সিনেমা হলের গলি

‘আমরা কি কবর জেয়ারতও করতে পারমু না?’

“জীবিত মানুষটারে দেখতে দিলেন না, মৃত মানুষটারেও দেখতে দিলেন না। এখন কবরটা কই আছে সেইটাও কইতেছেন না স্যার। আমরা কি কবর জেয়ারতও করতে পারমু না? এইটা কোন বিচার গো স্যার?”

একটা মানুষ রাতে সুস্থ সবল অবস্থায় শুয়ে ছিলেন। তাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো। মানুষটা আর ফিরলেন না, তাকে ফিরতে দেয়া হলো না। দুটো চিঠি এলো শুধু তার কাছ থেকে, মানুষটা এলেন না তার পরিবারের কাছে, ফিরলেন না তার সেই ছোট্ট ঘরটায়। সন্তানসম্ভবা এক নারী একটা অপরিচিত শহরে ছুটে বেড়াচ্ছেন তার স্বামীকে মুক্ত করার জন্যে, একবার স্বামীর সঙ্গে দেখা করার আকুলতা যার চোখেমুখে। মানুষটা কি কোনদিন ফিরতে পারবেন বন্দীদশা থেকে? অনাগত যে শিশুটা মাতৃগর্ভের বন্দীদশা থেকে মুক্তির প্রতীক্ষায় আছে, সে কি কখনও বাবাকে কাছে পাবে? 

দীর্ঘ এগারো বছর পরে নাটক নির্মাণে ফিরেছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। যে ছোটপর্দায় কাজ করে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন, মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নিয়েছিলেন, সেখানেই তিনি এসেছেন আবার। আনিসুল হকের ‘আয়েশা মঙ্গল’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘আয়েশা’ নাটকটি নির্মাণ করেছেন ফারুকী। একই উপন্যাস থেকে এর আগেও আয়েশা মঙ্গল নামের একটা নাটক বানিয়েছিলেন তিনি, সেখানে অভিনয় করেছিলেন আহমেদ রুবেল এবং বন্যা মির্জা। আর ‘আয়েশা’র মূল পাত্রপাত্রী তিশা এবং চঞ্চল চৌধুরী।

কাহিনীর সময়কাল সত্তরের দশক। ক্যামেরায় সেই আবহটা পরিস্কারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন পরিচালক। বিমানবাহিনীর একটা ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ঘটনাকে উপজীব্য করে আনিসুল হক লিখেছিলেন ‘আয়েশা মঙ্গল’ উপন্যাসটা। ইতিহাস বলছে, এয়ারফোর্সের কয়েকশো অফিসার আর সেনাকে প্রহসনের বিচারে কোর্ট মার্শালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল, অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগটাও দেয়া হয়নি। সেই অভাগা মানুষগুলোর একজনের গল্পই লিখেছিলেন আনিসুল হক, আর সেই উপন্যাসের মূল চরিত্র ছিলেন আয়েশা নামের এক নববিবাহিত তরুণী। আর সেই অস্থির সময়ের গল্পটাকেই চমৎকারভাবে ফ্রেমে বন্দী করেছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। 

আয়েশা চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা, স্বামীকে ফিরে পাবার আকুলতা প্রতিটা দৃশ্যে তার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে। আয়েশাকে দেখে মন খারাপ হয়েছে, সেইসঙ্গে মনের ভেতর থেকে একটা চাহিদার জন্ম হয়েছে, একটা ভালো খবর আসুক, আয়েশা তার ভালবাসার মানুষটাকে ফিরে পাক, তার সন্তানকে বাবার কোলে তুলে দেয়ার সুযোগটা যেন সে পায়। অসহায় একজন নারীর চরিত্রে আয়েশা বা তিশা যেন আমাদের খুব কাছের কেউ, খুব আপন একজন হয়ে গেলেন একটা ঘন্টায়, যার দুঃখে আমরা সমব্যাথী হতে পারি, যার কষ্টটা আমাদের ছুঁয়ে যেতে পারে।

খুব বেশি সময় স্ক্রীনে না থাকলেও মন জয় করে নিয়েছেন চঞ্চল চৌধুরী। এটাই বোধহয় জাত অভিনেতার গুণ। অল্প সময়ের মধ্যেই জমে উঠেছে তিশার সঙ্গে তার রসায়ন, দুজনের ক্ষণিকের হৃদ্যতাটাই যেন পুরোটা নাটকজুড়ে খুঁজে বেড়িয়েছে মন। জয়নাল আর আয়েশা আরেকটু বেশি সময় কাছাকাছি থাকলে কি হতো, উদয় হয়েছে এমন প্রশ্নেরও।

