মনের অন্দরমহল

বাচ্চার দেরিতে কথা বলা এবং অটিজম

আমাদের আশেপাশে এমন বাচ্চাদের সংখ্যা আজকাল আশংকাজনক হারে বাড়ছে যারা বয়সের তুলনায় ঠিকঠাকমত কথা বলছে না। হয়তো বলছে কিন্তু যেই পরিমাণ শব্দভান্ডার বাচ্চাটি ব্যবহার করছে হয়তো সেটি তার বয়সের তুলনায় সীমিত। অথবা যা সে বলছে তা বেশিরভাগ সময়ই দেখা যাচ্ছে যে ঠিক অর্থবহ কিছু হচ্ছে না।

এসব বাচ্চাদের অনেকের ক্ষেত্রে বাবা মায়েরা ব্যাপারটিকে হালকাভাবে নিচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ ধারণা করে নিচ্ছেন ট্যাব/মোবাইল বেশি দেখছে বলেই হয়তো বাচ্চার এই অবস্থা। অনেকে ভাবছেন হয়তো বাচ্চার সাথে সারাদিন বাসায় কথা বলার মানুষের অভাব দেখেই এমন! আবার একইভাবে, বাবা মায়েদের আরেকটি গ্রুপকে এই ব্যাপারে সিরিয়াস হতে দেখা যায়। বিভিন্ন শিশু বিকাশ কেন্দ্রে তারা বাচ্চাকে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে এটা চেক করাতে যে, বাচ্চার অটিজম আছে কী না!

আজকের লেখাটি একই সাথে এমন বাবা মায়েদের জন্যে যারা বাচ্চার দেরিতে কথা বলা মানেই অটিজম ভেবে বসেন এবং তাদের জন্যেও যারা বাচ্চার দেরিতে কথা বলাকে একদম আমলেই নেন না! অটিজম এর লেন্সে আমরা পুরো ব্যাপারটি বোঝার চেষ্টা করব। একজন অটিজম আক্রান্ত বাচ্চা আর একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বাচ্চা – এই দু’টোকে মিলিয়ে ফেলা আমাদের স্বাভাবিক প্রবণতা। যদিও একজন বাচ্চার একই সাথে দু’টো প্রব্লেম থাকাটা অস্বাভাবিক না কিন্তু মোটা দাগে এই দু’টো সমস্যার লক্ষণ এবং প্রকাশে সুস্পষ্ট ভিন্নতা আছে।

বুদ্ধি-সুদ্ধি কি একটু কম, বেশি নাকি স্বাভাবিক- অটিজম আক্রান্ত বাচ্চাদের নিয়ে মূল কন্সার্ন কিন্তু সেখানে না। কথা কম বলা বা না বলাও এদের ‘একমাত্র’ সমস্যা না! তাহলে সমস্যাটা আসলে কোথায়? এদের মূল সমস্যাটা ‘সামাজিক বিকাশে’। শুনতে একটু কেমন লাগছে হয়তো। শিশুরা যে শুধু শারীরিকভাবেই বাড়ে না, ওরা মানসিকভাবেও যে সময়ের সাথে বেড়ে ওঠে সেটা নিয়ে আমরা কথা বলি কম। ইনফ্যাক্ট বলি না বললেই চলে!সেই মানসিকভাবে বেড়ে ওঠার একটা গুরুত্বপূর্ণ ডোমেইনে থাকে বাচ্চা বড় হতে হতে সোশ্যালি ইন্টারেক্ট করতে শিখে।

বাচ্চার অটিজম মানে বাচ্চার নিউরোডেভলেপমেন্টাল পিরিয়ডে কিছু না কিছু একটা ঝামেলা হয়ে গেছে যার ফলে বাচ্চার এই সোশ্যাল ইন্টার্যাকশন করার ক্যাপাবিলিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুঃখজনক ব্যাপার হল সেটা সারাজীবন থাকবে। এক্সাক্ট কি কারনে এমন টা হয়েছে বিজ্ঞান সেটা এখন ও নিশ্চিত করেনি। আমরা একজন অন্যজনের সাথে কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে মাত্র ৭% কথা বলে করি (মানে verbally করি), বাকি ৯৩% কিন্তু করি বিভিন্ন gesture অর্থাৎ অঙ্গভঙ্গি বা মুখভঙ্গির মাধ্যমে (Non verbal comnunication)। (এই ভার্বাল এবং নন ভার্বাল কমিউনিকেশনের পারসেন্টেজ নিয়ে কিছু তর্ক থাকলেও, নন ভার্বাল ব্যাপারগুলো যে ইন্টার্যাকশনের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় সে ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই।)

