ইনসাইড বাংলাদেশ

প্রশাসনের কানও কি মাটিচাপা পড়েছে?

পাহাড়ের মানুষের জীবনটা নিয়ে অনেকক্ষণ ঝিম মেরে চিন্তা করলাম, অনেক চিন্তা করেও কুলকিনারা করতে পারলাম না। একটা হিসাবে খুব গড়মিল পাকিয়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে ভাবছি, আমি যদি মারা যাই তাহলে কি সুন্দর প্রক্রিয়ায় ঘর কেটে কবর খুঁড়ে মাটি চাপা দেয়া হবে। শেষ বিদায়টাও হবে কত আয়োজন করেই!

কিন্তু পাহাড়ের মানুষ! হতভাগ্যের দল। তারা দেখি, জীবিত অবস্থায় মাটির নিচে চাপা পড়ে। তারপর ছটফট করার সুযোগটাও তো পায় না। মাটির সাথে দেহ একাকার, শুধু প্রাণটাই থাকে না আর। কেন? এমন মরণই কি কপালে লেখা থাকবে ওদের! দায়টা কার?

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭। প্রথম আলোর চিঠিপত্র বিভাগে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি থেকে অজিত লাল চাকমার একটি চিঠি প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে তিনি লিখেছেন, রাঙ্গামাটিতে অবাধে পাহাড় কাটা হচ্ছে, গাছপালা কাটা হচ্ছে। তার চিঠি থেকে দুটি লাইন তুলে দিচ্ছি,

“পাহাড় কাটার কারণে বেশ কিছু বনজঙ্গল কাটা পড়েছে। ন্যাড়া হয়ে পড়েছে বিভিন্ন পাহাড়ের বিশাল এলাকা। এভাবে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। ঘটবে মারাত্মক ভূমিধস।
সময় থাকতে যদি আমরা সচেতন না হই, তাহলে পরবর্তীকালে আমাদেরই পস্তাতে হবে।’’

সময় থাকতে সচেতন আর হলো না কেউ। দেড়’শর অধিক প্রাণচলে গেলো চোখের পলকে। পাহাড়ধসে মৃত্যুর ঘটনা এই প্রথম না বাংলাদেশে, আগেও অনেকবার হয়েছে। সম্ভবত এ কারণে, কারো খুব একটা গায়েও লাগছে না ব্যাপারটা।

২০০০ সালের পর বেশ কয়েকবার বড় রকমের পাহাড় ধস হয়েছে। তাতে প্রতিবারই শ’খানেক মানুষের মৃত্যু যেন নিয়মিত ঘটনা। একশ, দুইশ মানুষ মারা গেলে আজকাল কি হয়? তেমন কিছুই হয় না। মারা যায় কারা? পাহাড়ি আদিবাসীরা। তাদের জীবনের দাম আর কয় টাকা! তার চেয়ে পাহাড়কাটা চলুক, চলুক না গাছপালা কেটে ছাড়খাড় করে দেয়ার উৎসব! প্রভাবশালীরাই ভালো থাকুক। সাধারণ জনগন আর গনমাধ্যম কদিন গলা ফাটাবে , মাঝে মধ্যে নিউজ করবে। তাতে কি আসে যায়! দেড়শ মানুষের ধাক্কাটা সামলে নিলেই তো আবার এক বছরের জন্য নিশ্চিন্ত। আগামী বর্ষায় আবার এমন এক দেড়শো মরবে হয়ত। তার আগ পর্যন্ত সমস্যা নাই, একদম নিশ্চিন্ত থাকা যাবে নিশ্চিত! মিডিয়া একটু ভ্যাজর ভ্যাজর কমালেই আবার পাহাড় কাটা উৎসব চালু করবেন প্রিয় প্রভাবশালী দাদারা। সেই কাটা পাহাড়ে দেশের কোন অঞ্চল উন্নত হবে আর পাহাড়িরা প্রতি বছর মারা যাবে শখানেক করে। কেউ বলার নাই, তাই চালিয়ে যান নিশ্চিন্তে।

