ইনসাইড বাংলাদেশরক্তাক্ত একাত্তর

যে দেশে নিজামীরা ‘শহীদ মাওলানা’, আজাদেরা বিস্মৃত অতীত!

বিন্দু ছিল আজাদের বোন, সাফিয়া বেগম আর ইউনুস চৌধুরীর প্রথম সন্তান। হঠাৎ বসন্ত রোগে মারা গেল সে, সাফিয়া বেগম তখন মেয়ের শোকে পাগলপ্রায়। ফলে ১৯৪৬ সালের ১১ জুলাই আজাদ যখন তার কোলে এল, সাফিয়া বেগম যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো রাজপুত্র ছিল আজাদ, তার বাবার শান-শওকত ছিল দেখার মতো। অবশ্য তাতে স্ত্রী সাফিয়া বেগমের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

সাতচল্লিশের আগস্টে পাকিস্তান হবার পর ইউনুস আহমেদ চৌধুরী যখন ঢাকায় এসে ব্যবসা শুরু করলেন, তখন বাবার কাছ থেকে পাওয়া গয়না বিক্রি করে সে ব্যবসার মূলধন যুগিয়েছিলেন সাফিয়া বেগম। দেখতে দেখতে বিজনেস ম্যাগনেট হয়ে উঠলেন তিনি, পরিনত হলেন পাকিস্তানের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে। ইস্কাটনের বাড়িটা ছিল রাজপ্রাসাদের মতো, কেবল এক নজর দেখতেই প্রতিদিন ছুটে আসতেন অসংখ্য মানুষ। এই বাড়িটা, ফরাশগঞ্জের তিনতলা বাড়িটাসহ অসংখ্য জমিজমা সাফিয়া বেগমের নামে লিখে দিয়েছিলেন ইউনুস সাহেব,কিন্তু এই বিত্ত- বৈভব সব কিছু তুচ্ছ ছিল ছেলে আজাদের তুলনায়…

স্কুল থেকে ফিরে হোমওয়ার্ক করতে করতে ছোট্ট আজাদ যখন ডেস্কেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেত, তখন খুব সাবধানে ছেলেকে হেলান দিয়ে বসাতেন মা, কুসুম গরম পানিতে পা দুটো ডুবিয়ে নিজ হাতে ডলে ডলে ধুয়ে দিতেন, তারপর তোয়ালে দিয়ে ভালোভাবে হাত-পাগুলো মুছিয়ে দিয়ে ঘুমন্ত ছেলেকে আবার শুইয়ে দিতেন আলগোছে। ছেলে তার সাত রাজার ধন, সম্ভব হলে যে বুকের খাঁচার ভেতর বসিয়ে রাখতেন ছেলেকে, তা বলাইবাহুল্য…

ইউনুস সাহেব যখন বিয়ে করে আরেকটা বউ নিয়ে এলেন, সাফিয়া বেগমের পৃথিবীটা হঠাৎ একবার দোল খেয়ে স্থির হয়ে গেল। কল্পনার বাইরে ছিল ব্যাপারটা, তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্তে ছেলের হাত ধরে এক বস্ত্রে বেরিয়ে এলেন ইস্কাটনের প্রাসাদ থেকে, উঠলেন ফরাশগঞ্জে নিজের বাড়িতে। পাথরকঠিন শপথ করেছেন- এ জীবনে আর চৌধুরীর মুখ দেখবেন না, সামনে আসতে দেবেন না তাকে। বিয়ের সময় বাপের দেওয়া গয়নাটুকু সম্বল করে শুরু হল আজাদের মায়ের সংগ্রাম। দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন বাস্তবতার সাথে লড়াই করে আজাদকে ম্যাট্রিক-আইএসসি-বিএ পাশ করালেন। তখন ইউনুস চৌধুরী আজাদের মাকে ফেরাবার একটা শেষ চেষ্টা করে দেখলেন।

এম.এ করতে আজাদকে কৌশলে করাচী পাঠিয়ে সাফিয়া বেগমকে নিঃসঙ্গ করে ফেললেন এই আশায়- অন্তত এখন যদি সে একটু ভাঙ্গে, একটু মচকায়, স্বামীর কাছে ফিরে আসে। সাফিয়া বেগম ভাঙ্গলেনও না, মচকালেনও না। ফলাফলটা ভালো হলো না। ইউনুস চৌধুরীর গুন্ডারা ফরাশগঞ্জের বাড়িটা দখল করে নিল, আবারও এক বস্ত্রে বোনের পাঁচটা সন্তানকে নিয়ে সাফিয়া বেগম নেমে এলেন রাস্তায়। জুরাইনের খুপড়ি থেকে মালিবাগের চিপাগলি, মালিবাগ থেকে মগবাজার—ভাড়া বাসার জীর্ণ দশায় রুদ্রতার কশাঘাত কেবলই বাড়তে থাকে, শুধু আজাদের মা-ই থাকেন অবিচল, কাঁচা হীরের চেয়েও শক্ত।

“মা, এরপর থেকে জুয়েল-কাজীরা যে অপারেশনে যাবে, আমি সেটাতে যেতে চাই। এত বড় জোয়ান ছেলে ঘরে বসে থাকে, আর দেশের মানুষ মার খায়, এইটা ক্যামন কথা? এইটা হবে না।”

তার বন্ধুরা যোগ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে, ফিরে এসেছে আগরতলা থেকে, ট্রেনিং নিয়ে। তারা ঢাকায় গেরিলা অপারেশন করে। বন্ধুরা আজাদকে বলল, চল, আমাদের সাথে, অপারেশন করবি। তুই তো বন্দুক পিস্তল চালাতে জানিস। তোর আব্বার তো বন্দুক আছে, পিস্তল আছে, তুই সেগুলো দিয়ে অনেকবার শিকার করেছিস।