মিলিয়েই দেখুন না, অনেক কথা না বলেও শুধু চোখের ভাষাতেই আমরা সামনের মানুষকে কত্ত কিছু বুঝিয়ে ফেলি! সমাজে চলতে গেলে, মানুষে মানুষে সম্পর্ক গড়তে গেলে এই non verbal social cue গুলো না বুঝলে কিন্তু আমরা একদম অচল হয়ে যেতাম! অটিজম আক্রান্ত বাচ্চাগুলো এক্ষেত্রেই স্পেসিফিক্যালি অনেক বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। ব্যাপারটা একটু সহজে বোঝার স্বার্থে নিচের উদাহরনটি কাজে লাগতে পারে-

ধরুন, একজন অটিজম আক্রান্ত বাচ্চার সামনে যদি আপনি আর একটা বস্তু থাকে , তবে সেই বাচ্চাটির মনোযোগ বস্তুর দিকে থাকবে। কারণ ওর ব্রেইন এভাবেই তৈরি হয়ে আছে যে, কিভাবে ও আপনার সাথে কথা, আচরণ বা অভিব্যক্তির মাধ্যমে কানেক্ট করবে ও জানে না! ও সেই বস্তুটাতেই পুরোপুরি বুঁদ হয়ে যায়। বস্তুটাতেই তার মনোযোগ। সামনের মানুষটাও যে মজার সেটা বোঝার ক্ষমতা ওর ব্রেইনের নাই। ওদের একটা চিন্তার আলাদা জগত আছে যেই জগতটা আমাদের থেকে আলাদা।

আপনি হয়তো ব্যথা পেয়ে ‘উফ’ করে উঠলেন, একটি স্বাভাবিক বিকাশের বাচ্চার চেহারায় আপনার জন্যে একটা মায়া/কন্সার্ন ফুটে উঠবে। সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল যে, একটি অটিজম আক্রান্ত বাচ্চার চেহারায় আপনি এ ধরনের কোন আবেগের প্রকাশ দেখবেন না। দেখবেন তো না-ই, এদিকে হয়তো দেখা গেল, বাচ্চা হেসেও ফেলতে পারে! মানে আবেগের প্রকাশটাও ওরা অদ্ভুত কিছু করে। এদিকে, আমি বা আপনি হয়তো ভাবব বাচ্চাটা নিশ্চিত নিষ্ঠুর কিংবা একটা পাগল কিংবা বোকা!

এবার চলুন দেখি, বাচ্চা দেরিতে কথা বললে আর ন্যূনতম কোন ব্যাপারগুলোকে আমরা খুব ভালোভাবে খোঁজার চেষ্টা করব-

স্পেসিফিক্যালি ১২ মাস বয়সে কিছু ব্যাপার বাচ্চার ভেতরে আছে কি নেই, অথবা একটু বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ১২ মাসে এগুলো ছিল কীনা সেদিকে আমাদের অভিভাবকদের খেয়াল করতে হবে। ১২ মাসের একটা বাচ্চা আপনার চোখে চোখে তাকাবে। সেই তাকানোটাতে আপনার ব্যাপারে আগ্রহ থাকবে, নতুন কোন মানুষ হলে কৌতূহল থাকবে। অর্থাৎ বাচ্চা যে তাকাচ্ছে, সেই তাকানোটাতে কোয়ালিটি থাকবে। এই আই কন্ট্যাক্ট বাচ্চার সামাজিক বিকাশ ঠিকঠাক হচ্ছে কীনা সেটা বোঝার একটা জরুরী মার্কার। (কিন্তু একমাত্র মার্কার নয় যেভাবে এটাকে গুরুত্ব দেয়া হয় আর অন্যগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়)

