খেলা ও ধুলা

চার বছরে ইংল্যান্ড এগিয়ে গেছে যোজন দূর, আর আমরা?

২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে ১৫ রানে হারিয়েছিলাম আমরা, তিন মোড়লের মধ্যে সবচেয়ে কূলীন সদস্যটিকে বিদায় করেছিলাম বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকেই। আগের আসরেও ঘরের মাঠে ইংরেজবধের আনন্দে মেতেছিলাম আমরা। আর আজ ইংল্যান্ডের সামনে স্রেফ উড়ে গেল বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডের ইনিংস শেষ হবার আগেই ম্যাচের নিয়তি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ দল সেই নিয়তি পরিবর্তন করতে পারেনি, পরিবর্তনের চেষ্টাটাও দেখা যায়নি ব্যাটিঙে।

২০১৫ বিশ্বকাপের ফলাফলটা মানতে পারেনি ইংল্যান্ড। এরপরে পুরো ওয়ানডে দলের খোলনলচেই পাল্টে ফেলেছে তারা। যে ইংল্যান্ড টেস্ট ক্রিকেটকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতো, ওয়ানডেকে গোনাতেই ধরতো না, তারাই ওয়ানডে’র জন্যে একদম আলাদা একটা দল গড়লো। টেস্ট দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই সেখানে নেই। পরিবর্তন আনা হলো পরিকল্পনায়।

দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান অ্যালেক্স হেলস এবং জেসন রয়কে অনুমতি দেয়া হলো, পুরোপুরি হাত খুলে খেলার, উইকেট গেলে যাক। সার্টিফিকেট হাতে পেয়ে দুজনে হয়ে উঠলেন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান, দুজনের জুটিটা যেকোন দেশের যে কোন বোলিং আক্রমণের কাছেই ত্রাসের আরেক নাম।

বিশ্বকাপের দল থেকে হেলস বাদ পড়েছেন শৃঙখলাভঙ্গের অভিযোগে, অথচ ইংল্যান্ডের গায়ে আঁচড়টিও লাগেনি। কারণ বেয়ারস্টোকে বিকল্প হিসেবে তৈরি করেই রেখেছিল তারা, ফ্র‍্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলোতেও বেয়ারস্টো খেলতেন ওপেনার হিসেবে।

তিনে রুট, চারে মরগান, পাঁচে স্টোকস- ইংল্যান্ডের মিডল অর্ডারটা যেমন অভিজ্ঞ, তেমনই মেধায় পরিপূর্ণ। এদের তিনজনই যদি কোন কারণে ফ্লপ করেন, হাল ধরার জন্যে বাটলার এবং মঈন আলী আছেন, কাজ চালানোর মতো ব্যাটিং পারেন ক্রিস ওকস এবং আদিল রশিদও।

দলটার বোলিং বৈচিত্র‍্যের কথাও ভাবুন। পেসারই আছেন পাঁচজন, ডানহাতি-বাঁহাতির দারুণ কম্বিনেশন। গতির জন্যে তারা অনেকটা যুদ্ধ করেই ভিনদেশী জোফরা আর্চারকে দলে ভিড়িয়েছে, আইন শিথিল করে সুযোগ দিয়েছে তাকে। স্পিন এটাকে মঈন আলী এবং আদিল রশিদ সম্পূর্ণ আলাদা দুই ঘরাণার। বিশ্বকাপ বিপর্যয়ের সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ইংল্যান্ড নিজেদের ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিঙের এক নম্বরে তুলে এনেছে, এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় দাবীদার হিসেবে তুলে ধরেছেন নিজেদের নামটা।

আমরা কি করেছি এই সময়ে? গত চার বছরে ঘরের মাঠে আমরা বেশ কয়েকটা ওয়ানডে সিরিজ জিতেছি, টেস্টও জিতেছি। কিন্ত আসলেই কি ভীতি জাগানিয়া শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছি? ৩৩০-৩৪০ রান করাটাকে গত চার বছরে ইংল্যান্ড দল ডালভাত বানিয়ে ফেলেছে, আমরা ক’বার এই তিনশো ছুঁয়েছি এই সময়টায়? মিরপুরের মন্থর উইকেটে খেলতে খেলতে প্রস্তর যুগের ক্রিকেটেই কি পড়ে থাকিনি আমরা?

