই তিনি এত সহজে মুগ্ধ হতে পেরেছেন। আমি যেহেতু জানি, তাই আমি দুঃখিত হয়েছি। হ্যাঁ, এটা ঠিক আমরা আমাদের বাক্যগুলোর শেষে কিছু অশুদ্ধ বাংলা ব্যবহার করি যেমন খাইসি, গেসি, করসি, বলবা, করবা, থাকবা ইত্যাদি। কিন্তু সেটা শুধু অতটুকুই। এর বাইরে আমরা গ্রামের ভাষা আমাদের কথার মধ্যে মিক্স করিনা। তুমি করতাসো , আইতাসো , এভাবে হইবো না ,তোমার লগে যামু , কতা কইয়ো না, আমি এটা কইরা নিমু, সে বইস্যা আছে , তুমি ভুইল্যা যাইতাসো, আমি পারুম না, তাকে লেইখা পাঠামু- এই রকম ভাবে আমরা কথা বলি না। সিনেমাটির মধ্যে এরকম বাংলা শুনতে ভীষণ ভাবে কানে লেগেছে। না ওটা শহরের ভাষা হয়েছে, না পুরাপুরি গ্রামের। অদ্ভুত এক জগাখিচুড়ি।

এর আগে বিসর্জন সিনেমায় নিখুঁতভাবে বাংলাদেশের গ্রামের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রশংসার দাবীদার। ছবিটির গ্রামের পটভূমিকায় নির্মিত এবং ছবিটি তথাকথিত বাণিজ্যিক ঘরানার ছবি নয় দেখে নির্মাণে যত্ন ছিল। আমি জানি মেইনস্ট্রিম ছবিতে এত পারফেকশন আনার কথা নির্মাতারা ভাবেন না, তাদের যে টার্গেট অডিয়েন্স তারা খুশি হলেই হলো। অন্য এতকিছু গবেষণার দরকার নেই। তারপরেও ভুল কিছু দেখলে খারাপ লাগে।

সিনেমা অনেক শক্তিশালী মাধ্যম। সেখানে যা দেখানো হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটাই সত্যি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তারচেয়েও বড় কথা একটি দেশের সিনেমা সেই পুরো দেশের মানুষের মানসিকতার এবং কালচারের বাহক। সিনেমা দেখে আমরা সেই দেশের মানুষ সম্পর্কে ধারণা পাই। গত কয়েকমাস ধরে আমি ওপার বাংলার প্রচুর সিনেমা দেখছি। এযাবৎকাল আমার কাছে কলকাতার সিনেমা মানে শুধুই উত্তম কুমার আর সত্যজিৎ রায় ছিলেন। এর বাইরে কখনো কিছু দেখা হয়নি। মাঝে ঋতুপর্ণ ঘোষ ও অপর্ণা সেন পরিচালিত অল্প কিছু দেখেছিলাম (উনিশে এপ্রিল, চোখের বালি, গয়নার বাক্স, জাপানিজ ওয়াইফ ইত্যাদি)। ওগুলো বেশ ভালো লেগেছিলো, কিন্তু আরো কিছু সিনেমা দেখে এরকমটা কখনো মনে হয়নি। থ্যাঙ্কস টু জয়া আহসান যে তিনি ওখানে গিয়ে বেশ ভাল কাজ করছেন এবং এতটাই প্রশংসিত হয়েছেন যে কলকাতার বাংলা ছবি নিয়ে আমার আগ্রহ তৈরী হয়েছে এবং তাঁর বিসর্জন এবং বিজয়া ছবি দুটি দেখে মুগ্ধ হয়ে আমি এই মিডল ঘরানার (অফ বিট আর কমার্শিয়ালের মাঝামাঝি ) একের পর এক ছবি দেখা শুরু করেছি।

যে কজন পরিচালক এ ধরণের ছবি বানান (শিবপ্রসাদ-নন্দিতা , সৃজিত মুখার্জি , অরিন্দম শীল এবং কৌশিক গাঙ্গুলী ) এদের মোটামুটি সব সিনেমাই (সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দুই-একটি বাদে) আমার দেখা হয়ে গেছে। ছবিগুলি দেখে ওপার বাংলা সম্পর্কে, ওদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানার সাথে সাথে এটাও জানলাম বাংলাদেশের মানুষকে তারা বাঙাল হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং বাংলাদেশের মানুষের ভাষাকে বলে বাঙাল ভাষা। ওরা মনে করে পুরা বাংলাদেশের মানুষ এই বাঙাল ভাষায় কথা বলে!

