সিনেমা হলের গলি

এটিএম শামসুজ্জামানের জন্যে প্রার্থনা…

বাংলাদেশী তারকাদের মধ্যে এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যুসংবাদ নিয়েই সবচেয়ে বেশি গুজব রটেছে, ভুঁইফোঁড় অনলাইন পোর্টাল বা অনেক জনপ্রিয় সংবাধমাধ্যমও অনেক সময় তার মৃত্যুর মিথ্যে সংবাদ প্রচার করেছে, বিভ্রান্ত করেছে মানুষকে। গুণী এই অভিনেতা এখন সত্যিই গুরুতর অসুস্থ, বলা যায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তিনি। ডাক্তারেরা জানিয়েছেন, বর্ষীয়ান এ অভিনেতা এখন স্বাভাবিক কোনো খাবার খেতে পারছেন না। সরকারী ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসার জন্যে তাকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথাবার্তাও চলছে।

গত ছাব্বিশে এপ্রিল রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে এটিএম শামসুজ্জামানকে ভর্তি করা হয় পুরান ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে। পরদিন তার শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়, এখনও সেখানেই চিকিৎসাধীন আছেন তিনি। তার স্ত্রী রুনী জামান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন,

‘তার (এটিএম শামসুজ্জামান) খাদ্যনালী শুকিয়ে গেছে। একারণে তিনি খাবার খেতে পারছেন না। চিকিৎসকরা চেষ্টা করছেন ওষুধ দিয়ে সমস্যাটা সমাধান করার। যদি সমস্যার সমাধান হয় ভালো, না হলে চিকিৎসকদের আর কিছুই করার নেই। একমাত্র আল্লাহ সহায়।’

১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ সিনেমায় খলচরিত্রে তাঁর আবির্ভাব। শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ছিল, সিনেমায় অভিনয়ের আগ্রহও ছিল, আগে চিত্রনাট্য লিখতেন, তবে অভিনয়ে আসার কথা ভাবেননি সেভাবে। রাজী হয়েছিলেন কেবল কয়েকটা কথা ভেবে- অনেকক্ষণ পর্দায় থাকতে পারবেন, আর পারিশ্রমিক হিসেবে টাকাপয়সার পরিমাণটাও ভালো- এসব ভেবেই ভিলেন হতে আপত্তি করেননি তিনি। সেটা দিয়েই আলোচনায় চলে এলেন এটিএম শামসুজ্জামান।

এরপর একে একে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, সূর্যদীঘল বাড়ী, অশিক্ষিত, ছুটির ঘন্টা, ‘রামের সুমতি’র মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি, মানুষ চিনলো তাঁকে, খলচরিত্রে তাঁর কৃত্রিমতাবর্জিত অভিনয় দেখে কখনও রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উঠতো তাদের, কখনওবা ইচ্ছে হতো সিনেমার পর্দা থেকে টেনে বের করে এনে কষে দু ঘা লাগিয়ে দিতে!

নিজে লেখক ছিলেন, খলনায়কের অংশের ডায়লগ নিজেই কাঁটাছেড়া করে পরিচালককে দেখাতেন, পরিচালক সেটা পছন্দ না করে পারতেন না। খল চরিত্রে একটা মানুষ হিসেবে যতটা কুটিল আর ভয়ঙ্কর হওয়া যায়, সেটাই সাজার চেষ্টা করতেন এটিএম শামসুজ্জামান, আর এই কাজে বেশীরভাগ সময়েই তিনি ছিলেন শতভাগ সফল। 

যখন যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যতোটুকু স্ক্রিনটাইম পেয়েছেন, নিজের জাত চিনিয়েছেন প্রতিবার। নায়ক না হয়েও অনেকখানি আলো কেড়ে নিয়েছেন নিজের দিকে। সিনেমা বা নাটকে তাকে অভিনয় করতে দেখাটাই ছিল চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা। এমনই জীবন্ত ছিল তার অভিনয়, একবার এক গ্রামে গিয়েছেন শুটিং করতে, সেই গ্রামের নারীরা সামনাসামনি তাকে দেখেই ‘হারামজাদা খাচ্চর বেডা’ বলে গালি দিতে শুরু করেছিল! তাদের ধারণা ছিল, পর্দায় মানুষটা যতো খারাপ, বাস্তবেও বুঝি তা-ই!

আশির কাছাকাছি এখন তার বয়স, শরীরে বাসা বেঁধেছে হাজারো অসুখ। বয়সের ভারে ন্যুজ্য এই মানুষটা এখন মৃত্যুর সঙ্গে জোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসকেরা খুব বেশি আশা দেখতে পাচ্ছেন না, হয়তো দুয়েকদিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে, চিকিৎসার জন্যে তাকে দেশের বাইরে নেয়া হবে কিনা।

ক্যারিয়ারে অসংখ্য সিনেমা করেছেন, অভিনয়ের জন্যে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সহ আরও অনেক সম্মাননাও। তবুও অভিনয় তাকে পরিপূর্ন তৃপ্তি দিতে পারেনি, এখনও তিনি নিজের ‘ড্রিম রোল’ খুঁজে বেড়ান, কিছুদিন আগে এমনটাই জানিয়েছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান।

সদাহাস্য এই মানুষটা আমাদের মাঝে সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন আবার, নিজের সেই স্বপ্নের চরিত্রে অভিনয় করবেন, এটাই আমাদের কামনা। একদিন তো সবাইকেই চলে যেতে হবে, কিন্ত যাবার আগে এটিএম শামসুজ্জামান যেন তার স্বপ্নটা পূরণ করে যেতে পারেন, স্রষ্টার কাছে এই প্রার্থনাই করি।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button