খেলা ও ধুলা

তফাৎটা শুধু চাঁদ-তারায়!

অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে আজ উন্মোচন করা হলো ২০১৯ বিশ্বকাপের বাংলাদেশ দলের জার্সি। তবে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে উদ্বোধন হওয়া জার্সিটা দেখে সেটার মধ্যে বাংলাদেশী কোন ছাপ খুঁজে পাওয়া গেল না। বরং সেটাকে দেখে মনে হলো, এটা বুঝি পাকিস্তান দলের জার্সি, অথবা আয়ারল্যান্ডের জার্সি। ওপরের অংশের হালকা সবুজ রঙের সঙ্গে গাঢ় সবুজ ট্রাউজারই বলে দিচ্ছে সাদৃশ্যটা। জার্সির সামনের অংশে ইংরেজীতে বাংলাদেশ লেখাটা, এবং চাঁদ-তারার প্রতিকৃতি না থাকা বাদে আর কোন ব্যাপারেই পাকিস্তানের জার্সির সঙ্গে অমিল খুঁজে পাওয়া যাবে না বোধহয়।

জার্সির ডিজাইন সম্বন্ধে খুব ভালো ধারণা নেই আমার। একটা জার্সি ডিজাইন করা নিশ্চয়ই সহজ কিছু নয়, মোটামুটি জটিল কাজই হবে এটা। কিন্ত সেই কাজের আউটপুট যদি এরকম কিছু হয়, তাহলে এত কষ্ট করে লাভ কি? একটা দেশের জাতীয় দলের জার্সি কেন অন্য একটা দলের জার্সির সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি মিলে যাবে? তাও কিনা এমন একটা দেশ, যাদের সঙ্গে কিনা আমাদের জন্মের শত্রুতা!

এর আগে অনেক রকমের ডিজাইনের জার্সিতেই বাংলাদেশ দল খেলেছে। ডিজাইনে ভিন্নতা ছিল, কিন্ত জার্সিতে লাল আর সবুজের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আমাদের পতাকার দুটি রঙের কমতি কখনোই ছিল না জার্সিতে। এবারই প্রথম, হালকা সবুজ জার্সিতে লালের কোন ছোঁয়া নেই। যেন লালের সঙ্গে ডিজাইনারের কোন বিরোধ ছিল!

নূজহাত চৌধুরীকে আপনারা অনেকেই হয়তো চিনবেন না। শহীদ বুদ্ধিজীবি ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে তিনি। নূজহাত একবার বলেছিলেন, পতাকার ওই লাল বৃত্তটায় তার বাবার দু’ফোঁটা রক্ত লেগে আছে, সেটা আমরা অনেকেই জানি না। যে লাল বৃত্তটা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদ মানুষগুলোর কথা বলে, তাদের রক্তস্নাত অবদানের কথা বলে, সেই লালকে ছুঁড়ে ফেলে রেখেই আমরা এবার মাঠে নামবো, ভাবতেই কেমন অবাক লাগছে!

সবচেয়ে অবাক হয়েছি বিসিবির ঔদাসিন্য দেখে। এই জার্সিটা একরাতের মধ্যে বানিয়ে ফেলা হয়নি। ডিজাইনের কাজ চলেছে দিনের পর দিন, বিসিবির কাছে সেই ডিজাইন গেছে, পাশ হয়েছে, তারপর জার্সি তৈরি হয়েছে। এই লম্বা প্রক্রিয়াটার মাঝে বোর্ডের কর্তাব্যক্তিদের কারোই কি মনে পড়লো না, বাংলাদেশ শুধু সবুজের দেশ নয়, বাংলাদেশ লাল-সবুজের দেশ। কারো মনে এই প্রশ্নটা কেন এলো না যে, জার্সিটা তো পাকিস্তান বা আয়ারল্যান্ডের জার্সির সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে!

এই জার্সি যে আন্তর্জাতিকভাবেও হাস্যরসের যোগান বয়ে আনবে না, সেটারও কোন গ্যারান্টি নেই। অন্যান্য দেশের ক্রিকেট ভক্তেরা প্রশ্ন তুলতেই পারে, বিশ কোটি মানুষের একটা দেশের কি একটা মৌলিক জার্সি বানানোর ক্ষমতা নেই? কেন অন্য কোন দলের আদলে বানানো জার্সি নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যেতে হবে?

জার্সিতে বাংলাদেশ লেখাটা উঠিয়ে দিয়ে শুধু চাঁদ-তারা বসিয়ে দিন, এটা পাকিস্তানের জার্সি হয়ে যাবে এক পলকে! ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানের জার্সিটা দেখলেই বোঝা যাবে, বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জার্সির সঙ্গে সেটার তফাৎ উনিশ আর বিশে!

২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানের জার্সি

ভারত-শ্রীলঙ্কা-আফগানিস্তান, তিনটা দলের ওয়ানডে জার্সির রঙই তো নীল, তবুও তারা কত আলাদা! আমরা কেন তাহলে পাকিস্তান বা আয়ারল্যান্ডের কপি জার্সি নিয়ে যাবো বিশ্বকাপে? বাংলাদেশ দলের সিগনেচার জার্সি যেটা ছিল, যে জার্সির সঙ্গে আমাদের আবেগ, অনুভূতি সব মিশে আছে, সেই গাঢ় সবুজ আর লালের মিশ্রণটা রাখলে কি ক্ষতি হতো? নতুন কিছু করার চেষ্টাটাকে সাধুবাদ জানানো যেতো, যদি সেটা অন্য কোন দলের অনুকরণের পর্যায়ে চলে না যেতো।

বিশ্বকাপের এই জার্সিটাকে নিজেদের ভাবতে কেমন যেন লাগছে। মনে হচ্ছে, পাশের বাড়ি থেকে ধার করে আনা কোনকিছু, যেটা খানিক পরেই আবার ফেরত দিতে হবে। এই জার্সিতে আমাদের ক্রিকেটারদেরও অচেনা মনে হয় কিনা, সেটা সময়ই বলে দেবে…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button