ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আবার চলন্ত বাসে ধর্ষণ চেষ্টা!

নোয়াখালির সুবর্ণচরের হৃদয়বিদারক ঘটনা সারাদেশে আলোড়িত হয়েছে। সবাই সবার অবস্থান থেকে বিচারের রব তুলায়, প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা গ্রহণ করে। কিন্তু, ধর্ষণ থেমে নেই। ধর্ষণের চেষ্টা থেমে নেই। এবার ঢাকাতেই আরো একটি ভয়ংকর ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বাসের নাম আসমানী পরিবহন। ঘটনা ঘটেছে গত ২৮ ডিসেম্বর। রাজধানীর আশুলিয়ায় স্লুইসগেট কাঁচাবাজার সংলগ্ন সড়কে এই ঘটনা ঘটে। বাসের মধ্যে তন্দ্রাভাব এসেছিল মেয়েটির। হঠাৎই কারো স্পর্শে যখন মেয়েটি চোখ খুললো, সে বুঝতে পারলো জমের খপ্পরে পড়তে যাচ্ছে সে। তখন সন্ধ্যা সাতটা পার হয়ে গেছে। মেয়েটি টের পেল গোটা বাসে সে একা। আর কেউ নেই।

গাড়ির চালক, হেল্পার, কন্ট্রাক্টর সহ কয়েকজন মিলে তরুণীকে ঘিরে ধরে। মেয়েটির ফোন আর গলায় থাকা গহনা তারা টেনে নিয়ে নেয়৷ এতটুকুতে তারা খুশি নয়। তাদের লক্ষ্য আরো ভয়ংকর। তারা মেয়েটির ওড়না টেনে হিঁচড়ে তার উপর হামলিয়ে পড়ে। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কি হতে যাচ্ছিলো সেখানে। মেয়েটির উপর প্রবল নির্যাতন চালানোর চেষ্টা করে যায় ধর্ষকের দল।

ধর্ষন, মামলা

মেয়েটি আকুতি জানায়, ফোন, গহনা সব নিয়ে নিক শুয়োরের দল। তাকে ছেড়ে দিক তবুও। কিন্তু, শুয়োরের দল, ধর্ষণের পরিকল্পনা নিয়েই যেন মেয়েটিকে টার্গেট করে। মেয়েটিকে শারীরিকভাবে নির্যাতিত করে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মেয়েটি নিজেকে কোনোমতে ছাড়িয়ে বাঁচার প্রবল আকাঙখায় ঝাপিড়ে পড়ে বাস থেকে। কাঁচ ভাঙ্গা সেই লাফে মেয়েটি আহত হয় প্রচন্ডরকম। মাথায় ঝখম হয়, হাত পা থেঁতলে যায়!

এই হলো অবস্থা! ধর্ষকদের এই অত্যাচার, এই প্রতাপ শেষ হবে কবে? কোথায় গেলে মেয়েরা নিরাপদ? আর কি কি বিশর্জন দিলে একটা মেয়ে ভাবতে পারবে সে নিরাপদ? নিজের সম্ভ্রমটুকু বাঁচাতে এই তরুণী গহনা, ফোন দিয়েও ছাড়া পেল না। পোষাকের ফতোয়া তুলে অনেক পোটেনশিয়াল ধর্ষক, শুয়োরের দলের কাছে হিজাব পড়া মেয়েরাও তো ছাড় পায়নি। নারীদের চলাফেরার দোষ দেয় অনেক শুয়োরের দল, পাঁচ বছর বয়সী শিশুও তো রেহাই পায় না তাদের হাতে! একটা লাইন পড়েছি কোথায় যেন। কেউ বলে শুয়োরের মাংস নিষিদ্ধ, কেউ বলে গরুর মাংস নিষিদ্ধ, শুধু নারীর মাংসটাই আন্তজার্তিক। আসলেই তো তাই! শুধু এই মাংস ছোঁয়া যাবে যেকোনো অজুহাতে।

শিশুর যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে করণীয়, শিশু যৌন নিপীড়ন, বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন

বার বার ধর্ষণের এমন ঘটনা ঘটে যাচ্ছে কেন? এর সবচেয়ে বড় কারণ বোধহয়, কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ দেখা যায় না। ধর্ষকরা যদি হাই প্রোফাইল কেউ হয়, তাহলে তো বিচার আশা করার আশা শুরুতেই বাদ দিয়ে দিতে হয়। ধর্ষকরা কোনো না কোনো ভাবে মুক্তি পেয়ে যায়, আইনের ফাঁক গলে৷ আর ধর্ষিতাকে মুখ লুকিয়ে বাঁচতে হয়। কি অদ্ভুত নিয়ম! মেয়ে স্বাভাবিকভাবেও বেঁচে থাকতে পারবে না, ধর্ষকদের ভয়ে মুখ লুকাতে হবে, নিজেকে গুটিয়ে রাখতে হবে। ধর্ষিতা হলেও তাকেই মুখ লুকাতে হবে। এ কেমন নিয়ম? আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, স্পিকার নারী, বিরোধীদলের নেত্রীরাও নারী। আমরা নারীদের নিয়ে কত চেতনা দেখিয়ে বেড়াই, শুধু এখন পর্যন্ত তাদের এই ভরসাটুকু দিতে পারি না, তুমি নিরাপদ।

বাংলাদেশে কোনো ধর্ষণেরই সঠিক বিচার হয় না। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ধর্ষকরা পার পেয়ে যায়। আমরাও ভুলে যাই, নতুন ঘটনা, নতুন শিরোনামে আসক্ত হয়ে। শুধু টাঙ্গাইলের রুপা নামক একজনের বিচার হয়েছিল। তিনিও ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন চলন্ত বাসে। শুধু ধর্ষণই নয় তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। বাসে সব যাত্রী নেমে যাওয়ার পর টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে তাকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়। কি নিয়তি! তাকে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়েছিল তখন। পরে দুইদিন পর রুপার ভাই হাফিজুল থানায় গিয়ে বেওয়ারিশ লাশটিই যে তার বোন সেটা শনাক্ত করেন। এই ঘটনার বিচার হয় ১৭৩ দিনের মধ্যে, ছয় মাসের মধ্যে ধর্ষণের বিচার বাংলাদেশে বিরল এক ঘটনা। পাঁচ আসামীর চারজনের মৃত্যুদণ্ড রায় দেয়া হয়। এবং রুপাকে যে বাসের লোকেরা ধর্ষণ করেছিল, সেই বাসের মালিকানা দেয়া হয় রুপার পরিবারকে।

ধানের শীষ, আওয়ামী লীগ, গণধর্ষণ

ধর্ষণের সব ঘটনার বিচার এমন দ্রুত তো হয় না। ফলে বিচারের প্রভাবটা আসলে ধর্ষকদের মননে প্রভাব ফেলে না। যদি ধর্ষণের ঘটনাগুলোর বিচার দ্রুত হয়, সেটা মিডিয়ায় বেশি করে প্রচার করা হয় তাহলে কিছুটা হলেও ধর্ষণের হার কমবে বলে আমার ধারণা।

আসমানী পরিবহনের এই তরুণীর পরিণতি হয়ত রুপার মতো হতে পারত। রুপা দেখে যেতে পারলো না, তার ধর্ষণকারীদের বিচার হয়েছে। কিন্তু, এই তরুণীটি নিজেকে বাঁচাতে বাস থেকে ঝাপ দিয়েছে, বেঁচে গিয়েছে আপাতত। সে কি আশা করতে পারে, তাকে ধর্ষণচেষ্টার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে? ইতিবাচক খবর হলো, বাসটির চালককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এই মেয়েটির বিচারের অধিকার নিশ্চিত করবার জন্যে, প্রতিবাদের ঝড় তুলুন। মেয়েটির পাশে দাঁড়ান। কারণ, পাবলিক পরিবহণে আমার আপনার মা বোনকেও চলতে ফিরতে হয়৷ তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে হলেও এই ঘটনাগুলোর বিচার দাবি করুন…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button