ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

অথচ তাকেই আমরা মেয়র বানিয়েছি!

২০১৩ সাল। ক’দিন আগেই রানা প্লাজা ধ্বসে নিহত হয়েছেন প্রায় হাজারখানেক শ্রমিক, অনেকে তখনও নিখোঁজ। আহতদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে সাভারের এনাম মেডিকেল আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাতাস। হাজারো ইস্যুর ভীড়ে আমরা ধীরে ধীরে রানা প্লাজার কথা, নিহত শ্রমিকদের কথা ভুলেই গেছি ততদিনে। তবে কানাডার সিবিসি টেলিভিশনের সাংবাদিক মার্ক কেলি। বাংলাদেশের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্যে কানাডা থেকে উড়ে এসেছিলেন তিনি। আসার আগে বিখ্যাত চেইনশপ ওয়ালমার্টের এক শো-রুম থেকে বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত একটি শার্ট কিনে নিয়ে এসেছিলেন। শার্টের কলারে জ্বলজ্বল করছিল একটি লেখা- ‘মেড ইন বাংলাদেশ!’

মার্ক কেলি খবর পেয়েছিলেন, বাংলাদেশের বড় গার্মেন্টস কোম্পানীগুলো ওয়ালমার্ট বা এরকম বিখ্যাত রিটেইলারদের কাছে যেসব কাপড় বিক্রি করে, সেগুলো তারা নিজেদের গার্মেন্টসে না বানিয়ে কম খচ রচে তৃতীয় কোন প্রতিষ্ঠানে তৈরি করে। কেলির উদ্দেশ্য ছিল, এই শার্টটির বেলাতেও সেরকম কিছু ঘটেছে কিনা, সেটা সরেজমিনে তদন্ত করা। বাংলাদেশে আসার আগে কেলির সঙ্গে যোগাযোগ হয় সুজিত নামের এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তির সঙ্গে। এই সুজিত আগে ওয়ালমার্টে কাজ করতেন ডিজাইনার হিসেবে, রানা প্লাজা ট্র‍্যাজেডির কিছুদিন পরে তিনি সেই চাকুরিটা ছেড়ে দেন।

সাংবাদিক মার্ক কেলি

সুজিতকে সঙ্গে নিয়েই মার্ক কেলি পা রাখলেন ঢাকায়। শিপমেন্টের কাগজপত্র ঘেঁটে তারা বের করলেন, এই শার্টটি প্রস্তুত করা হয়েছে ‘হাসান তানভির ফ্যাশন ওয়্যারস’ নামের এক গার্মেন্টসে। খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পারলেন, ওয়ালমার্ট আমেরিকার সাথে এই প্রতিষ্ঠানের কোন চুক্তিই নেই! বিস্তারিত জানার জন্যে তারা গেলেন সেই গার্মেন্টসে, কিন্ত তাদের উদ্দেশ্যে জানার পরে সেখানকার কর্মকর্তারা তাদের ভেতরেই ঢুকতে দিলেন না! সন্দেহ হলো মার্ক কেলির, এখানে নিশ্চয়ই কোন গোপন ব্যাপার আছে!

হাসান তানভীর ফ্যাশনের কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে গোপনে দেখা করলেন তারা, সেই শ্রমিকেরাও সবাই মুখ খুলতে চাইলেন না। কয়েকজন অবশ্য রাজী হলেন কথা বলতে, তাদের রাজী করাতেও বেগ পেতে হয়েছিল মার্ক কেলি-কে। এক নারী শ্রমিক জানালেন, যে শার্টটি কেলি এবং সুজিত আমেরিকা থেকে নিয়ে এসেছেন, সেটি তিনি নিজের হাতে বানিয়েছিলেন। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিটির পঞ্চম তলায় প্রস্তুত হয়েছিল সেই শার্টটি।

শার্ট প্রস্তুতের স্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে মার্ক কেলি এবার ছুটলেন ঢাকার কারওয়ান বাজারে। অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে বিজিএমইএ ভবনের সামনে গিয়ে পৌঁছুলেন তিনি। সেখানে তিনি দেখা করলেন বিজিএমইএ’র তৎকালীন সভাপতি আতিকুল ইসলামের সঙ্গে। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো বাংলাদেশের গার্মেন্টসগুলোয় ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিয়ে। আতিকুল ইসলাম জবাব দিলেন, ‘সবারই কাজের স্বাধীনতা আছে, কেউ যদি কর্মক্ষেত্রে অনিরাপদ বোধ করে, তাহলে সে চাকরি ছেড়ে দিতে পারে।’ কি প্রশ্নের কি জবাব! এই উত্তর টা কেউ ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’-তে দিলে উত্তরদাতাকে এই একটা জবাবের জন্যেই এক কোটি টাকা দিয়ে ফেলতো কর্তৃপক্ষ!