ক্যামেরার কাজ দুর্দান্ত, পরিচালনায় ফারুকীর মুন্সীয়ানা চোখে পড়েছে বারবার। নিজের কাজের একটা নিজস্ব ধরণ তৈরি করেছেন ফারুকী, তার বলা গল্পগুলো সেই ধরণ মেনে চলে সদাসর্বদা। কিছু পরিবর্তন থাকলেও দুই মিনিট পর্দার সামনে দাঁড়িয়েই বোঝা যায়, এটা ফারুকীর কাজ। ‘আয়েশা’ও তার ব্যতিক্রম নয়। ফারুকীসুলভ মেটাফোরের দেখা মিলেছে ‘আয়েশা’-তেও, নিজের স্টাইলেই গল্প বলেছেন তিনি। সেই গল্প দর্শকের মন খারাপের কারণ হয়েছে। 

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, ব্যাচেলর, ডুব

এক সাক্ষাৎকারে ‘আয়েশা’ নিয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলছিলেন-

‘আমার পক্ষপাতিত্ব সর্বহারার প্রতি, পরাজিত অথবা পরাজয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের প্রতি। বিজয়ীর প্রতি আমি কোনো টান বোধ করি না। “আয়েশামঙ্গল”-এ একজন নারীর কাছ থেকে হুট করেই গায়েব করে দেওয়া হয় তার স্বামীকে। এরপর তাকে রাষ্ট্রের মতো বিশাল একটি শক্তির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। আর রাষ্ট্রের মুখোমুখি যখন আপনাকে দাঁড়াতে হয়, তখন তো আপনার পরাজয় সুনিশ্চিত। আমি দেখাতে চাই, সেখান থেকে একজন একা মানুষ কীভাবে ভীষণ শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, কীভাবে ঘুরে দাঁড়ান।’

ঈদের নাটক বলে ফারুকী আনন্দ দেয়ার রাস্তায় হাঁটেননি, তিনি ধাক্কা দিতে চেয়েছেন, ধাক্কা দিয়েছেন। উপন্যাসটা পড়া না থাকলে দর্শককে স্তব্ধ হয়ে ভাবতে হবে, কেন এমনটা হলো? এরকম কিছু না হলেও তো পারতো! আনিসুল হকের লেখা সহজবোধ্য উপন্যাসটাকে ফারুকী নিজস্ব ক্যানভাসে রঙ আর তুলি দিয়ে এঁকেছেন। সেটা কখনও দর্শককে ভাবাচ্ছে, কখনও কাঁদাচ্ছে, আবার কখনও হৃদয়ে অসীম শূন্যতার সৃষ্টি করছে। 

আয়েশার একেকটা সংলাপ হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। স্বামীকে গর্ভধারণের সুসংবাদ দেয়ার জন্যে আয়েশার কান্না যেন একপশলা বৃষ্টি হয়ে আমাদের ভিজিয়ে যায়, স্টাফ কোয়ার্টারের বাসাটা ছেড়ে যাওয়ার সময় আয়েশার নিজ হাতে গড়া সংসারটা গুঁড়িয়ে যাওয়ার বেদনাটা ছড়িয়ে পড়ে আমাদের মধ্যেও। স্বামীহারা আয়েশার মুখে “আমি তো জানিনা আমার স্বামীর কবর কই, তাই এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলই আমার স্বামীর কবর। আমি যেখানেই মোনাজাত ধরবো, আল্লাহ সেইখানেই জেয়ারত কবুল করে নিবেন” সংলাপটা এত বেশি জীবন্ত, দেখে শিউরে উঠতে হয় অব্যক্ত এক বেদনায়!

ছাপ্পান হাজার বর্গমাইলে আয়েশা তার স্বামীর কবরটা খুঁজে পেয়েছেন কিনা জানা যায়নি। তবে ঈদের শত শত, কিংবা হাজারো নাটকের ভীড়ে গর্ব করে বলার মতো একটা নাটক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী উপহার দিয়ে গেলেন আমাদের। এবারের ঈদের সেরা নাটকের খেতাব ‘আয়েশা’ বিনা দ্বিধায় পেয়ে যাবে, এটা নিশ্চিত। আফসোস, এই মানুষটা গত এক দশকে নাটক পরিচালনা করেননি। সেটাকে আমাদের জন্যে ভীষণ এক অপ্রাপ্তিই বলতে হবে…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button