ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আপনাদের যত বাহাদুরি, তা এই খেটে খাওয়া মানুষদের সাথেই?

মানিক মিয়া হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুচোখে পানি নেই, সেখানে নিখাদ বিস্ময়। এমন কিছু যে ঘটতে পারে তেমনটা তার কল্পনাতেও ছিল না। রিক্সা চালিয়ে সাত সদস্যের পরিবারের খরচ জোটে, বড় ছেলেটা স্কুলে পড়ছে, ছোটটাকেও এবার প্রাইমারীতে ভর্তি করবেন ভেবে রেখেছিল। মেয়েদেরকে পড়ানোর সাধ্য নেই, ওরা বাড়ীতেই থাকে, কাজকর্ম করে। ছেলেদের নিয়ে স্বপ্নটপ্নও দেখছিল মানিক, বড় বড় পরীক্ষায় পাশ করবে তারা, পত্রিকায় ছবিটবি আসবে। গেল বছর তার মতো আরেক রিক্সা চালক আবুলের ছেলে কোন এক পরীক্ষায় পাশ করেছে, সেটার খবর গিয়েছিল কাগজে, পত্রিকা অফিস থেকে লোকজনও এসেছিল। সেরকমটা নিজের বেলাতেও হবে, ভেবে রেখেছিল মানিক। কিন্ত তার স্বপ্নগুলো এখন বুলডোজারের নীচে চাপা পড়ে আছে একটা ভাঙা রিক্সার রূপ ধরে। আশেপাশের অনেক রিক্সাচালকই হাউমাউ করে কাঁদছে, কান্না পাচ্ছে না মানিক মিয়ার। সে তাকিয়ে আছে বুলডোজারটার দিকে। ঘটনাটা গতকাল দুপুরের, বগুড়া শহরের সাতমাথায় প্রশাসন অভিযান চালিয়েছিল শহরের অবৈধ রিক্সার বিরুদ্ধে। সতেরোটা ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা আটকের পর সেগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে বুলডোজার দিয়ে। মানিক মিয়া ভেবে পায় না, প্রশাসন জিনিসটা আসলে কি। দানবের মতো দেখতে বুলডোজারটাকেই কি প্রশাসন বলে?

দৈনিক প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, বগুড়া শহরের যানজট নিরসনের জন্যে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। নির্বাহী হাকিম ফারহানাজের নেতৃত্বে চালানো হয় এই অভিযান। সূত্রাপুর এলাকার গোহাইল সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার একসারি বিক্রয়কেন্দ্র, সেখানেই অভিযান চালায় ভ্রাম্যমান আদালত। মালিকরা আগেই খবর পেয়ে সটকে পড়েছিলেন, বন্ধ দোকান ঘরগুলো সিলগালা করে দেয়া ছাড়া সেখানে তেমন কিছু করতে পারেননি তারা।

তবে কোপটা পড়েছে খেটে খাওয়া রিক্সা চালকদের ওপরে। এই অভিযানের আগে ‘জেলা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল শহরের সাতমাথা এলাকায়। পৌর মেয়র মাহবুবুর রহমানের উপস্থিতিতে এবং অতিরিক্ত জেলা হাকিম মোহাম্মদ হালিমুন রাজীবের নেতৃত্বে আরেকটি অভিযান চালানো হয়। এখানে আটক করা হয় সতেরোটি ব্যাটারিচালিত রিক্সা। সবগুলোরই শেষ ঠিকানা হয় বুলডোজারের নীচে। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় সেগুলো।

সমস্যাটা অভিযান পরিচালনায় নয়। অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে যেকোন অভিযান অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। কিন্ত সমস্যাটা এর প্রয়োগে। এই সতেরোটা রিক্সার সঙ্গে সতেরোটা পরিবারের আয় রোজগার জড়িত ছিল। সবগুলো যে নির্দিষ্ট এক বা একাধিক মালিকের রিক্সা ছিল এমনটাও হয়তো নয়, নিজের তিলে তিলে জমানো টাকায় হয়তো কেউ রিক্সা কিনেছিলেন। অশিক্ষিত এই মানুষগুলো বৈধ অবৈধের সীমা হয়তো বোঝেন, হয়তোবা বোঝেন না। ব্যাটারিচালিত রিক্সা তো অবৈধ, ওদের পেশাটাও কি অবৈধ ছিল? রিক্সাগুলো ভেঙে ফেলে নাহয় অবৈধ কাজটা বন্ধ করা গেল, আজ সারাদিনে এই সতেরোটা পরিবারে যদি চুলা না জ্বলে, ক্ষুধায় আতর হয়ে অভুক্ত কয়েকটা শিশু যদি কান্না করতে থাকে, সেটার দায় কি প্রশাসন নিতে রাজী হবে? এতগুলো মানুষের ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত এক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে দেশের কি উন্নতি সাধিত হলো, মাননীয় প্রশাসন কি আমাদের বুঝিয়ে বলবেন একটু? 

