খেলা ও ধুলা

ঢাকা টেস্টের নিয়ন্ত্রণ অস্ট্রেলিয়ার হাতে তুলে দিল বাংলাদেশ?

মিরপুর টেস্ট অদ্ভুত এক চিত্রনাট্য মেনে এগিয়ে চলেছে, প্রতিটা সেশনেই খানিকটা বদলে যাচ্ছে ম্যাচের চালচিত্র। একেকবার ম্যাচ হেলে পড়ছে একেক দিকে। সকালের সুসময়টা অদ্ভুতভাবে পাল্টে যেতে থাকলো দ্বিতীয় সেশনে, বাংলাদেশের চারশো রানের লিড পাওয়ার স্বপ্নে বড় ধাক্কা লাগলো তামিম-সাকিবের বিদায়ে, একই সেশনে মুশফিক-সাব্বির-নাসিরও বিদায় নিলেন। আড়াইশো লিড দেয়াটাও তখন বিলাসিতার ব্যাপার, সেই চাহিদাটা পূরণ করলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। শেষমেশ ২২১ রানে অলআউট হয়ে মেরেকেটে ২৬৫ রানের টার্গেট দেয়া গেল অস্ট্রেলিয়াকে! জবাবে দিনশেষে দুই উইকেট হারিয়ে জয়ের সঙ্গে ব্যবধানটাকে ১৫৬ রানে নামিয়ে এনেছে অস্ট্রেলিয়া।

এর আগে ব্যাটসম্যানেরা নেমেছিলেন আত্মহত্যার মিছিলে। কামিন্সের এক্সট্রা বাউন্সারে কাটা পড়েছিলেন তামিম, হয়তো করার ছিল না কিছুই। কিন্ত করতে পারতেন সাকিব, অযথা বাজে শটে উইকেটটা বিলিয়ে দিয়ে না এলে। মুশফিকের উইকেটেও দায় আছে নিজের, সাব্বির-নাসিরেরা বিলিয়ে দিয়ে এসেছেন উইকেট। সাব্বিরের ব্যাটে খানিকটা ভরসার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্ত টিকে থাকতে পারেননি তিনিও।

যে দায়িত্বটা বারবার চাওয়া হয়েছিল ব্যাটসম্যানদের কাছে, তামিম-মুশফিক ছাড়া সেটা পাওয়া যায়নি আর কারো কাছেই। সকালের ইমরুল কায়েস ছিলেন নার্ভাসনেসে আক্রান্ত, তাঁকে দেখেই মনে হচ্ছিল যেকোন মূহুর্তে আউট হতে পারেন। তামিমের আউটের পর মুশফিককে সঙ্গ দেয়াটা দরকার ছিল সাকিবের, সেটা তিনি পারলেন কই? সাকিবভক্তরা বলবেন, সব কি একা সাকিব করবে নাকী? সবকিছু অবশ্যই সাকিব একা করবেন না, সবারই দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া আছে। উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসাটা ব্যাটসম্যানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। সাকিব ফর্মে আছেন, ব্যাট হাতে ভালো সময় যাচ্ছে, তাঁর কাছে দলের চাহিদাটাও তেমনই থাকবে। সাব্বির হাল ধরবেন এমনটা মনে হয়েছিল, বোকার মতো আউট হলেন তিনিও। প্রথম ইনিংসে আউট হয়েও রিভিউ নষ্ট করেছিলেন তিনি, সেই ভয়েই কিনা, এবার আর রিভিউ নেয়ার ঝুঁকিতে গেলেনই না! হাতে তখনও দুটো রিভিউ আস্ত মজুদ! একজন ব্যাটসম্যান যদি এটাই না জানেন যে বল তাঁর ব্যাট বা গ্লাভসে স্পর্শ করেছে কি করেনি, তিনি কোন মাপের ব্যাটসম্যান সেটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক। মুশফিক যেভাবে আউট হলেন, দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই নয় সেটা। ব্যাটের খোঁচায় কোন রান না তুলেই ফিরলেন নাসির হোসেন, বাংলাদেশের বড় টার্গেটের স্বপ্নকে কবর দিয়েছেন সবাই মিলে! তামিমের ৭৮ রানই দলীয় সর্বোচ্চ, মুশফিক ফিরেছিলেন ৪১ রানে।

দুশো পঁয়ষট্টির টার্গেটে অস্ট্রেলিয়ার শুরুটাও ভালো হতে দেননি সাকিব-মিরাজ। আটাশ রানের মধ্যেই র‍্যানশ-খাজাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন দুজনে। র‍্যানশ’কে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেছেন মিরাজ, সাকিবের বলে সুইপ খেলতে গিয়ে তাইজুলের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন উসমান খাজা। কিন্ত এরপরে বলার মতো কোন সুযোগ তৈরী করতে পারেননি বোলারেরা। শর্টে দাঁড়িয়ে স্মিথের ক্যাচ হাতে জমাতে পারেননি ইমরুল, স্লিপে ওয়ার্নারের ক্যাচ ছেড়েছেন সৌম্য। ওয়ার্নার-স্মিথ জুটি রানের চাকা ঘুরিয়ে নিয়েছেন তরতরিয়ে। উপমহাদেশে নিজের বাজে ফর্মের তকমা ছেঁটে ফেলতে এই ইনিংসটাকেই বেছে নিলেন ওয়ার্নার, অপরাজিত আছেন ৭৫ রানে। স্মিথের রান পঁচিশ, অস্ট্রেলিয়ার স্কোরবোর্ডে জমা পড়েছে দুই উইকেটে ১০৯ রান, জয়ের সঙ্গে তাদের দূরত্ব এখন ১৫৬ রানের!

প্রথম দুইদিন, তৃতীয় দিনের প্রথম সেশনটাতেও চালকের আসনে থাকার পরে দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং ব্যর্থতায় ঢাকা টেস্টের নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে বাংলাদেশ দল। টেস্ট ক্রিকেট এমনই। একটা দুর্দান্ত স্পেল, এক সেশনের অসাবধানতাই পারে পুরো ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দিতে। আমাদের ব্যাটসম্যানেরা নিজেরাই সেই কাজটা করেছেন, মোমেন্টামটা মিস করেছেন, ছেড়ে দিয়েছেন ড্রাইভিং হুইল, আর সেই সুযোগে সেখানে চড়ে বসেছে অস্ট্রেলিয়া।

এখনও একেবারে মরে যায়নি সম্ভাবনা। কাল সকালে দারুণ বোলিং, অসাধারণ একটা দুটো স্পেল পারে ম্যাচের চেহারা বদলে দিতে, যেমনটা বদলে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে। বোলারদের করতে হবে দারুণ কিছু, ফিল্ডারদের হতে হবে মরিয়া। খেলতে হবে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে। তারপরেও অপেক্ষায় থাকতে হবে ভাগ্যের ছোঁয়ার। তবে ভাগ্য তো সাহসীদের পক্ষেই থাকে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button