সিনেমা হলের গলি

ব্যাড জিনিয়াস- হাইভোল্টেজ এক রোমাঞ্চকর থাই থ্রিলার!

আমরা যদি আমাদের জীবনটাকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখতে পাবো আমাদের জীবনের একটা বড় সময় কাটে শিক্ষা জীবনের পেছনে। এই শিক্ষাজীবনে অনেক শিক্ষার্থীদেরই থাকে নানা অম্ল মধুর অভিজ্ঞতা, তবে একটা অভিজ্ঞতা যেটা ভালো শিক্ষার্থীই হোক কিংবা খারাপ শিক্ষার্থী, কপালে ঘাম বের করে আনে সবার, সেটা কী জানেন? চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়ার কথা, এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার নাম হচ্ছে “পরীক্ষা”!

দুর্বল মেধার পরিক্ষার্থীরা দেখা যায় সময়মতো তাদের সিলেবাস কমপ্লিট করতে পারে না। আবার, অনেক শিক্ষার্থী আছে যাদের কাছে পড়াশোনাটা বোরিং একটা বিষয়। যার যেরকম সমস্যাই থাকুক, অন্তত পরীক্ষাটা তো ফেস করতে হবে। পরীক্ষাকেন্দ্রে দেখা যায় বাধ্য হয়েই তারা নকলের সাহায্য নেয়। নয়তো, আশেপাশের বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দেখাদেখি করে লেখার চেষ্টা করে। ঘটনা এইটুকুতেই শেষ হয়ে গেলে ভালো হতো।

কিন্তু, বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে সব কিছুতেই যেখানে ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া লেগেছে, সেখানে পরীক্ষায় নকল করার ক্ষেত্রেও নকলবাজ শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সহায়তা নেবে সেটা তো বলাই বাহুল্য। কেউ পরীক্ষার হলে নিয়ে যাচ্ছে মোবাইল, কেউ কানে ক্ষুদ্রাকৃতির কমিউনিকেশন ডিভাইস ঢুকিয়ে হলে যাচ্ছে বাইরের কোন উৎস বা ব্যক্তির কাছ থেকে উত্তর জানার জন্য। বর্তমানে অনেকে এই অসাধু উপায় অবলম্বন করে কামিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কিন্তু, তাতে কি কোনো লাভ হচ্ছে? আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে নকলকারী এবং নকলে সহায়তাকারী দুজনেরই সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ পড়ছে হুমকির মুখে।

এরকমই এক জমজমাট প্রেক্ষাপট নিয়ে ২০১৭ সালে রিলিজ পেয়েছিল দুরন্ধর নকলবাজির এক হাইভোল্টেজ রোমাঞ্চকর থাই থ্রিলার ‘ব্যাড জিনিয়াস’, যা ২০১৭ সালে থাইল্যান্ডের হায়েস্ট গ্রসিং মুভি ছিল।

থ্রিলার সিনেমা, ব্যাড জিনিয়াস

লাও লিন, দেখতে আট দশটা গড়পড়তা সাধারণ মেয়ের মতো দেখতে হলেও মেধার দিক থেকে বলা যায় বিস্ময়কর এক প্রতিভার অধিকারী। গণিতে অসাধারণ পারদর্শিতা, এবং একই সাথে স্মরণশক্তির প্রখরতা ছিল তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। মুখস্তশক্তি অসাধারণ বিধায় পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করাটা ছিল তার কাছে মামুলী ব্যাপার। ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত সবসময় পরীক্ষায় জিপিএ ৪ এ ৪ পেয়ে এসেছে সে। মেয়েটার পরিবারে সদস্য বলতে আছে শুধুমাত্র তার বাবা, মা নেই। মেয়ে অন্তপ্রাণ বাবার অনেক স্বপ্ন তার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

তাই, আর্থিক অবস্থা সেভাবে ভালো না হলেও তিনি চান, তার মেয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবে। লিনের বাবা ছিলেন পেশায় শিক্ষক, যে স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করতেন সে স্কুলেই তার মেয়ে লিন লেখাপড়া করতো। তিনি নিজ স্কুল থেকে ছাড়িয়ে লিনকে আরোও ভালো একটা স্কুলে নিয়ে যান ভর্তি করার জন্য।

সমস্যা হচ্ছে, লিন তো আর অবিবেচক কোনো মেয়ে নয়। ভালো স্কুলে পড়াতে চাওয়াটা যে তার বাবার আর্থিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এটা সে প্রথমেই বুঝতে পেরেছিল। স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে গিয়ে তার সাথে কথা বলার সময় তৎক্ষণাৎ পড়াশোনার অতিরিক্ত খরচ নিয়ে হিসাবনিকাশ করে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে লিন। প্রধাণ শিক্ষক লিনের কথা শুনে মেয়েটার ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভার কিছুটা হলেও আঁচ পায়। তিনি তাকে স্কুলে ফ্রিতে লেখাপড়া করার সুযোগ দেন।

