ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

বাংলা নানী-এই বয়সেও সাইকেল চালিয়ে যিনি ছুটে বেড়াচ্ছেন মানুষের সেবায়..

তার নাম জহিরন বেওয়া। কিন্তু, তিনি এখন তার জনপদে মানুষের এতটাই আপন যে, লোকে তাকে বাংলা নানী বলে ডাকে। গ্রামের মানুষগুলোর কাছে জহিরন বেওয়া একটি পরম মমতাময়ী মানুষ, যাকে পাওয়া যায় আপদে বিপদে। জহিরন বেওয়ার জন্ম লালমনিরহাটে। এই জেলার আদিতমারী উপজেলায় ভেলাবাড়ী ইউনিয়নে তার নিবাস। ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা তালুক বারঘড়িয়া এলাকায় থাকেন তিনি।

জায়গাটা বেশ প্রত্যন্তই। এমন জায়গার মানুষ জহিরন বেওয়া আজ থেকে অনেকবছর আগে শুরু করেছিলেন স্বাস্থ্যসেবা। এখনো তিনি বিরামহীন ছুটে চলেন। দেখতে দেখতে ৪৫ বছরের মতো হয়ে গেল, এতগুলো বছর ধরে জহিরন বেওয়া লালমনিরহাটে নিজ উপজেলার ২০-৩০টি গ্রামে চিকিৎসাসেবা বিলিয়ে আসছেন বিনামূল্যে, শুধু ঔষধের টাকাটা নেন।

বাংলা নানী, জহিরন বেওয়া
image source- prothomalo.com

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কিছু আগে জহিরন বেওয়া স্বামীহারা হলেন। ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার টানা বেশ কষ্টের। অভাব অনটন লেগেই থাকে। এবাড়ি ওবাড়ি গিয়ে কিছু কাজ কর্ম করে কোনোরকম চলতো। কিন্তু এভাবে কি দিন যেতে পারে! জহিরন বেওয়ার মনে হলো কিছু করা দরকার। তিনি তখনকার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের অনুরোধে পরিবার পরিকল্পনা মাঠকর্মী রেহানা খাতুনের মাধ্যমে শুরু করলেন ধাত্রী ও সেবিকার কাজ।

আশির দশকে তিনি সরকারের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে অস্থায়ী ভিত্তিতে ধাত্রী ও সেবিকা হিসেবে কাজ পান।সেখানে তার কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়। এমনিতে তিনি খুব বেশিদূর পড়ালেখা করতে পারেননি। কিন্তু, কাজটা তিনি বুঝতেন এবং সম্ভবত ভালবেসে ফেলেন। সেই কারণে, তিনি গ্রামের লোকজনের টুকিটাকি স্বাস্থ্য সমস্যায় সেবা দিতেন। সমস্যা গুরুতর হলে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যাপারটা তিনি রপ্ত করেন।

যাহোক, সরকারের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ধাত্রী ও সেবিকার কাজ থেকে অবসর নেন ১৯৯৫ সালে। নব্বুইয়ের দশকে একটা সাইকেল কিনেছিলেন তিনি, ১২০০ টাকায়। এর আগে পায়ে হেঁটে কাজ করতে হতো। সাইকেল শেখার জন্য বয়সটা একটু বেশি হলেও, গ্রামবাসী অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো জহিরন বেওয়া নিজের প্রচেষ্টায় সাইকেল চালানো শিখে নিলেন। সেই সাইকেল দিয়ে তিনি উপজেলার গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন। এখনো তিনি এই কাজ করে যাচ্ছেন। বয়সটাকেও হার মানিয়ে তিনি কি উদ্যম নিয়ে শুরু করেন একেকটা নতুন দিন। পরিচয়পত্রের হিসেবে বয়স তার ৭২, কিন্তু এটা আসল বয়স নয়। তার ছেলে তোরাব আলীর ধারণা মায়ের বয়স আরো বেশি হবে, অন্তত আশির উপরে। সে চায় না এই বয়সে মা সাইকেল নিয়ে এভাবে ঘুরুক। কিন্তু, জহিরন বেওয়ার উদ্যমকে হার মানাবে কে!

বাংলা নানী
image courtesy – Daily Star

একবার তো তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচনেও দাঁড়িয়েছিলেন। যদিও, সেবার সাফল্য পাননি অল্পের জন্য। পরে আর নির্বাচন করেননি, প্রিয় কাজটাতেই সময় দিয়ে গেছেন। তার মতে, “ভোটে পারি নাই, কিন্তু সব সময় মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াই। টাকার বিনিময়ে কিছু ওষুধ বিক্রি করি। রোগীর সমস্যা বেশি হলে হাসপাতালে যেতে বলি। আমি যত দিন বেঁচে আছি, এই কাজ করে যেতে চাই।”

এখন ৩০টার মতো গ্রামের হাজারো পরিবার তাকে চেনে। তিনি সবার খোঁজ নেন। কারো সমস্যা হলে দেখেন, ঔষধ দেন। ঔষধ বিক্রির টাকায় তার সংসার চলে। কিন্তু, যে সেবাটা তিনি তা একদমই বিনামূল্য। গ্রামবাসী এই মহিয়ষী নারীকে ভীষণ শ্রদ্ধার চোখে দেখে। তাকে ডাকে বাংলা নানী বলে।

বাংলা নানী, জহিরন বেওয়া, লালমনিরহাট

আমাদের গ্রাম্য সরল নানীরা যেমন সারাক্ষণ একটা ব্যতিব্যস্ততায় থাকেন কাজ কর্ম নিয়ে, মায়ার চাঁদর বিঁছিয়ে সংসারের পুরোটা আগলে রাখেন, সবাইকে নিয়ে চিন্তা করেন জহিরন বেওয়াও তেমন। তার মায়ার সীমা পরিসীমা ছড়িয়ে আছে উপজেলার গ্রাম থেকে গ্রামে। গ্রামের মানুষগুলো এখন তার নিজের মানুষ, সবার কথা তিনি ভাবেন। তাই এখনো এই বৃদ্ধ বয়সেও তিনি ছুটেন প্রতিদিন। লোকে সাইকেলের টুংটাং শুনেই বুঝে, এসে গেছেন বাংলা নানী বাড়ির দুয়ারে…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button