এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডবিবিধ

বালি ট্যুর- স্বপ্ন কি এর চেয়ে বেশি সুন্দর হয়?

শুক্লা সরকার চৈতী 

বালি ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপ। হাজার মন্দির আর হাজার কাঠগোলাপ এর দ্বীপ বালি। যেদিকেই তাকাবেন সেদিকেই খুব সুন্দর মন্দির,ভাস্কর্য আর কাঠ গোলাপ গাছ। গত পর্বে আমাদের ট্যুরের প্রথম চারদিনের গল্প বলেছিলাম। বালি ট্যুর নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ ট্যুর প্ল্যানের অভাব দেখেছি। নিজেই স্বপ্নের মতো একটু ট্যুর দেয়ার পর মনে হলো, আমাদের বালি ট্যুর সম্পর্কে সম্পূর্ণ লিখি। তারই ধারাবাহিকতায় আজ গল্প শুরু করছি পঞ্চম দিন থেকে। গত পর্বের লিংক লেখার শেষে দেওয়া হবে।

ডে ৫ (২০ সেপ্টেম্বর )-

সকাল ৮ঃ৩০ এ আমাদের ড্রাইভার এসে আমাদের পিক করে নেয়। তার আগে আমরা ব্রেকফাস্ট সেরে নেই হোটেলে। বাফেট ব্রেকফাস্ট। প্রথমে আমরা যাই নুং নুং ওয়াটার ফল দেখতে। ৪৫০ সিঁড়ি ভেংগে নামি ঝর্না দেখতে। অসাধারন সুন্দর ছিল ঝর্নাটা। ৪৫০ সিঁড়ি নামা ওঠা খুব কষ্টকর হলেও,কষ্টটা সার্থক ছিল। ওপরে একটা বালি সুইং এর ব্যবস্থা ছিল।পার পার্সন ১.৫ লাখ রুপি দিয়ে সুইং করি। আরেকটা ব্রেইথ টেইকিং এক্সপেরিয়েন্স। কয়েকশ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে দোল খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়েছি। একবার পড়ে গেলে আর জীবনে উঠতে হবে না। ওখানেই শেষ। যদিও প্রোপার প্রিকউশান নেওয়া থাকে,উইক হার্টেড মানুষদের অ্যাভয়েড করাই ভাল।

বালি ইন্দোনেশিয়া

তারপর, উলুন দানু টেম্পলে যাই। প্রায় ৪০০০ ফিট(১২০০ মিটার) উপরে একটা পাহাড়ের ওপর হাজার বছরের পুরানো মন্দির। মন্দিরে যাওয়ার রাস্তাটা দার্জেলিংয়ের ফিলিংস দিবে। মেঘের ভিতর দিয়ে রাস্তা,বৃষ্টি হয় একটু পর পর। আর ঠান্ডা। মন্দিরের পাশে ন্যাচারাল লেইক। পুরো মন্দিরটাই মেঘের ভিতর ছিল সেদিন। মন্দির থেকে বের হয়ে সামনেই লাঞ্চ করি। সেখান থেকে যাই বিখ্যাত তানাহ লট টেম্পলে। সমুদ্রের মাঝে মন্দির। এতটা সুন্দর যে চোখ ফেরানো যায়না।সব কিছু অসম্ভব অসম্ভব সুন্দর। সেখানে সান সেট দেখে হোটেলে ফিরি।

ডে ৬ (২১ সেপ্টেম্বর)

এদিন আমাদের ডেস্টিনেশন ছিল দূরের কিছু জায়গা। তাই জার্নি শুরু হয় সকাল ৬ টায়।প্রথমেই যাই লেম্পুয়াং টেম্পলে। কয়েক হাজার ফিট ওপরে পাহাড়ের গায়ে গায়ে অসংখ্য মন্দির।গাড়ি একটা নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত গিয়ে আর যায়না। সেখান থেকে লোকাল লেগুনা মতো আছে,ওগুলোতে করে যেতে হয়। মন্দিরে যেতে হলে অবশ্যই লুংগির মত দেখতে সারং পড়ে যেতে হবে। আর যেসব মেয়ে স্লিভলেস ড্রেস পড়ে যায়,তাদের একটা চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়। এগুলো সব মন্দিরের নিচে ভাড়া পাওয়া যায়।মন্দির গুলো প্রায় ২০০০+ বছর পুরানো। সব মন্দিরে যাইনি। খুব সানি ছিল দিনটা। গরম লাগছিল ভীষণ।