‘খাদ’ নামের একটি সিনেমা দেখতে গিয়ে হোঁচট খেলাম, যখন দেখলাম বাংলাদেশের শহর থেকে আসা দুজন মানুষের চরিত্রে মা ও ছেলের ভূমিকায় যারা অভিনয় করছেন তারা সেই ‘আইতাসি-যাইতাসি, আমাগো লগে আসবানা’ এই ভাষায় কথা বলছেন। একটি ছোট্ট ছেলে তাদের টিটকারি মেরে বলছে- ওমা তোমরা বাঙাল? কিছুক্ষন পরে সেই ছেলে আবার জিজ্ঞেস করছে- আচ্ছা বাঙাল আর বাঙালি এক নয়, তাই না? প্রশ্ন শুনে সেই বাংলাদেশী মহিলা মন খারাপ করলেন আর ব্যাকগ্রাউন্ডে করুণ একটি আবহ সংগীত বাজতে শুরু করলো!

ছবিটি দেখে আমার মনে দুইটি প্ৰশ্ন উঠলো। এক, ওনাদের কে বলেছে শহরে আমরা এভাবে কথা বলি? আর দুই, আমরা তাদের ঘটি বলি ,তারা আমাদের বাঙাল বলে এ পর্যন্ত বুঝলাম। কিন্তু তারা বাঙালি, আর আমরা বাঙালি নই এ কথাটির অর্থ কী? বাংলাদেশে সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী সহ বহু জায়গার বাংলা ভিন্ন, যেগুলো আমরা বুঝি না বা বলতে পারি না। কিন্তু তারপরও সেগুলো বাংলার মধ্যেই পড়ে। পশ্চিম বঙ্গের ভাষা এবং বাংলাদেশে ব্যবহৃত সকল ভাষা আমরা কিন্তু একই বাংলা বর্ণমালায় লিখি। আমাদের বলার ধরণ, বা ব্যবহৃত শব্দ আলাদা হতে পারে কিন্তু লিখতে গেলে আমাদের সবাইকেই সেই একই বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করতে হয়। এপার-ওপার পুরোটা মিলেই তো বাংলা আর বাঙালি। তাহলে এরকম অদ্ভুত ভাগ কোথেকে আসলো? ঘটি আর বাঙাল বললে বোধগম্য হতো, কিন্তু বাঙালি আর বাঙ্গাল কিছুতেই মাথায় ঢুকলো না।

আমাদের দেশটার নাম বাংলাদেশ, ভাষা আন্দোলন আমরা করেছি, একুশে ফেব্রুয়ারিকে আমাদের কারণেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এরপর যদি শুনতে হয় বাঙালি শুধু তারা, তাহলে কারণ খুঁজতে চাওয়া অস্বাভাবিক না।

অনেকে বলবেন এতে কিছুই এসে যায় না। ওরা যা খুশি দেখাক, যা ভুলভাল ভাবতে ইচ্ছে করে ভাবুক। আমরা কি ওদের নিয়ে কম মজা করি নাকি? ওদের শ কে স উচ্চারণ করা শুনে আমরাও তো বিরক্ত হই। ওদের এয়েচ, গিয়েচ, চান করেচ শুনলে আমরাও তো কত হাসাহাসি করি, ওদের টেনে টেনে সুর করে বাংলা বলাকে আমরা কত তাচ্ছিল্য করি, ওদের সব কথার শেষে গো (কেন গো, না গো) শুনলে আমরা ‘উফফ এত্ত ন্যাকা কেন’ বলে ভ্রূকুটি করি। ওরা তো ঘটি, ঘটিদের কথা এত সিরিয়াসলি নেয়ার কী আছে? আমার উত্তর হচ্ছে, আছে। আমি ওদের নিজের থেকে আলাদা করে দেখি না। আমি পূর্ব-পশ্চিম দুটো মিলেই বাংলা মনে করি। আমি চাইনা আমরা কেউ কারো সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে থাকি। আমি চাইনা কেউ কাউকে ছোট করুক, কেউ কাউকে নিয়ে হাসুক। আমি চাই দুপক্ষই একে অন্যকে সঠিক ভাবে জানুক আর মন থেকে আপন মনে করুক। ইলিশ মাছের প্রতি ভালোবাসা এক রকম হতে পারলে, রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধা এক হতে পারলে, পহেলা বৈশাখ উদযাপন এক হতে পারলে এবং সর্বোপরি লেখার বর্ণমালা এক হতে পারলে- আমরা কেন এক হব না?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button