একটা রুমে ১০০০ জন মানুষ আছে। আপনিও আছেন। দূর থেকে আপনার নাম ধরে যদি কেউ ডাকে আপনি সাথে সাথে সেদিকে ফিরে তাকাবেন। এটাই ‘ভয়াবহ’ স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। বাচ্চা কথা বলে বা বলে না সেই প্রব্লেম ছাপিয়ে যদি দেখেন স্বাভাবিক শ্রবণ ক্ষমতার একটি বাচ্চার বয়স ১২ মাস পেরিয়ে গেছে অথচ ওর নাম ধরে ডাকলে ও সাড়া দেয় না বা ফিরে তাকায়না এটা কোন ভাল লক্ষণ না। ৬ মাস হতে হতেই বাচ্চার নামের ব্যাপারে ওরিয়েন্টেশন হয়ে যায়।

বাচ্চাটা ওর ‘পছন্দের’ জিনিসটা তর্জনী দিয়ে এক আংগুলে পয়েন্ট করে আপনাকে দেখাতে চাইবে সেটা হতে পারে আকাশে উড়ে যাওয়া পাখি বা রাস্তার লাল টুকটুকে গাড়ি বা একটা ম্যাঁও ম্যাঁও করে ছুটে যাওয়া বিড়াল। এটাকে আমরা বলি পয়েন্টিং। শুনতে কেমন শোনালে ও জেনে নিন, এটাও একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সোশ্যাল মার্কার যেটা ১ বছরে চলে আসে। বাচ্চা টা টা দিতে শিখে যায়।

সেই সাথে অন্যকে অনুকরণ করার প্রবণতা দেখায়। মানে মা চুল আঁচড়াচ্ছে, দেখবেন বাচ্চাও সেভাবে করার একটা চেষ্টা হয়তো দেখাবে। আরো একটু বড় হয়ে গেলে ওর খেলা খেয়াল করুন। ওর গাড়িটা কি আকাশে উড়ে, পুতুলের সাথে কি ও কথা বলে, পুতুল কে খাওয়ায় বা ঘুম পাড়ায়? অর্থাৎ যেসব কাজ আমরা প্রতিদিনকার জীবনে করি সেগুলো একটি বাচ্চা অবজার্ভ করে এবং বড় হতে হতে নিজেদের খেলায় তার প্রকাশ ঘটায়। বাচ্চাকে এ ধরনের কাল্পনিক খেলাগুলো না খেলতে দেখলে সচেতন হোন। অটিজম আক্রান্ত বাচ্চাদের এ ধরনের কাল্পনিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শব্দ, আলো বা সেন্সরি অন্য যেকোন স্টিমুলেশন ওকে কি আলাদাভাবে সংবেদনশীল করে তোলে? পেটের সমস্যা কি ঘন ঘনই হয় হোক তা ডায়রিয়া কিংবা কোষ্টকাঠিন্য? কোন একটা নির্দিষ্ট টেক্সচার এর বস্তুর ব্যাপারে বাচ্চার অতিরিক্ত আকর্ষণ থাকতে পারে। বাচ্চা বারে বারে দেখবেন সেটা ধরতে চাইছে। আবার উল্টো টাও হতে পারে সেই particular texture তার অসহ্য ও লাগতে পারে! যেমন, বাচ্চা টয়লেট চেপে বসে থাকে দিনের পর দিন কারন স্টুল এর টেক্সচার ও জাস্ট নিতে পারেনা!

খেয়াল করুন, ওর কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য আপনার চোখে পড়ে কিনা। যেমন ধরুন- হয়তো একটার পর একটা গাড়ি সারি সারি করে ও শুধু সাজায় আর সাজায়। কোন একদিন আপনি একটু অন্যভাবে করতে চাইলেই ও ভীষণ রিয়্যাক্ট করে বসে। যে রাস্তা দিয়ে ও নানার বাড়ি যায় ঠিক সেই গলি দিয়ে না গেলেই ও ভয়ংকর রিয়্যাক্ট করে বা এরকম কিছু।

খেয়াল করুন এমন কোন একটু ভিন্ন কোন অঙ্গভঙ্গি যেটা বাচ্চাটা হয়তো বারে বারে করে। সেটা হতে পারে শব্দ, অভিব্যক্তি, বা আচরণ। তার মানে, মনে রাখতে হবে, বাচ্চার এক্সপ্রেসিভ ল্যাংগুয়েজ মানে মুখে কথা বলাটাই আসল ব্যাপার না। বাচ্চা যখন দেখেন একদিকে কথা বলছে কি বলছে না, তখন শুধু সেটা নিয়ে পড়ে না থেকে অন্যান্য ব্যাপার যেগুলো বলেছি সেগুলোও খেয়াল করুন।