বালি, ইন্দোনেশিয়া

এখানে মূল আকর্ষন ছিল হ্যাভেনস গেইট।ওইখানে ছবি তুলে দেওয়ার লোক ছিল। সেই সব ছবি তুলে দেয়। লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে হয়।এত্ত ভীড় থাকে। ওইখান থেকে যাই তিরতা গাংওয়ে(Tirtaa Gangway) টেম্পলে। লেকের মাঝে মাঝে সুন্দর স্লোপ করে দেওয়া,আর অনেক মাছ। পিকচার পার্ফেক্ট জায়গা। তারপর যাই তামান উজুং ওয়াটার প্যালেসে এবং ব্ল্যাক স্যান্ডি বিচে আর ব্যাট কেইভে। খুব ক্লান্তিময় ছিল এই দিনটা। কিন্তু মন মত সুন্দর ছিল।

ডে ৭( ২২ সেপ্টেম্বর)

সকাল ৯ টায় জার্নি শুরু হয় ব্যারং ড্যান্স দিয়ে।ওদের ট্র্যাডিশনাল একটা মিথিকাল কাহিনী ওরা নাচের মাধ্যমে তুলে ধরে। এর পর যাই সিলভার ভিলেজে। তেমন কিছু নাই। সিলভার দিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানাচ্ছে বসে বসে। এরপর যাই লুওয়াক কফি প্ল্যান্টেশনে। ১৩ রকম বিভিন্ন কমপ্লিমেন্টারি ড্রিংকস দেয় (চা,কফি)। আমরা ৫০০০০ রুপাইয়াহ দিয়ে লুওয়াক কফি নেই এক কাপ।পৃথিবীর সব চেয়ে দামী কফি।

তারপর যাই কিন্তামানি ভলকানো দেখতে। অল্প সময় কাটাই ওইখানে। সিডিউল টাইট ছিল ভীষন। যাই মাংকি ফরেস্টে। অনেক বড় জায়গা জুড়ে মাংকি ফরেস্ট। ভিতরে সুন্দর আর্ট গ্যালারি আছে। খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।অসাবধান হলেই বানর হাত থেকে জিনিস চুরি করে গাছের ওপর চলে যায়। মাংকি ফরেস্ট থেকে যাই তেগেনুংগান ওয়াটারফল(Tegenu
ngang Waterfall) দেখতে। এটা অত কষ্টকর ছিল না। অল্প সিঁড়ি ছিল। রাত ৮ টায় হোটেলে ফিরি।

ডে ৮ (২৩ সেপ্টেম্বর)

এদিন আমাদের নুসা লেম্বনগ্যানের দিকে যাত্রা।সকাল সাড়ে সাতটায় ফাস্ট বোট এজেন্সির মাইক্রোবাস হোটেল টেরেস থেকে তুলে নিতে আসে। আমরা ব্রেকফাস্ট সেরে চেক আউট করে গাড়ি তে উঠে বসি। সাড়ে আটটায় সানুর পোর্ট থেকে ফাস্ট বোট ছাড়ে। ৯ঃ৩০ এ লেম্বনগ্যানে পৌঁছে যাই। একটা লেগুনা টাইপ গাড়িতে করে আমাদের জেংগালা হিলসে পৌছে দেয় তারা।পাহাড়ের ক্লিফে সমুদ্রের ধারের খুব সুন্দর কাঠের তৈরি কটেজ। মন জুড়ানো সৌন্দর্য। একটু ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে পড়ি ঘুরতে। ওখানে সবাই স্কুটি নিয়ে বেড়ায়। খুব ঢালু পাহাড়ি রাস্তা,খুব ভাল চালাতে না জানলে বাইক চালানো রিস্কি খুব। তাই আমরা রিস্ক না নিয়ে একটা লেগুনা মত রিজার্ভ করি। ৫ লাখ চেয়েছিল। আমরা বার্গেইন করে সেটাকে ২লাখ রুপি তে নামাই। ৪ টা স্পট ঘোরাবে। ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট,ডেভিলস টিয়ার,ড্রিম বিচ,ইয়েলো ব্রিজ। প্রথমে যাই ম্যানগ্রোভ ফরেস্টে। সেখানে ছোট ছোট নৌকা ভাড়া করে ঘুরতে হয়। ৩ লাখ চায়,আমরা ১.৫ লাখে ঠিক করি। খুব সুন্দর ছোট্ট বন। সমুদ্রের একটা সরু চ্যানেল ঢুকে গেছে মাঝে দিয়ে খালের মত। পুরোটা ঘুরে ফিরে আসতে ২৫ মিনিট লাগে। এরপর যাই ইয়েলো ব্রিজ দেখতে। তারপর যাওয়া হয় ডেভিলস টিয়ারে। অসাধারন জায়গা।ছবির মত সুন্দর। পাহাড়ের গায়ে সমুদ্র আছড়ে পড়ছে।