বগুড়া, প্রশাসন, রিক্সা, অটোরিক্সা, ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা, ভ্রাম্যমাণ আদালত

ব্যাটারিচালিত এই অটোরিক্সাগুলোর গতি সাধারণ রিক্সার তুলনায় অনেক বেশী, এগুলোতে তাই দুর্ঘটনার হারও বেশী। তাছাড়া এসব অটোরিক্সা চলে বিদ্যুতে, ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতির ব্যপারটাও এখানে জড়িত। কিন্ত সবকিছু মাথায় রেখেও বলা যায়, এভাবতে বুলডোজারের নীচে ফেলে চুরমার করে দেয়াটা কোন সমাধান নয়। সরকার বা প্রশাসনের কাজ দেশের মানুষের পেটে অন্ন যোগাতে সাহায্য করা। সেই প্রশাসনকে যদি অন্ন কেড়ে নেয়ার কাজে নামতে দেখা যায়, সেটা দেখতে খুব খারাপ লাগে। এই ‘অবৈধ’ রিক্সাগুলোই তো এতদিন প্রশাসনের নাকের ডগায় বগুড়া শহরে দাপিয়ে বেড়িয়েছে, ট্রাফিক পুলিশের হাতে পাঁচ-দশ টাকা গুঁজে দিয়ে কিংবা অন্য কোন উপায়ে। ঢাকা শহরেও এগুলোর দেখা মেলে ভুরি ভুরি। মহাসড়কে দেখা যায় না তেমন, কিন্ত অলিতে গলিতে এদের সংখ্যা অগুণিত। কোপটা তাহলে কেন নুন আনতে পান্তা ফুরোনো মানুষগুলোর ওপরে পড়লো? কেন নাটের গুরুদের ধরা গেল না? অভিযানের আগেই তাদেরকে সতর্ক করে দিলো কে? তারা দোকানপাটে তালা দিয়ে পালিয়ে যাবার সুযোগটা পায় কিভাবে? এসব নিয়ে আমাদের প্রশাসন ভেবেছে? নাকি উপরমহলে অভিযানের নমুনা দেখাতেই অসহায় মানুষগুলোর ওপর এমন আস্ফালন? অবৈধ এই অটোরিক্সাগুলো রাস্তায় কি রিক্সাচালকেরা নামিয়েছে? এদেরকে এতদিন ধরে রাস্তায় নামার অনুমতি দিয়েছে কে, এই অটোরিক্সা নিয়ে ব্যবসা করেছে কে, কার কার পকেট ফুলে চালের বস্তার সাইজ হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি সেদিকে একটু নজর দেবে?

ঢাকা শহরে আজকাল পথে পথে অভিযান চালানো হয়। উল্টোপথে গাড়ি চলতে দেখলেই ধরে ভ্রাম্যমাণ আদালত, জরিমানা আদায় করে। এখন পর্যন্ত আঁতিপাঁতি লোকজন থেকে শুরু করে মন্ত্রী-আমলার গাড়ি কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িও ধরা পড়েছে এই জালে। আচ্ছা, এই ভ্রাম্যমাণ আদালত কি নিজেদের অভিযানের সময় সঙ্গে একটা বুলডোজার রাখতে পারেন না? যে গাড়িটাকেই উল্টোপথে আসতে দেখা যাবে, সেটাকেই বুলডোজার দিয়ে পিষে ফেলা হবে- এমন কোন কাজ কি তারা করে দেখাতে পারেন? আইন তো সবার জন্যে সমান, তাহলে তিনচাকার রিক্সা বলে সেটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে, আর চার চাকার কোটি টাকা দামের প্রাডো ধরলে সেখানে হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেই ছাড়- এ কেমন সমতা? কেউ কেউ তো আবার ভুয়া মন্ত্রী-এমপির স্টিকার গাড়িতে লাগিয়ে ঘোরে! বগুড়ার রিক্সাগুলো যদি অবৈশ হয়, এই গাড়িগুলো কেন অবৈধ হবে না? সেই সতেরটা রিক্সার ভাগ্য যদি বুলডোজারের নীচে লেখা থাকে, এ গাড়িগুলোও কেন সেই ভাগ্য বরণ করবে না? মালিকের কোটি টাকা বা সামাজিক অবস্থান আছে বলে?

অবৈধ রিক্সা বা অটোরিক্সার বিরুদ্ধে অভিযান চলুক, বাংলাদেশে এই বাহনের কোন অস্তিত্ব না থাকুক সেটাই আমরা চাই। কিন্ত এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটা চালানোর সময় মাথায় রাখতে হবে, এই বাহনের ওপর লাখো মানুষের আয়-রোজগার থেকে শুরু করে মৌলিক চাহিদাগুলো নির্ভরশীল। বুলডোজারের নীচে চাপা পড়ে শুধু রিক্সা ভাঙে না, অনেকগুলো মানুষের মনে পুষে রাখা ব্যক্ত-অব্যক্ত স্বপ্নও ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আশা করি আমাদের প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সেটা বুঝতে পারবেন। আমরা প্রশাসনকে জনমানুষের বন্ধু হিসেবে দেখতে চাই, বুলডোজারের মতো দানবাকৃতির কোন বস্তু হিসেবে নয়। ধরা হোক এসব ব্যাটারিচালিত রিক্সা বানানোর পেছনের হোতাদের, এইসব রিক্সাচালকদের আয়-রোজগারের একটা পথ বের করেই চালানো হোক অভিযান, দেশ থেকে দূর করা হোক ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা- এমনটাই শুধু কামনা। 

ছবি কৃতজ্ঞতা- ফয়সাল মাহমুদ নীল এবং দৈনিক প্রথম আলো।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button