যাই হোক, ঘটনা এখনও শেষ হয়নি, কেবল শুরু। এরপরে মূল প্রসঙ্গে এলেন মার্ক কেলি, বললেন, ‘অভিযোগ আছে যে, বাংলাদেশের বড় গার্মেন্টস গ্রুপগুলো বিদেশী ক্রেতাদের কাচ থেকে বড়সড় অর্ডার নেয়ার পরে সেই কাপড়গুলো ছোটখাটো এমন অনেক গার্মেন্টস কারখানায় বানিয়ে নেয়, যেখানকার কর্মপরিবেশ নিয়ে আশঙ্কা আছে। আতিকুল এই প্রশ্নের জবাবে বিশাল ফিরিস্তি ঝেড়ে বললেন, বাংলাদেশে এমনটা কেউ করে না। দেশের গার্মেন্টস সেক্টর এখন বদলে গেছে!

তখন মার্ক কেলি সেই শার্টটি বের করলেন, যেটি তিনি ওয়ালমার্ট থেকে কিনে নিয়ে এসেছিলেন। আতিকুলকে তিনি বললেন, কানাডার ওয়ালমার্টের সাথে আতিকুলের গার্মেন্টসের চুক্তি, অথচ তাদের শার্ট কিভাবে অন্য গার্মেন্টসে বানানো হয়? আতিকুল পুরোপুরি অস্বীকার করলেন এই অভিযোগ, সেইসাথে এও বললেন যে, এই শার্ট কোন কারখানায় বানানো হয়েছে সেটা তার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।

সাক্ষাৎকার শেষ, ক্যামেরা গুছিয়ে মার্ক কেলি উঠে যাবেন। শার্টটা হাতে নিয়ে ব্যাগের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখার আগমূহুর্তে আতিকুল ইসলাম তার কাছে শার্টটা চাইলেন, তারপর সেটাকে নিয়ে গেলেন নিজের টেবিলের কাছে। হাতে একটা কলম নিলেন। তার খানিক বাদে শার্টটা ফেরতও দিলেন মার্ক কেলি-কে। ক্যামেরা যে তখনও চালু ছিল, সেটা জানতেন না আতিকুল। হোটেলে ফিরে কেলি ব্যাগ খুলে দেখতে পেলেন, শার্টের ট্যাগে কলমের কালিতে বারকোড এবং কানাডিয়ান ইমপোর্ট নম্বরটি মুছে দেওয়া হয়েছে। এখন আর কেউ প্রমাণ করতে পারবে না যে এই শার্টটি কোথায় বানানো হয়েছে!

মার্ক কেলি পরদিন আবার গেলেন আতিকুলের অফিসে, জানতে চাইলেন, শার্টের বারকোড এবং ইমপোর্ট নম্বর তিনি কেন কালি দিয়ে নষ্ট করেছেন। আতিকুল ইসলাম পুরোপুরি অস্বীকার গেলেন ব্যাপারটা, যেন তিনি ভাজা মাছটিও উল্টে খেতে জানেন না তখন! চোখেমুখে অদ্ভুত এক বিস্ময় নিয়ে মার্ক কেলি ঢাকা ছাড়লেন। একটা দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা যে এমন আচরণ করতে পারে, সেটা তার কল্পনার বাইরে ছিল!

মার্ক কেলি এখন বাংলাদেশের খোঁজখবর রাখেন কিনা কে জানে! রাখলে তার জানার কথা, শার্টের কলার থেকে কলমের কালি দিয়ে বারকোড আর ইমপোর্ট নম্বর মুছে দেয়া সেই আতিকুল ইসলাম এখন ঢাকার মেয়র! ভোটে নির্বাচিত নাকি বিনাভোটে, সেই বিতর্কে না যাই, তিনি মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন, দায়িত্ব পালন করছেন। তবে মানুষ হিসেবে তিনি বদলাননি। আগে কালি দিয়ে নম্বর মুছে দিতেন, এখন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রের রক্ত মুছে যাবার আগে সেখানে গিয়ে ওভারব্রীজের উদ্বোধন করে আসেন, তার ধারণা, মানুষের মন থেকে রক্তাক্ত সেই স্মৃতিও বুঝি বারকোডের মতো করে মুছে ফেলা যাবে!

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- সওগাত আলী সাগর, পীয়্যান মুগ্ধ নবী

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button