মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

রাস্তায় ভিড় জমিয়ে ক’খানা জীবন রক্ষা করলেন জাঁহাপনা?

বিশ্বের আর কোন শহরে এই দৃশ্য দেখা যাবে না। কোথাও গর্ত খোঁড়া হচ্ছে, রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে, গ্যাস বা পানির লাইন বসানো হচ্ছে, আর সেটার সামনে বিশ-ত্রিশ-পঞ্চাশজন মানুষ জড়ো হয়ে আছে- এই অদ্ভুত ব্যাপারটা শুধু ঢাকা শহরেই দেখতে পাওয়া যাবে। এই শহরের বহুতল ভবনে আগুন লেগে যখন মানুষ পুড়ে মরে, আট-নয়তলার জানালা দিয়ে যখন মানুষগুলোর আহাজারি আর বেঁচে থাকার আকুতি শোনা যায়, তখন একদল মানুষ অবিবেচকের মতো রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করে বসে, যেন আকাশ থেকে ইউএফও নেমে আসছে, এই দৃশ্য মিস দেয়া যাবেই না! তাদের ভিড়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পর্যন্ত ঘটনাস্থলে যেতে পারে না!

গতমাসে চকবাজারে দেখা গিয়েছিল এসব অকাজের ধাড়িকে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারছে না পুরান ঢাকার সরু গলি দিয়ে, সেখানে মানুষজন ভীড় করে আছে! আজ বনানীতেও একই চিত্র। হাজার হাজার মানুষ রাস্তা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে, এসেছে তামাশা দেখতে! যেন এখানে লাইভ কনসার্ট হচ্ছে, চলছে বলিউডি কোন সুপারস্টারের লাইভ পারফরম্যান্স! এফ আর টাওয়ারে যখন শত শত মানুষ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্যে আহাজারি করছে, তখন কাজকর্মহীন এসব কোষ্ঠ্যকাঠিণ্য রোগীরা মোবাইল ফোনে ছবি তোলা আর ভিডিওধারণে ব্যস্ত, কেউবা ফেসবুক লাইভে জানাচ্ছে আপডেট!

কনসার্ট চলছে!

আগুন লেগেছে, সবচেয়ে দরকারী কাজ হচ্ছে আগুনটাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে যতো দ্রুত সম্ভব আটকা পড়া লোকজনকে উদ্ধার করা। কয়েকটা সেকেন্ডের দেরীতেও ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে দশটা মানুষের মৃত্যু হয়ে যেতে পারে, আগুনের লেলিহান শিখা পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে একটা মানুষকে অঙ্গার বানিয়ে ফেলতে পারে। সামান্য বিবেচনাবোধ থাকলেও তো এই সময়ে রাস্তা আটকে ছবি তোলা বা ভিডিও করার কথা নয় কারো!

কিন্ত আমাদের দেশে তো মানুষের চেয়ে অমানুষ জানোয়ারের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। নিজেদের পরিচয়টা দেয়ার জন্যে সর্বক্ষণ মুখিয়েই থাকে তারা। এফ আর টাওয়ারের সামনে পেছনে রাস্তাজুড়ে কেবল মানুষের ঢল, সেই ঢল সরিয়ে যে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকবে, সেই জায়গাটা পর্যন্ত নেই! পুলিশ এসে লাঠিচার্জ করে সরাতে হয়েছে উৎসুক জনতাকে!

ছবি না তুললে জীবনের ষোলআনাই বৃথা!