ক্লাস করতে গিয়ে লিনের সাথে পরিচয় হয় গ্রেস নামে তার এক ক্লাসমেটের সাথে। গ্রেস হচ্ছে লিনের ঠিক বিপরীত একটা চরিত্র। লেখাপড়া জিনিসটা তার মাথাতেই ঢুকে না। লেখাপড়ার বাইরে জগত সংসারে যত কর্ম আছে, সেগুলোতেই তার মনোযোগ। স্কুলের নাটকে সে অভিনয় করতে চায়, কিন্তু সেজন্য পরীক্ষায় অন্তত তাকে জিপিএ ৩.২৫ পেতে হয়। তাই, গ্রেস দ্বারস্থ হয় লিনের কাছে। লিনকে সে তার টিউটর বানায়। লিন গ্রেসকে যথাসম্ভব ভালো করে পড়ালেও পরীক্ষার হলে বাধে বিপত্তি। গ্রেস প্রশ্নপত্র দেখেই বেমালুম সবকিছু ভুলে যায়।

সেখানে পরীক্ষা পদ্ধতিতে লিখিত পরীক্ষা ছিল না, সবই ছিল অবজেক্টিভ প্রশ্ন। লিন কোনো একভাবে পরীক্ষার হলে সাহায্য করে গ্রেসকে গার্ডরত শিক্ষকদের চোখ এড়িয়ে। এভাবে নকল করে দেখা যায় রেজাল্টে গ্রেসের স্কোর আসে ৩.৮৭, আর লিনের বরাবর যে রেজাল্ট আসে, জিপিএ ৪ এ ৪।

লিনের প্রথম অবস্থায় গ্রেসকে নকল প্রদানে শুধু বন্ধুবৎসলতাই কাজ করেছিল, কিন্তু এর মাধ্যমে সে যে নতুন আরেকটা ফাঁদে আটকে গেছে সেটা ঘুনাক্ষুরেও ভাবেনি সে। লিন যতটা শান্ত আর করিতকর্মা মেয়ে, গ্রেস ছিল ততোটাই উচ্ছল আর বোকা প্রকৃতির। প্রথমবারের মতো পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট আসার উত্তেজনা দমিয়ে রাখতে না পেরে কথাচ্ছলে সবকিছু হড়বড় করে বলে দেয় সে তার বয়ফ্রেন্ড প্যাটকে। প্যাট কাহিনী জানতে পেরে সেও লিনের কাছে একই ধরনের আর্জি করে। সেও পরীক্ষায় লিনের কাছ থেকে সহায়তা পেতে চায়, তবে এবার প্যাট লিনকে অর্থের অফার করে সহায়তা করার বিনিময়ে।

এক কান দু কান হতে হতে ক্লাসের সকলের কানে পৌঁছে যায় সেই কথা। সবাই লিনের কাছে অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার হলে নকল করার জন্য সাহায্য চায়। অংকে পটু লিন সাথে সাথে ক্যালকুলেশন করে দেখে, প্রিন্সিপাল তাকে বিনা খরচায় লেখাপড়া করার সুযোগ দিলেও ঠিকই “চা খরচের” এর কথা বলে ২ লাখ বাথ (থাইল্যান্ডের মুদ্রার নাম) নিচ্ছে। লিন ভাবে, প্রিন্সিপাল ফ্রিতে পড়ার কথা বলেও অর্থ যেহেতু ঠিকই নিচ্ছে আর তার বাবার আর্থিক অবস্থাও যেহেতু বেশি ভালো না, এই কাজটা করলে সে তার পড়াশোনার খরচ তুলে ফেলতে পারবে।

সমস্যা হচ্ছে, পরীক্ষায় নকল করার সকল উপায়ই আসলে বন্ধ। লিন চিন্তা করে, এমন একটা উপায় তাকে উদ্ভাবন করতে হবে যেন পরীক্ষার হলে সবাইকে একই সাথে একই সময়ে যেন সে হেল্প করতে পারে। ভাবতে ভাবতেই সুচতুর লিনের মাথায় চলে আসে পিয়ানোর ট্রিক্সের কথা। পিয়ানো শেখানোর মাধ্যমে হাতের ইশারার প্রশিক্ষন দেয় সে সবাইকে যেন হলে তার ইশারা দেখেই সবাই বুঝতে পারে কোন ইশারার মানে কী। প্রথম এক্সপেরিমেন্টেই লিন বাজিমাত করে ফেলে। টিচাররা ভেতরে ভেতরে টের পায়, কোনো জায়গায় কিছু একটা ঘাপলা আছে। স্বাভাবিক, আপনি আপনার ক্লাসের সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো ছেলে বা মেয়েটাকে যদি দেখেন পরীক্ষায় ঈর্ষনীয় রেজাল্ট করছে, আপনার মনে সন্দেহ আসবে না? তাই, তারা সেট করে প্রশ্ন করা সহ নানা পদ্মতির প্রয়োগ করে কিন্তু আখেরে সেভাবে কোনো লাভ হয় না।