আজাদ বলল, এই জগতে মা ছাড়া আমার কেউ নেই, আর মায়েরও আমি ছাড়া আর কেউ নেই। মা অনুমতি দিলেই কেবল আমি যুদ্ধে যেতে পারি।

কি জবাব দেবেন ছেলেকে? বলবেন যুদ্ধে যাও? এই ছেলে তার বহু সাধনার ফল। মেয়েটা তার কথা বলা শিখেছিল। কি সুন্দর আধো আধো বুলিতে ডাকতো, মা মা, দাদা দাদা। হুট করে বসন্ত রোগ কেড়ে নিল গেল ওকে, সাফিয়া বেগমের জগতটা হয়ে গেল শুন্য, অর্থহীন। তখন স্রষ্টার অপার দয়ায় তার কোলে এল আজাদ। কী সুন্দর রাজপুত্রের মতো চেহারা, আদেখলার মত কপালে কাজলের টিপ পড়িয়ে রেখেছেন সারাক্ষন, যেন কারোর চোখ না লাগে। সেই বুকের ধনের যদি কিছু হয়, যদি গুলি লাগে গায়ে, সাফিয়া বেগম আর ভাবতে পারেন না, অশ্রুর প্লাবনে ভেসে যায় তার ভাবনার ক্ষমতা।

–ঠিক আছে, তুই যুদ্ধে যেতে পারিস, আমার দোয়া রইল।
ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে থাকে ছেলে মায়ের মুখের দিকে, বুঝতে চেষ্টা করে, মা কি সত্যিই বলছেন না রেগে গিয়ে অনুমতিটা দিচ্ছেন…
–মা, তুমি কি অন্তর থেকে পারমিশন দিচ্ছ, নাকি রেগে গিয়ে?
–আরে রাগ করব ক্যান? দেশটা স্বাধীন করতে হবে না? নিশ্চয়ই, তোমাকে আমার প্রয়োজনের জন্য মানুষ করিনি, দেশ ও দশের জন্যই তোমাকে মানুষ করা হয়েছে।

আম্মা, দুইদিন ধরে কিছু ধইরা একটা দানা মুখে দেন নাই। এমনে চললে তো আপনে মারা যাইবেন। আজাদ দাদা ফিরা আসবোই, কিন্তু আপনে মইরা গেলে আমাদের কি হইব?

ছোট বোনের পাঁচটা সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে সাফিয়া বেগমের নিশ্চলতা ভাঙ্গে। আজাদের খালাতো বোন মহুয়া জোর করে তাকে ডাইনিংয়ে নিয়ে বসিয়ে রান্নাঘরে যায় তরকারী আনতে। দুদিনের অভুক্ত মায়ের সামনে ভাতের প্লেট, ধবধবে সাদা ভাত। ভাতগুলোর দিকে চেয়ে হঠাৎ মায়ের বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যায়, কানে ঝনঝন করে বাজতে থাকে টর্চার সেলের গরাদের ওপাশে থাকা আজাদের শেষ আকুতি…

“মা, ভাত খেতে ইচ্ছে করে। দুইদিন ভাত খাই না। কালকে ভাত দিয়েছিল, আমি ভাগে পাই নাই।”

ছেলে নিখোঁজ হয়ে যাবার পর দুইদিন পর এই প্রথম হু হু করে কেঁদে ওঠেন মা সাফিয়া বেগম, সাদা ভাতগুলো পড়ে থাকে ওভাবেই। আজাদের মায়ের আর ভাত খাওয়া হয় না।

১৪ বছর পর ১৯৮৫ সালের ৩০শে আগস্ট, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছেলের পথ চেয়ে প্রতীক্ষায় ছিলেন মা, তার প্রতীক্ষার পালা শেষ হয়নি। আজাদ ফেরেনি। নিখোঁজ হবার পর থেকে আজাদের মা আর ভাত খেতে পারেননি, ঘুমাতে পারেননি বিছানায়। শক্ত মেঝেতে পাটি বিছিয়ে, বালিশের বদলে পিড়ি অথবা ইট বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন তিনি। আজাদকে যে ঠাণ্ডা মেঝেতে ফেলে অমানুষিকভাবে পিটিয়েছে ওরা, তার আজাদ যে ভাত খেতে চেয়েও এক লোকমা ভাত খেতে পায়নি…

আজাদের মায়ের কথা কেন যেন বারবার মনে পড়ছে। স্মৃতির পাতায় শুকনো ধুলো হয়ে যাওয়া মানুষটা কি আকুল আগ্রহেই না পথে চেয়ে ছিল ছেলের জন্য! আজ আলবদর নিজামী-মুজাহিদদের নিষ্পাপ ইসলামী নেতা হিসেবে প্রচার করা এই প্রজন্মের অনেক তরুণ আজাদের মতো গেরিলাদের খুনী আলবদরদের কবরে লিখে রাখে “শহীদ হজরত কাদের মোল্লা, শহীর মাওলানা হজরত মতিউর রহমান নিজামী”। অথচ আজাদের লাশটাও তার মা খুঁজে পায়নি! শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অপেক্ষা কি অধীরভাবেই না অপেক্ষা করে ছিল, একটাবারের জন্যও তার কলিজার টুকরাকে আর দেখতে পায়নি! আহারে!

লেখাটির জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা আনিসুল হকের “মা” বইটিকে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button