মানুষজনের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য্যের কোন এক নিদর্শন বুঝি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে! ভবনে লাগা অগ্নিকাণ্ড দেখতে যতো মানুষ জড়ো হয়েছে, এত লোকজন বোধহয় পহেলা বৈশাখে টিএসসির কনসার্টেও হয় না! এরা কেন এসেছে এখানে, এই প্রশ্ন করলে একজনও মনে হয় না সন্তোষজনক কোন জবাব দিতে পারবে। এমনকি ঢাবির ভিপি নুরুও দলবল নিয়ে এসে হাজির হয়েছেন সেখানে! ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তিনি কোন মহান কার্যোদ্ধার করে ফেলেছেন সেটা অবশ্য জানা যায়নি এখনও।

‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ নামে একটা সিনেমা মুক্তি পাবে আগামীকাল। সেটার ট্রেলারে একটা ডায়লগ আছে- ‘এই বালের শহরে সবকিছুই উল্টাপাল্টা। বারো মিলিয়ন মানুষ রাতদিন একজন আরেকজনের সামনে পিছনে ঘেউ ঘেউ করে…’ বনানীতেও আজকে সেই ঘেউঘেউ পার্টির তাণ্ডব চললো অনেকক্ষণ ধরে। মানুষের জীবনের চেয়ে যাদের কাছে ছবি তোলা বা ফেসবুক লাইভে যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ, তাদেরকে চারপেয়ে কোন জন্তুর নামে গালি দিলেও সেই জন্তুটাকে অপমান করা হয়। অক্ষম আক্রোশে শুধু লাইভ ফ্রম ঢাকা সিনেমার নায়কের মতো বলতে ইচ্ছে করে, বালের শহর, বালের মানুষ!

আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নামছে ইউএফও, দেখতেই হবে!

এরমধ্যেও ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকে জায়গা করে দিতে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা চেষ্টা করে গিয়েছে প্রাণপন, মানুষের চেহারায় হাতে মোবাইল নিয়ে ঘুরতে থাকা অমানুষগুলোকে একপাশে সরিয়ে রাস্তায় জায়গা তৈরি করেছে, সেখান দিয়ে ঢুকেছে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। একটা দেশে আগুন লাগা জায়গায় দমকল কর্মীদের নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে দিতে যখন স্বেচ্ছাসেবক দরকার হয়, পুলিশ বা সেনাবাহিনীকে লাঠিচার্জ করতে হয়, সেই শহরকে বাসযোগ্য বলা যায় না, কোনভাবেই না। ফায়ার সার্ভিসের কাজ আগুন নেভানো, সেটার পরিবর্তে বোধহয় এখন থেকে তাদেরকে আগে অতি উৎসাহী দোপেয়ে ছাগলদের ওপরে গরম পানি ছিটিয়ে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, উদ্ধার অভিযান বা অন্য সবকিছু হবে সেকেন্ড প্রায়োরিটি!

হাজারো অমানুষের ভিড়ে অল্প ক’জন মানুষও ছিলেন!

আর যারা আজ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সাক্ষী হতে মোবাইল নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন এফ আর টাওয়ারের সামনে, এই লোকগুলার উচিত, অনতিবিলম্বে ‘বাংলাদেশ লাইফলেস সোসাইটি’ নামের একটা সংগঠন খুলে সেটার রেজিস্ট্রেশন করে ফেলা। তারপর এলাকাভিত্তিক কমিটি দেয়া। ঢাকার কোথায় আগুন লাগলে, দুর্ঘটনা ঘটলে বা রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হলে, কোন ঘটনায় কারা ছবি তুলবে, ভিডিও করবে বা ফেসবুকে লাইভে আসবে- সেসব দায়িত্ব বন্টন করে দেয়া। এত গুরুত্বপূর্ণ ‘কাজ’ যেহেতু করতেই হবে, এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে না করে একটু গুছিয়ে নেয়া হোক সবকিছু…

‘রেখেছো বাঙালি করে, মানুষ করোনি!’- লাইনটা একশো বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক কি বুঝে লিখেছিলেন তিনিই ভালো জানেন। ২০১৯ সালে এসেও কথাটা এত বেশি প্রাসঙ্গিক, ভাবতেও অবাক লাগে! চারপাশে হাজার হাজার লাইফলেস মানুষজন দেখে মনে হয়, বাঙালি হওয়াটাই এদের একমাত্র গৌরবের অর্জন, মানুষ হবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা কারো মধ্যে নেই, কোনদিন এই চেষ্টাটা আসবেও না।

Image Courtesy- Facebook.

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button