বালি ইন্দোনেশিয়া

ঠিক পাহাড় বললে ভুল হবে। বেশি উঁচু না। তবে বেশি সুন্দর লেগেছে। এরপর ড্রিম বিচে আর যাইনি। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছিল আর আমাদের প্ল্যান ছিল সানসেট দেখবো আমাদের রিসোর্টের পুল থেকে। প্ল্যান মতোই হয় সব। বিশাল সুন্দর সানসেট দেখি আমরা।বের হই ডিনার হান্টের জন্য। একদম সমুদ্রের পাড়ে একটা রেস্টুরেন্টে ক্যান্ডেল লাইট রোমান্টিক ডিনার করে বিচে একটু ঘুরে রিসোর্টে ফিরি। পুল সাইডে বসি কিছুক্ষন। ওই সময়টার অনুভুতি বলে বোঝানো যাবে না। সামনে বিশাল সমুদ্র, আকাশে পূর্নিমার ঠিক আগ মুহুর্তের ভরা চাঁদ, দূরে বালি শহর আর রাস্তার সোডিয়াম লাইট দেখা যাচ্ছে, সমুদ্র ঘেষে পাহাড়ের ঢালের ওপরের সুন্দর একটা কাঠের তৈরি রিসোর্ট৷ পেছনে, ডানে বামে পাহাড়ি বন,একটা ইনফিনিটি পুল এর পাশে কাঠ গোলাপ গাছ,আর তার নিচে শুয়ে আমরা চন্দ্র, সমুদ্র, পাহাড়, বন বিলাস করেছি। মাঝে মাঝে টুপ করে গায়ের ওপর কাঠ গোলাপ ফুল ঝরে পড়ছে। স্বপ্ন কি এর চেয়ে বেশি সুন্দর হয়? জীবন টা যদি সব সময় এমন হতো!

ডে ৯ (২৪ সেপ্টেম্বর)

সকাল ১০.৩০ এ স্পীড বোটে করে নুসা পেনিডায় যাই আমরা। সব আগে থেকেই বুকিং দেওয়া ছিল। ১৫ মিনিট মত লাগে যেতে। নুসা পেনিডাতে একজন ড্রাইভার ওয়েট করছিল আমাদের জন্য। উনি আমাদের নিয়ে সব জায়গা গুলো ঘুরে। নুসা লেম্বনগ্যান ঘোরার পর পেনিডাটা কেন জানি অত ভাল লাগেনি। আমরা যাই কিলিংকন বিচে। সময় কাটিয়ে ফাস্ট বোটে করে বালিতে ফিরে যাই। হোটেল টেরেসে লাস্ট রাতের জন্য চেইক ইন করি।

ডে ১০ (২৫ সেপ্টেম্বর)

ফাইনাল ডে। একটু বেলা করে বের হই ওইদিন।তেমন কিছু ঘোরার বাকি ছিল না। হোটেল থেকে চেক আউট করে গাড়িতে লাগেজ রেখে বেরিয়ে পড়ি। পাদাং পাদাং বেতে যাই। টিপিকাল ছোট একটা বিচ। সার্ফিং করার জন্য খুব ভাল। কারন সবাই সার্ফিং করছিল। কিছুক্ষন বসে যাই উলু ওয়াটু টেম্পলে। অনেক বড় জায়গা জুড়ে টেম্পলটা। এখানে অনেক বানর ছিল। এক লোকের হাত থেকে ফোন নিয়ে পালায় একটা বানর। পরে ওইখানকার লোকরা খুজে দেয় ফোন টা। একটু হিংস্র বানর গুলো।

কিছু টুক টাক শপিং করে বিকাল ৬ টায় আমাদের ড্রাইভার এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেয়।আমাদের স্বপ্নের বালি ট্যুর স্বপ্নের মতই শেষ হয়।
রাত ১১ টার ফ্লাইটে ঢাকা ব্যাক করি। একটা স্বপ্নময় ট্যুরের ইতি হয়, কিন্তু স্মৃতিতে রয়ে যায় অসংখ্য গল্প।

প্রথম পর্ব- বালি ও হাজার কাঠগোলাপের গল্প

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button