ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

ট্রাকভর্তি উপহার পাঠালেন ওসি, প্রতিমন্ত্রীর প্রত্যাখান!

বর্তমান মন্ত্রীসভার একটা বিশেষ ইতিবাচক দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুর্নীতির বিপক্ষে সবাই মোটামুটি একাট্টা। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই মন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম সম্পর্কে সোচ্চার এবং দুর্নীতি রোধ করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবার তাগিদ দিচ্ছেন। সরকারের এই মেয়াদের এজেন্ডায় যে দুর্নীতি প্রতিরোধ করাকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই বার্তাটা নিশ্চয়ই সরকারের সকল পর্যায়ের কর্মচারী, কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে যাবার কথা। সুবিধা প্রাপ্তির আশায়, কাউকে খুশি করতে কোনো প্রকারের লেনদেন যে এই সময়ে বিপদ ঢেকে আনতে পারে সেই কথা সবারই তাই স্মরণ রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের মনে সুবিধা হাসিলের কুচিন্তা ঘুরপাক খায় তাদের।

অবশ্য, সিলেট গোয়াইনঘাট থানার ওসির কানে মনে হয় এখনো এসব তথ্য পৌঁছায়নি। তার কার্যকলাপে তা-ই তো মনে হয়! সিলেট চার আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ ইমরান খান। একই সাথে তিনি সরকারের নতুন মন্ত্রীসভার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমবারের মতো তিনি নিজ এলাকায় যান। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষদের কাছাকাছি থাকতে তেলবাজদের আগমণ ঘটা নতুন কিছু নয়। কিছু আন্তজার্তিক মানের তোষামোদকারী থাকে সবসময়ই যারা সুযোগ খোঁজে কিভাবে তোষামোদ করে তুষ্ট করা যায় ক্ষমতাবানদের।

স্বাভাবিকভাবে প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হওয়া বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ইমরান খানের ধারে কাছে এখন এরকম লোকেরা ঘুরঘুর করতে আসবে। এতে অস্বাভাবিকতা নেই। কিন্তু, সবাই অপ্রয়োজনীয় চাটুকারিতা পছন্দ করে না। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান খানও করেননি। গত বৃহস্পতিবার সকাল বেলা ঘুম থেকে তিনি লক্ষ্য করেন, তার বাড়ির সামনে ট্রাক। ট্রাকভর্তি খাদ্যসামগ্রী। এক ট্রাক খাদ্যসমেত এই উপহার প্রতিমন্ত্রীকে পাঠিয়েছে গোয়াইনঘাট থানার ওসি মোঃ আবদুল জলিল! ওসির এই উপহার পেয়ে মন্ত্রী খুশি হওয়ার বদলে ক্ষুব্ধ হন। তিনি এই উপহারভর্তি ট্রাক যে রাস্তা দিয়ে এসেছে সেই রাস্তা দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেন ওসির কাছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমি কখনোই কোনও উপহার গ্রহণ করি না। সে (ওসি) না জেনেই এগুলো পাঠিয়েছিল। আমি তা ফিরিয়ে দিয়েছি। আগামীতে কেউ যেন আমার কাছে কোনো উপহার না নিয়ে আসে বিষয়টি স্পষ্ট করতে ওইসব ফেরত পাঠিয়েছি।” 

ইমরান খানকে চিনতে ভুল করে ভালই লজ্জার মুখে পড়লো বেচারা ওসি। উল্লেখ্য, ইমরান খান সিলেট চার আসনের কিংবদন্তিতুল্য সাংসদ। এই আসন থেকে ৬ বার তিনি নির্বাচিত এমপি। শিক্ষিত এই মেধাবী রাজনীতিবিদ এলাকায় ক্লিন ইমেজের নেতা হিসেবে সুবিধিত। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি প্রবাসীদের সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন ইতিমধ্যে। মন্ত্রীকে উপহার পাঠানোর দুঃসাহস দেখিয়ে ওসি আবদুল জলিল নিজেই অপমানিত হলেন। উপহার ফিরিয়ে দেয়ার চেয়ে বড় অপমান কি আছে! তার চেয়ে বড় কথা আবদুল জলিল কি এই ঘটনার মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে আবারো প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ করে দিলেন না? একজন পুলিশ সরকারের কাজ করে। সরকার থেকে বেতন পায়। তার কি অর্থ এতই বেশি হয়ে গেছে যে, এক ট্রাক খাবার সে অবলীলায় উপহার পাঠানোর সক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে? আর যদি সেই সক্ষমতা অর্জন করেও থাকে; জনগণের সেবা করা তার মূল কাজ, মন্ত্রীকে খুশি করতে ট্রাকভর্তি খাবার পাঠানো নিশ্চয়ই তার কাজ না! রাজনৈতিক নেতার তোষামোদ করা তার কাজ না।

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান খান ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য, তিনি ওসি জলিলের এই কাজকে আশকারা দেননি। সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি এবং সততার যে নমুনা তিনি দেখিয়েছেন তাতে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। তিনি এর মাধ্যমে বুঝিয়েও দিলেন, তাকে উপহার দিয়ে খুশি করতে হবে না। তার কাছে কাজই হলো যোগ্যতার মাপকাঠি। সুবিধা হাসিল করতে চাওয়ার জন্য হঠাৎ উদয় হওয়া সব তোষামোদকারীদের ব্যাপারেই আসলে রাজনীতিবিদদের সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।

আর পুলিশ বাহিনীতে চাকরি এমন একটি পেশা, এটার সম্মান, মর্যাদা সবাই ধরে রাখতে পারে না। পুলিশ সম্পর্কে মানুষের বর্তমানে যেসব নেতিবাচক ধারণা কাজ করে সেসবের মূলে আসলে আবদুল জলিলের মতো লোকজনই বেশি দায়ী। যারা ভুলে যায় পুলিশ হিসেবে তাদের দায়িত্ব কি। পুলিশ কখনো কাউকে খুশি করার কাজ করে না। একজন আদর্শবান পুলিশ সেটাই করবে যেটা তার দায়িত্ব। এই দায়িত্ব ভুলে যাওয়া উচিৎ নয়। আশা করি ট্রাক ফেরত পাওয়ার পর ওসি আবদুল জলিলের স্মৃতিশক্তিও ফিরে আসবে, তার মনে পড়বে পুলিশ হিসেবে তার কি করণীয় আসলে…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button