সিনেমা হলের গলি

বাংলা সিনেমা: শর্ষের ভেতর ভূত, তাড়াবে কে!

এই দেশে আর যাই হোক হতাশাবাদীরা যেমনটা বলে, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি একদিন বিলীন হয়ে যাবে; কিংবা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দিলেই তো হয়! তেমনটা আসলে কখনো হবে না। ‘অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়া, তেলাপোকা টিকিয়া যাওয়া’র মতো ধুঁকে ধুঁকে হলেও এদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি টিকে যাবে। প্রত্যেকবার ফিনিক্স পাখির মতো ছাই ভস্ম থেকে জন্ম নেবে নতুন আরেকটি সময়। অনেকেই বলে, বাংলা সিনেমা থার্ডক্লাশ। তাহলে এটাও বলা যায় পোড়খাওয়া থার্ডক্লাশরাই ওম দিতে থাকবে ঘুণে ধরা, ছারপোকা খাওয়া সিনেমা হলের সিটগুলোকে। এরপর প্রিভিলেজড সময়ে আসবে নতুন দিন। সিনেমার আরেক স্বর্ণযুগ।

ভূমিকা শেষ, আসুন একটু পেছনে ফিরে যাওয়া যাক। সালটা সম্ভবত ১৮৯৫, লুমিয়ার ভাইয়েরা ছোট ছোট কিছু নির্বাক এবং সাদাকালো সিনেমা বানিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরো দুনিয়া। এরপর খুব অল্প দিনেই, তরতর করে সিনেমার স্বর্গরাজ্য বিস্তার লাভ করেছে। ১৯২০ সালের মধ্যেই শৈশব-কৈশোর ছেড়ে, সিনেমা দুনিয়া একেবারে যৌবনে পা দেয়। ১৯২৯ এর মধ্যেই চলচ্চিত্র নিজের মুখের ভাষাও পেয়ে যায়। আর এসবের ফাকেই ভারতীয় উপমহাদেশেও সিনেমা ঢুকে পরে হীরালাল সেন, দাদা সাহেব ফালকের হাত ধরে। সেই সময়েও কিন্তু বিদেশি সিনেমার শরীর এবং ছায়া থেকে বাঁচিয়ে এই উপমহাদেশের সিনেমাকে দাঁড় করাতে হয়েছে। বর্তমান যুদ্ধটা, অতীতের সেই শুরুর দিন থেকেই শুরু।

সেই সময়কার পূর্ব বাংলা, বর্তমান বাংলাদেশে ১৯০০ সালের দিকে নির্বাক এবং ১৯৫০ সালে সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন শুরু হয়। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের আগ্রহটাও সৃষ্টি হয় তখনই। তারপর, এদেশে সিনেমার একটা শক্তপোক্ত অবস্থান করে নিতে প্রায় ৫০ বছরের মত সময় লেগেছে। এরপরের গল্পটা বেশ ঝরঝরে।

আশি-নব্বই এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮০টির মত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেতো। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে যাচ্ছে ক্রমানুপাতিক হারে। অবশ্য সংখ্যার বিষয়টি নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই খুব একটা, কারণ এই মাত্রা ওঠানামা করে। সংখ্যার সাথে গুণগত মানের সম্পর্ক নেই। বছরে তিনটা সিনেমা মুক্তি পেলেও সমস্যা নাই, যদি তা দর্শক মনে দাগ কাটে।

আচ্ছা এখানে একটু দম নেয়া যাক। ওই ৯০ এর দশকে একটু ঘুরে আসি চলেন। আমাদের জন্য একটা উন্মাদনার নাম এই ‘৯০। আমার বয়সীদের জন্য তো চরম নস্টালজিয়ার সময়। পিং পং, গুলতি, মার্বেল, গোল্লাছুট, তিন গোয়েন্দা, শক্তিমান, আলিফ লায়লা, আজ রবিবার, ছায়াছন্দ, ভিসিআর, বিটিভি, শুক্রবারের সিনেমা, দলে দলে লোকজন, সিনেমা হল, উৎসব।