সবকিছু ঠিকমতোই চলছিল, বিপত্তি বাধে যখন স্কুলে আরেকজন স্টুডেন্ট আসে, নাম তার ব্যাং। সেও পড়াশোনায়, মেধায় বুদ্ধিতে লিনের সমকক্ষ বলা যায়। আর, সে বিদ্যাবুদ্ধিতে ভালো হলেও মনমানসিকতার দিক থেকে প্রচন্ড সৎ। সৎ মানে, একটু বেশিই সৎ। এক্সাম হলে লিনের কুকীর্তি টের পেয়ে সে প্রিন্সিপালের কাছে কমপ্লেন করে। প্রিন্সিপাল প্রথম অবস্থায় তিরস্কার করে ছেড়ে দিলেও যা ঘটার তা ততক্ষণে ঘটে গেছে। পুরো স্কুলে ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে লিনের কুকীর্তির কাহিনী। লিন বুঝতে পারে, এই স্কুলে তার আর বেশিদিন লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়াটা সম্ভব নয়।

এর মধ্যেই, গ্রেস আর প্যাট ঠিক করে তারা STIC পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবে। এর মাধ্যমে আমেরিকার যে কোন একটা ভার্সিটিতে তারা লেখাপড়ার সুযোগ পাবে। লিনের কাছে সেজন্য তারা সাহায্য চায়। সমস্যা হচ্ছে, স্কুলের এক্সাম হল আর আন্তর্জাতির একটা এক্সাম হলের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ। বিন্দুমাত্র ঊনিশ বিশ করার সুযোগ নেই সেখানে। লিন নিজেও ঠিক করে এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে বিদেশের কোনো ভার্সিটিতে পড়বে। এটাই সুযোগ। চলতে থাকে অনিয়ম আর নৈতিকতার মাঝে টানটান উত্তেজনার ইঁদুর-বেড়াল দ্বন্দ্ব! আর এভাবেই এগিয়ে চলে সময়ের সাড়া জাগানো থাই চলচ্চিত্র “Bad Genius” এর কাহিনী।

থ্রিলার সিনেমা, ব্যাড জিনিয়াস

ব্যাড জিনিয়াস- মুভিটির একটি বিশেষত্ব আছে। মুভিতে আক্ষরিক অর্থে সেভাবে কোনো ভিলেন বা হিরোর দেখা আপনি পাবেন না। তবে, যা পাবেন সেটা হচ্ছে কিছু চরিত্র। ব্যক্তিগতভাবে লিড এক্ট্রেসকে বেশ ভালো লেগেছে। বিউটি উইথ ব্রেইনের পারফেক্ট কোনো উদাহরণ থাকলে লিন পাবে সেটা। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে কিছু থ্রিলিং মোমেন্ট ছিল, যা ছিল গায়ের লোম দাঁড় করিয়ে দেওয়ার মতো। বিশেষ করে, ক্লাইম্যাক্সের ৩০ মিনিট আপনাকে পুরো সেঁটে রাখবে মুভির দিকে।

নকল করাটাও যে একটা শিল্পের পর্যায়ে পড়ে সেটাই দেখানো হয় মুভিতে তবে পরিচালক কিন্তু মোটেও পরীক্ষায় নকল করার উৎসাহ জোগাতে মুভিটি তৈরী করেননি। মুভির বিভিন্ন স্তরে স্তরে সূক্ষ্ণ সূক্ষ্ণ কিছু বার্তা প্রদানের মাধ্যমে পরিচালক বোঝাতে চেয়েছেন, জীবনের যে কোন কাজেই হোক, অসুদপায় অবলম্বন করাটা উচিৎ নয়। এর ফল কখনোই ভালো হয় না। আইএমডিবিতে ৭.৭ রেটিং এবং রোটেন টমেটোজে ১০০% ফ্রেশ রেটিং পাওয়া সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরী এই সিনেমাটি রোলার কোস্টারে রাইড করার মতো। একবার চেপে বসলে আর নামার সুযোগ থাকে না বললেই চলে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button