গত চার বছরে আমাদের দলে দারুণ কিছু প্রতিভা এসেছেন। সৌম্য-লিটন কিংবা মোসাদ্দেক-মুস্তাফিজ-মিরাজ, সবাই বিশ্বক্রিকেটে এখন পরিচিত মুখ। কিন্ত ধারাবাহিকতা কি বজায় আছে? মুস্তাফিজ যে আশা দেখিয়েছেন, সেই ধার কিংবা ধারাবাহিকতা কি আছে তার বোলিঙে? এখনও পারফরম্যান্সের জন্যে আমরা সিনিয়র খেলোয়াড়দের দিকে তাকিয়ে থাকি। তামিম রান না পেলে আমরা বড় স্কোরের কথা ভাবতেও ভয় পাই।

ইংল্যান্ডের মিডল অর্ডারের সঙ্গে বাংলাদেশের মিডল অর্ডারকে মেলান একটু। রুট-মরগান-স্টোকসের চেয়ে যেকোন বিচারে সাকিব-মুশফিক-রিয়াদরা এগিয়ে থাকবেন, সেটা অভিজ্ঞতায়, রানের অঙ্কে, সবকিছুতেই। তবুও আমরা বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান তুলতে পারি না, মিডল ওভারগুলোতে টানা ডটবল দিয়ে মাথার ওপরে সীমাহীন চাপ নিয়ে আসি।

আমাদের বোলারেরা জায়গামতো বল ফেলতে ভুলে যান, ১৪০ কিলোমিটার গতিতে একটানা বল করার মতো বোলার নেই আমাদের, থাকলেও তাকে একাদশের বাইরে রেখেই মাঠে নামি আমরা। এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর বোলিং আক্রমণের দিকে একটু তাকান, তুলনা করুন। বাংলাদেশকেই কি সবচেয়ে দুর্বল মনে হবে না আপনার কাছে?

ম্যাচ হারে আপত্তি নেই, বিশ্বকাপের মতো আসরে ইংল্যান্ড আমাদেরকে হারাতেই পারে। ওরাই ফেবারিট ছিল এই ম্যাচে। আমার আপত্তি আমাদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে না পারায়, নিজেদের সামর্থ্যকে নিজেরাই সীমাবদ্ধ করে রাখায়। লিটনের ব্যাপারে সবাই আক্ষেপ করেন, পজিশনের কারণে নাকি দলে তার জায়গা হচ্ছে না। মেনে নিলাম, ওপেনিং কিংবা তিনে লিটনের জায়গা নেই। তাহলে লিটনকে কেন গত এক-দেড় বছরে মিডল অর্ডারের পাঁচ নম্বর জায়গাটায় পরীক্ষা করা হলো না, এই প্রশ্নটা আমরা কার কাছে করবো? ইংল্যান্ডের বেয়ারস্টো তো ক’দিন আগেও পাঁচে নামতেন। তিনি পারলে লিটনও নিশ্চয়ই মানিয়ে নিতে পারতেন পাঁচ নম্বরে।

এরকম প্রশ্ন হাজারো আছে। খেলোয়াড়দের অনেকেও উদাসীন, সামর্থ্যের সবটা ঢেলে দিতে চান না, ফিটনেস নিয়ে কাজ করতে চান না, ভাণ্ডারে নতুন অস্ত্রের সংযোজন করতে তাদের বড়ই আপত্তি। আধুনিক ক্রিকেটে প্রতিটা শট, প্রতিটা ডেলিভারি, প্রতিটা মুভমেন্ট যে আতস কাঁচের নিচে ফেলে পরীক্ষা করা হয়, সেটা তারা মাথায় আনেন না। ঘরের মাঠে বা এশিয়ার মাটিতে কয়েকটা ম্যাচ জিতে আমরা খুশি থাকি, অথচ এত অল্পে তুষ্ট হবার কথা ছিল না আমাদের। 

বোর্ডের উদাসীনতা তো আছেই। ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ হবে, সেটা আট বছর আগে জেনেও একটা বাউন্সি উইকেট তৈরি করা গেল না দেশে। ক্রিকেট বদলে গেছে, এখনকার ওয়ানডেতে ৩৫০ রানও নিরাপদ নয়, তবুও এই রান করার মতো, বা তাড়া করার মতো মানসিকতা তৈরি হলো না আমাদের দলে। জেসন রয়েরা যে উইকেটে একের পর এক ছক্কা হাঁকায়, সেই উইকেটেই আমাদের ব্যাটসম্যানেরা রানের জন্যে খাবি খায়, উইকেটে সেট হবার পরে আউট হয়ে ফিরে আসে। ইংল্যান্ডের সাথে এভাবেই আমাদের ব্যবধানটা বেড়ে যায়, সেটার পরিমাণ যে কত তীব্র, আমরা বোধহয় জানিও না।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button