যেটা বলছিলাম, সেই সময় কিংবা তারো আগে থেকে সিনেমা দেখা একটা উৎসব ছিলো এ দেশে। সিনেমার আগে ছিলো মঞ্চনাটক, যাত্রাপালা। স্বাধীন দেশের পথচলা আর বাঙ্গালি মধ্যবিত্তের বিকাশের সময়টা সমান্তরাল। ওই সময় সিনেমাহলগুলোতে ছিলো উপচে পড়া ভীড়। তাই জেলা শহর তো আছেই, মফস্বলেও রমরমিয়ে চলতো সিনেমা হলগুলো। কিন্তু এই সুসময় খুব বেশিদিন থাকেনি। হঠাৎ করেই বাংলাদেশের সিনেমার মোড় ঘুরে যায়। সিনেমায় মারিং, কাটিং ভায়োলেন্স, খুল্লাম খুল্লা, গারাম-মাশালা তত্ত্বের আবিস্কার একটা বড়সড় ধাক্কা দেয় সবাইকে, যা মধ্যবিত্ত দর্শকের মনে সিনেমাহল সম্পর্কে ভয়ের জন্ম দেয়। তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় হল থেকে।

এর ফলে, ধ্বস নামে বাংলা চলচ্চিত্র ব্যবসায়। একের পর এক বন্ধ হয়ে যায় সিনেমা হল। এই কিছুদিন আগেও দেশে সিনেমা হল ছিলো প্রায় দেড় হাজার, আর এখন তার অর্ধেক। নাজ, লায়ন, তাজমহল সিনেমা হলগুলোর নাম ঢাকা পড়েছে অনেক আগেই। পর্যায়ক্রমে মফস্বলের হলগুলোও উঠে যাচ্ছে একে একে। কিন্তু এর জন্য কারা দায়ী?

দর্শক বলে সিনেমাসংশ্লিষ্টরা, তারা বলে দর্শক! এই শর্ষের ভূত কিলিয়ে লাভ নেই আসলে। যাহা বলিবো সত্য বলিবো, ‘দেশা দ্য লিডার’ সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম আটজন বন্ধু মিলে। ব্লকবাস্টার সিনেমাসে। ঝকঝকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সিনেমা হলে অই আটজন ছাড়া স্রেফ মাছি তাড়াবার জন্যেও আর কোন দর্শক ছিলো না। আমরাও শেষ পর্যন্ত, শেষ করতে পারিনি। দুইজন ঘুমিয়ে যাওয়ার পর, বাকিরা বের হতে বাধ্য হয়েছি হল থেকে।

এই পরিস্থিতিতে আইম্যাক্স থিয়েটারের ব্যবস্থা করলেও দর্শক পাবেন না কেউই। এখন প্রশ্ন হলো আমাদের সমস্যাটা আসলে কি? সোজা উত্তর। সংকট! কিসের সংকট? নায়ক, পরিচালক, টাকা, নায়িকা? হয়তো সবকিছুরই, আবার বলা যায় কিছুরই না। সংকট নাম্বার এক, নায়ক? এক সালমান শাহ্ই তো টানা কাজ করে একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়ে গেছেন বাংলা চলচ্চিত্রকে। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে শুরু করে ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, সেতো এক ক্যারামতি ব্যাপার। এখনো আছেন, শাকিব খান। প্রত্যেক যুগেই অনেকের মধ্য থেকে, একজন হাল টেনে রেখেছেন। আর চাইলে গল্পের খাতিরে নায়ক-নায়িকা যে তৈরি করা যায়, সেই উদাহরণ তো হরহামেশাই দেখি। সংকট নাম্বার দুই, টাকা? এই অযুহাত দিয়ে চালানো যেতে পারে। বাজেট নাই। কিন্তু, প্রচুর প্রচুর মাস্টারপিস আছে তো চলচ্চিত্রের ইতিহাসে, কম বাজেটে নির্মিত। মাস্টারপিস বাদ দেই, প্রচুর মালয়লাম সিনেমা আছে যেগুলোর বাজেট খুবই অল্প। আহা! মালয়লাম সিনেমার কথা মনে হতেই মনে হলো, আসলে এতো সংকট ডেকে লাভ নাই। সোজা কথা, আমাদের ভালো গল্প নাই। ভালো গল্প বলিয়ে নাই। গল্প থাকলে আর কিছু লাগে না। একটা ডায়ালগ, কিসিং সিন, আইটেম নাম্বার না দিয়েও কিম কি দুক টানা তিন ঘন্টা আপনাকে এক চুল না নড়িয়ে পর্দায় আটকিয়ে রাখতে পারেন কিসের জোরে? মালয়লাম সিনেমার নায়িকাগুলো মোটা ফ্রেমের চশমা, ছোট ছোট কার্লি চুল আর মুখে ব্রণ এর দাগ নিয়েও আপনাকে টানে কেনো? বোরখা পরা ইরানি মেয়েগুলা, মেকআপহীন ভোলাভালা বাচ্চাগুলা?