সাধারণত একেক বাচ্চা একেক ধরনের কম্বিনেশনে উপরের উপসর্গগুলো নিয়ে আমাদের কাছে আসে। এতো ছোট্ট ছোট্ট ব্যাপারগুলো বাচ্চার ভেতরে না থাকলে যে অটিজম এর মত এত্ত বিশাল এক সমস্যা হতে পারে সে হিসেব আমাদের মেলে না কারন শ্বাস নিতে নিতে যেমন আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাই একইভাবে, একটা সুস্থ বাচ্চা জন্মাচ্ছে,বড় হচ্ছে ব্যাপারটাও আমাদের কাছে সেরকম হয়ে গেছে। অতি মাত্রায় প্রাকৃতিক! একটি সুস্থ বাচ্চা মানে আসলে স্রেফ আল্লাহর এক অনুগ্রহ।

উপরে যে বিষয়গুলো নিয়ে লিখেছি এগুলোকে ওয়ার্নিং সাইন হিসেবে নিতে পারেন। নিজে নিজে বাচ্চার ব্যাপারে ডায়াগনোসিস এ পৌঁছে যাবেন না। এই লেখাটাতে খুবই খুবই gross ব্যাপারগুলোই উল্লেখ করেছি। তাই কোন বাচ্চাকে নিয়ে সন্দেহ হলে, যত দ্রুত সম্ভব অটিজম আছে কী নেই, সময় নিয়ে সেই Assessment করাতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। এতো তাড়া এজন্যে দিচ্ছি যে, যত দ্রুত বাচ্চাকে Early Intervention এর আওতায় আনা যাবে তত বেশি আমাদের আশাবাদী হবার সুযোগটা হয়তো বাড়বে।

লোকের ভয়ে, আসলেই যদি ‘অটিজম’ ধরা পড়ে সেই ভয়ে অনেক বাবা মা কুঁকড়ে থাকেন। আর তাতেই বড্ড দেরি হয়ে যায়! আমাদের সবার সচেতনতা এক্ষেত্রে ভীষণ ভীষণ জরুরী যাতে এধরনের বাবা মায়ের পাশে আমরা সাহস হিসেবে দাঁড়াতে পারি, বাঁধা হিসেবে নয়।

অটিজম নিয়ে আলাপ শেষ। এবার সংক্ষেপে আসি, অটিজম নেই কিন্তু ভাষার ব্যাপারে পিছিয়ে পড়া আমাদের স্বাভাবিক বাচ্চাদের ব্যাপারে সচেতনতার বিষয়ে।

বাচ্চার ভাষার প্রতি দখল দু’টো ব্যাপার মিলে হয়- ‘ভাষা বোঝা’ (যেটাকে early childhood development এর ভাষায় আমরা বাচ্চার receptive language বলে থাকি) এবং ‘ভাষা বলা’ (যেটাকে বলা হয় expressive language)। বাচ্চার ইন্টেলেক্ট এর সাথে ভাষার ব্যাপারটা কিন্তু সরাসরি জড়িয়ে! তাই এই দুই ডোমেনে একজন স্বাভাবিক বাচ্চাকেও যদি স্ট্রাগল করতে দেখেন স্পেশালিস্ট এর কাছে নিতে হবে।

আসুন, বাচ্চার অটিজম নিয়ে নিজে সচেতন হই। অন্যকেও সচেতন করি। স্বাভাবিক ডেভলপমেন্টে একটু পিছিয়ে পড়া বাচ্চাদেরকেও ফেলে না রাখি। বাচ্চার প্রতি বছরের জন্মদিন পালন করার আগে ওর বয়স অনুযায়ী নিউরোডেভলেপমেন্টাল কোন এসিস্ট্যান্স দরকার কীনা সেটা নিশ্চিত করুন। তাতেই হয়তো সত্যিকার অর্থে শিশুর জীবনকে উৎসবমুখর করা হবে।

ডাঃ সুষমা রেজা
Head of Early intervention( Hope Autism Center)
Head of Child Development & Parent Education
(LifeSpring Mental Healthcare Institute)

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button