আমরা বলবো? আরে আমরা তো, অপঘাতের মরণ দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্থ হয়ে উঠেছি। তাছাড়া রিমোটের একচাপে চ্যানেল বদল করে দিলেই সব ঠিক, নাচগান দেখা যাবে। এত এত চ্যানেল এখন, খামাখা মৃত্যুর খবর দেখে মুড নষ্ট করার কি দরকার? ফেসবুকেও খুব একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো না পাহাড়ধসের ঘটনায়, কেন হলো না সেটাও এক আশ্চর্যের বিষয়। হয়তো, বছরে এক আধবার পাহাড়ি অঞ্চলের হাওয়া খেতে ঘুরতে যাওয়া এলিট সম্প্রদায়ের মানুষেরা ঠিক বুঝলো না, কতটা ভয়াবহ সেখানকার চলমান সংকট। নয়তো, ওরা পাহাড়ি বলেই…

যাই হোক, যে অবস্থা দেখছি মাটির উপরে যারা এখনো বেঁচে আছে তারা আছে আরো বেশি কষ্টে। এখনো বৃষ্টিপাত চলছে, আবারো পাহাড় ধ্বসের আশংকা করা হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে অনেক জায়গায়। সহসাই ঠিক হবে এমন সম্ভাবনা ও নাই। খাদ্য, জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না সেখানে। সড়ক তলিয়ে গেছে  গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি জায়গায়। সরবরাহের অভাবে সংকটে পরেছে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও ঔষধ সামগ্রী। এদিকে কারা যেনো সেই সুযোগে টাকার গন্ধ পেয়ে গেছে, তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্য বাড়তি দাম হাঁকাচ্ছে।

রাঙ্গামাটি জেলা সদরে চারটা পেট্রোলপাম্পসহ সাধারণ দোকান-পাটে যা জ্বালানি ও খাদ্য-দ্রব্য মজুত ছিল তা প্রায় শেষ। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছেন তারা। খাবার পানি ও খাদ্য সংকটে জীবন হুমকির মুখে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর।

সুচয়ন চাকমা কিংশুক নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন,

“আলুর কেজি এখন রাঙামাটিতে ১০০ টাকা। মরিচের কেজি ৭০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। একেকটি ডিমের দাম হাকানো হচ্ছে ১৮ থেকে বিশ টাকা। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাচলের জন্য যে কয়েকটি যানবাহন চলছে জ্বালানির অভাবে আস্তে আস্তে সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেগুলো চলছে সেগুলোতেও ভাড়া হাকানো হচ্ছে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ। গ্যাস সিলিন্ডারের মুল্য হুহু করে বেড়ে গিয়েছে। রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় বাইরে থেকে সহজে ত্রাণ পাঠানো যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসক বলছেন, ত্রাণের অভাব নেই। অথচ গত চারদিনে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অনেকে ভাত খেয়েছেন এক থেকে দুই বেলা। এই মুহূর্তে সরকারিভাবে সাহায্য না পেলে রাঙামাটি বা অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলগুলি আরো ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হবে”।

জেলা প্রশাসক বলছেন, ত্রাণের অভাব নেই। কিন্তু কোথায় গেল এত ত্রাণ? এত ত্রান তাহলে মানুষ কেন না খেয়ে থাকবে?

বাংলা ট্রিবিউনে পড়লাম, আর্মি পাড়ার এক বাসিন্দা শাহ আলম বলেছেন, “শুকনো বিস্কিট,আর অল্প কিছু চাল দিয়ে কী হয়? সামনেই ঈদ। আমাদের এখনই পরার মতো কোনও কাপড় নাই। আমার বাচ্চারা ঈদের দিন কী পরবে? আমি কী করে তাদের কাপড় কিনে দেব? লোক দেখানো সরকারি এসব সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন নাই।”

আমি জানতে চাই, প্রশাসনের কানও কি মাটি চাপা পড়েছে? শুনতে পান না অভুক্ত কন্ঠের আর্তনাদ?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button