এই প্রশ্নগুলোর একটাই উত্তর গল্পমেকিং। পুরোটাই গল্প আর মেকিং এর জাদু।

মেকিং; শাকিব খানকে হাফলেডিস বলে মক করা অনেকেই, ‘শিকারি’ সিনেমার শাকিবকে দেখে নড়েচড়ে বসেছিলো। কি ম্যানলি এন্ট্রি! লুকটা জোশ মামমা! গ্যাপটা আসলে কোথায় তাহলে? অন্যান্য দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির দিকে তাকালেই বুঝতে পারা যায়, গ্যাপটা কোথায়?

যেকোন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির চলচ্চিত্রেই গল্প উঠে এসেছে নানা জায়গা থেকে- প্রেম, কবিতা, জীবন, যুদ্ধ, খেলা, ভূত, কমেডি, মিথ, ইতিহাস ব্লা ব্লা। কিন্তু আমরা যেনো একটা ট্রায়াঙ্গল এ আটকে আছি। প্রেম-বিরহ-ফাইট! যখনই গল্পে ভিন্নতা এসেছে তখনই কিন্তু সেটা ক্লিক করেছে ম্যাজিকের মতো; উদাহরণ, বেদের মেয়ে জোসনা, শত্রু, রংবাজ, মাটির ময়না, মনপুরা, আয়নাবাজি। এর মধ্যে ‘শত্রু’ এবং ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ এতোই সফলতা পায় যে, তা যথাক্রমে বলিউডে আর টলিউডে রিমেক পর্যন্ত হয়।

অথচ এই রিমেক আর নকলের তোপে পরে আমাদের সিনেমাই এখন হারাতে বসেছে নিজের অস্তিত্ব। নকল যে আগে হতোনা তা কিন্তু নয়, আগেও হতো। সত্তর দশক থেকেই রিমেক হতো, যৌথ প্রযোজনা, এমনকি উর্দুতেও সিনেমা নির্মিত হতো। কিন্তু, খুব অল্প দিনেই নির্মাতারা সেইসব ঘেরাটোপ থেকে বেড়িয়ে একটা নিজস্ব স্টাইল তৈরি করে ফেলেছিলেন। কিন্তু এখন কেমন একটা ঝিমঝিম স্থবিরতা এসেছে। সবাই যতো এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি।

কিন্তু পিছিয়ে লাভ কি! টিকে থাকতে হবে, আগাতে হবে। যুগের চাহিদা বুঝতে হবে। গ্লোবালাইজেশনের যুগে এসে, এই থ্রিডি সিচুয়েশনে বসে কেউই আর পুতুপুতু প্রেমের ন্যারেটিভ শুনতে চায় না, এই বিষয়টা যতো তাড়াতাড়ি বুঝবেন সিনেমাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ততোই মঙ্গল।

চারটা সিনেমা বানিয়ে সাইবেরিয়া থেকে পুরস্কার আনলেন আর সিনেমা হলে সেই সিনেমা ঘু ঘু চড়ালো, আপনি বোদ্ধা মহলে বুঝালেন এই দেশের আম-দর্শক দিয়া কিচ্ছু হবে না। এরা সিনেমা বোঝেনা! ওইটা কিন্তু আপনার জীবনের এনজি শট। আপনার দর্শক ইংরেজি, চাইনিজ, কোরিয়ান, জাপানিজ, থাই, আরবি; আন্নামা কুন্তেন পান্দামো পেন্নাই বুঝে; খালি আপনারটাই বুঝে না। তাইলে যেমনে বুঝে, বোঝান।

চলচ্চিত্র একটি শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম। আর আমরা জাতি হিসেবে আমুদে। তাই শুরুতে যা বলেছিলাম, আমাদের সিনেমা কিন্তু টিকিয়াই যাবে। শুধু দরকার শক্ত কারিগরের। যে কাদামাটি থেকে তৈরি করবে এক সুন্দর অবয়বের। সুন্দর সুন্দর গল্পের জন্ম নেবে নতুন সময়ে। তাই এমন আশা করাই যায়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সার্চ ইঞ্জিনে আমরা রেখে যাবো ভিউকার্ডে মোড়ানো সুন্দর ইতিহাস। আমাদের নিজস্ব কিছু গল্প হবে, উত্তরণের।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button