খেলা ও ধুলা

এভাবেই চলছে… এভাবেই চলবে?

শুরু গল্পটা একই, শেষের কবিতাটাও বদলাতে পারলো না বাংলাদেশ দল। ভালো সূচনা, তামিমের দারুণ ইনিংস, আর তারপর হঠাৎ ধ্বস- ব্যাকরণ মেনে উইকেট বিলিয়ে আসা, টিকে থাকার চেষ্টায় স্বেচ্ছায় জল ঢেলে দেয়া- গৎবাঁধা চিত্রনাট্যের আরেকটা প্রদর্শনী হয়ে গেল নিউজিল্যান্ডের বেসিন রিজার্ভে। এক উইকেটে ১১৯ থেকে পরের ৯২ রান তুলতেই নয়টা উইকেট হারিয়ে ফেললো বাংলাদেশ দল, সবুজাভ উইকেটটা পড়ার চেষ্টাই করলেন না মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যানেরা। আর তাই দারুণ এক উদ্বোধনী জুটি বা ভালো একটা অবস্থানে থাকার পরেও ইনিংস শেষে পুরনো হতাশাটাই সঙ্গী, স্কোরবোর্ডে সংগ্রহ যে মাত্র ২১১ রান!

সাদমানের সঙ্গে তামিমের জুটিটা এই সিরিজে জমে ক্ষীর। তামিম তো রান পাচ্ছেনই, তাকে দারুণ সঙ্গও দিচ্ছেন বাঁহাতি এই তরুণ তুর্কি। সাদমানের মধ্যে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে, সেটা তার কনফিডেন্স। প্রতিপক্ষ কে, বোলারের নাম কি, উইকেটের কণ্ডিশন কেমন, সেসবকে একপাশে সরিয়ে রেখে নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলার আপ্রাণ চেষ্টা করে যান তিনি। আর শট সিলেকশনেও বয়স এবং অভিজ্ঞতার তুলনায় পরিনতির ছাপটা স্পষ্ট, ব্যাটিং সেন্স যথেষ্ট ভালো। ধারাবাহিকতাটা ধরে রাখতে পারলে লঙ্গার ভার্সনে তামিমের যোগ্য সঙ্গী হওয়ার সবচেয়ে বড় দাবীদার অবশ্যই সাদমানই হবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। মাঝেমধ্যে তো শট দেখলে তামিম বলেই ভ্রম হয় তাকে!

আগের টেস্টের দুই ইনিংসেই তামিম-সাদমানের উদ্বোধনি জুটি পেরিয়েছিল অর্ধশতক, আজও ৭৫ রানে ভেঙেছে জুটি। তাতে একটা রেকর্ডও হয়েছে। ১৯৯৯ সালের পরে এই প্রথম নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সফরকারী কোন দলের উদ্বোধনী জুটিতে টানা তিন ইনিংসে অর্ধশত বা তার বেশি রান এলো। তবে সেই কীর্তিটাতে তো স্বান্তনা পাওয়া যাচ্ছে না বিদঘুটে স্কোরকার্ডের কারণেই।

বেসিন রিজার্ভের মাঠে সবুজের মেলা, আউটফিল্ডের চেয়েও বেশি সবুজ উইকেটের রঙ। সেখানে শুরু থেকে সুইঙের পসরা বসবে বলেই ধারণা করা হয়েছিল। সুইংটা এলো, তবে একটু দেরীতে। ততক্ষণে তামিম-সাদমান দুজনেজ মানিয়ে নিয়েছেন কণ্ডিশনের সঙ্গে। গ্র‍্যান্ডহোমের বলে সাদমান ফিরলেও, তামিম তুলে নিয়েছেন এই সিরিজে নিজের দ্বিতীয় অর্ধশতক, সেটাও তামিমসুলভ বাহারী শটের পসরা সাজিয়ে। মাঝের সময়টাতে ভালো বলকে উপযুক্ত সম্মানও দিয়েছেন, আলগা বল পেলেই করেছেন সীমানাছাড়া। শেষমেশ ৭৪ রানে থেমেছেন, ভালো একটা ইনিংসের পরিসমাপ্তি ঘটেছে দৃষ্টিকটুভাবেই।

তবে তামিমকে দেখে কিছু শেখার তাড়না দেখা গেল না বাকীদের মধ্যে। ড্রেসিংরুমে ফেরার তাগাদাটাই বা কবে শেষ হবে কে জানে? শুরুর দিকটায় বোল্ট-সাউদিদের সামলে রেখে আরও একবার ওয়াগনারে পা কাটলেন বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানেরা, সেটাও সেই পুরনো রীতি মেনেই, আগের ধরণেই। তামিম, মুমিনুল, মিথুন, মাহমুদউল্লাহ- চারজনই ওয়াগনারের শিকার। প্রথম টেস্টের পরে শরীর লক্ষ্য করে ছুটে আসা বাউন্সারগুলো নিয়ে বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানেরা কোন কাজ করেছিলেন কিনা, এই প্রশ্নটা তাই উঠছেই।

দারুণ একটা অবস্থান থেকে আগের দুই ইনিংসের মতোই আচমকা ধ্বস নামলো আজও। মিডল অর্ডার দাঁড়াতে পারলো না, লোয়ার অর্ডারকে সেই সুযোগটা দিলেন না ট্রেন্ট বোল্ট। বল ততক্ষণে ঘুরতে শুরু করে দিয়েছে। কোয়ালিটি পেস এটাকের সামনে আমাদের যে কি নখদন্তহীন অবস্থা, সেটা প্রকাশ পেলো আরও একবার। ৯২ রানে নেই শেষ নয় উইকেট, এই পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি আফসোস জাগাচ্ছে আউটের ধরণগুলো। আরেকটু সাবধানী, আরেকটু বুদ্ধিমত্তার সাথে খেললেই ইনিংসগুলো বড় করা যেতো, স্কোরকার্ডটাও সমৃদ্ধ থাকতো।

একই চিত্রনাট্যের সিনেমা দেখতে দেখতে বিরক্তি ধরে যাওয়াটা স্বাভাবিক। তবুও তামিমের ব্যাটিংটা আশা জাগায়, আর বাকীদের তাড়াহুড়া সেই আশায় ঢেলে দেয় জল। ওয়েলিংটনের বেসিন রিজার্ভে টেস্টের প্রথম তিনদিনের মধ্যে সোয়া দুইদিনই খেয়ে নিয়েছে বৃষ্টি, তবুও বলা যাচ্ছে না যে এই টেস্ট ফল দেখবে না। তবে সেই ফলটা বাংলাদেশের অনুকূলে আসার সম্ভাবনা মোটামুটি শূন্যের কোঠায়। দুশ্চিন্তার নামটাই যে ব্যাটিং ধ্বস!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button