খেলা ও ধুলা

আজ রাতে কোন রূপকথা নেই!

বাংলাদেশের পুঁজি মাত্র ২২২ রান। তবুও রোহিত শর্মার কপালে ভাঁজ। ভারতীয় কোচিং স্টাফদের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার আভাস। পোড় খাওয়া ধোনি যেন একটু অসহিষ্ণু, ধৈর্য্য ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে তার। গ্যালারীতে ভারতীয় সমর্থকদের একপেশে উল্লাস চলেছিল বেশ কিছুক্ষণ, একটা পর্যায়ে সেটাও থেমে গেছে লম্বা একটা সময়ের জন্যে। লুঙ্গি ড্যান্স গানের তালে তালে নাচছিলেন বেশ কিছু ভারতীয় সমর্থক, নাচ ফেলে তারাও উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে ছিলেন মাঠের দিকে। স্কোরবোর্ড যে জয়ের ভরসাটা পুরোপুরি দিতে পারছিল না তাদের! 

মাহমুদউল্লাহ বিপিএল বা ঘরোয়া লীগে কত ম্যাচ দলকে জিতিয়েছেন শেষ ওভারে বোলিংয়ে এসে! আজও এসেছিলেন, বাংলাদেশের জার্সি গায়ে। হাতে মাত্র ছয়টা রান সম্বল, একটা ছক্কা মারলেই ম্যাচ শেষ! সেখান থেকে ম্যাচটা গেল শেষ বল পর্যন্ত! এক রান নিলেই ভারত জিতবে, বলটা ডট গেলে টাই- এমন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বলটা দিয়েছিলেন কেদার জাদবের পায়ের ওপরে। পায়ে লেগেই রানটা এলো, উইকেটের পেছন দিয়ে। 

শেষমেশ রোহিতদের শঙ্কা কেটে গেছে। ফেবারিট হিসেবে টুর্নামেন্টে আসা ভারতীয় দল জিতে নিয়েছে নিজেদের সপ্তম আর টানা দ্বিতীয় এশিয়া কাপ ট্রফিটা। দিনশেষে মিডল অর্ডারের ব্যাটিং ব্যর্থতাই কপাল পুড়িয়েছে বাংলাদেশ দলের। তবু প্রাপ্তি এটাই, হারার আগে হেরে যাইনি আমরা। ম্যাচের আয়ু অর্ধেক শেষ হওয়ার আগেই ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে যেতে দেইনি ফাইনালটাকে। ২২২ রানের পুঁজি নিয়েও শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া- লিটনের দুর্দান্ত সেঞ্চুরির পাশে এটুকুই নাহয় পাঁচ উইকেটের হা্রের দিনের প্রাপ্তি। 

২০০৯ সালের ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে মুরালিধরণের ভূতুড়ে পারফরম্যান্সের কাছে হেরেছিলাম আমরা। ২০১২ এশিয়া কাপে পাকিস্তান নয়, আমরা হেরেছিলাম ভাগ্যের কাছে, কিংবা শাহাদাতের ওই শেষ ওভারটাই গড়ে দিয়েছিল ব্যবধান। ২০১৬ এশিয়া কাপে দুর্দান্ত ভারতের কাছে হার মেনেছিলাম, নিদহাস ট্রফির ফাইনালে এক দিনেশ কার্তিকই হারিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের। এ বছর ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে আমরা হেরেছিলাম ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায়। আরেকটা ফাইনাল, আবারও স্বপ্নভঙ্গের বেদনাই সঙ্গী আমাদের। 

কী চমৎকার একটা গল্প লেখা শুরু করেছিলেন লিটন আর মিরাজ মিলে! সবাইকে চমকে দিয়ে লিটনের সঙ্গে মিরাজকে ইনিংসের উদ্বোধনে পাঠিয়ে চমক দিয়েছিলেন মাশরাফি। সেই জুয়াটা কী চমৎকারভাবেই না কাজে লেগে গিয়েছিল! এবারের এশিয়া কাপে যে ওপেনিং পার্টনারশিপ নিয়ে বাংলাদেশের মাথা ব্যথা ছিল সবচেয়ে বেশি, সেই উদ্বোধনী জুটিতেই এসেছিল ১২০ রান। শুরুর সেই ধারাটা ধরে রাখা গেল না আর। মিরাজ আউট হতেই তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছিল বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ। 

যে মিডল অর্ডার গত কয়েকটা ম্যাচে টানা সার্ভিস দিয়েছে, বিপদে ত্রাতা হয়েছে, সেই মিডল অর্ডারই এদিন বিপদটা ডেকে আনলো। স্কোরবোর্ডটা আরেকটু সমৃদ্ধ হলে কি হতে পারতো, সেটা নিয়ে পরে গবেষণা করা যাবে। শেষ বেলায় তাই আজ আর কোন রূপকথার জন্ম হয়নি। জাদুর বাক্স থেকে আমাদের জন্যে বেরিয়ে আসেনি কোন বিস্ময়। উড়তে থাকা কনফেত্তিগুলো আমাদের জন্যে নয়, আলোর রোশনাইয়ের ভিড়ে আজ আমরা হয়তো অচেনাই থাকবো সবার কাছে। স্কোরবোর্ডের ভাষায় আমরা তো বিজয়ী নই আজ! 

ফাইনাল হারের দিনে ব্যর্থতার গল্পটা না শোনালেও বোধহয় চলে। বরং লড়াইয়ের গল্পটা বলা যাক। লিটনের সেই দারুণ ইনিংসটা, এটাই হয়তো তার ক্যারিয়ারের গল্পটা বদলে দেবে। এই ফাইনাল হারের ক্ষতটা লিটনের তখন হয়তো মনেও থাকবে না। ২২২ রানের পুঁজি নিয়ে ম্যাচটাকে শেষ বল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়াটাকে কি বলবেন আপনি? রোহিতের কপালের ওই ভাঁজ, কিংবা ভারতীয় দর্শকদের উল্লাস থামিয়ে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে থাকা- এগুলোও তো প্রাপ্তি। 

যারা ভারত পাকিস্তানের তিন ম্যাচ সিরিজ বানিয়ে দিতে চেয়েছিল এশিয়া কাপটাকে, তাদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে বাংলাদেশ যে ফাইনাল খেললো, কিংবা ভারতের কালোঘাম বের করে দিলো, সেটাকে কেন আপনি ছোট করে দেখবেন? কি দল নিয়ে খেলতে হয়েছে আমাদের, সেটা একবার ভেবে দেখেছেন তো? তামিম নেই শুরু থেকেই, সাকিবও নেই, মুশফিক খেলেছেন ইনজুরি নিয়ে, পাঁজড়ের ব্যাথা নিয়েও সম্ভাব্য সেরা সার্ভিসটাই দিয়েছেন দলকে, পঁয়ত্রিশতম জন্মদিনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মাশরাফি প্রতিটা মুহূর্তে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। তবুও শেষ মূহুর্ত, শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়ে গেছে দলটা, হার মানেনি হারার আগে। এমন একটা দলের সমর্থক হতে পেরেও গর্ব হয়। 

বিশ-ত্রিশটা রান কম হয়ে গেল কিনা, সেই হিসেবে যেতে ইচ্ছে করছে না। সেসব নিয়ে পরেও কথা বলা যাবে। আজ বরং স্বপ্ন দেখার কথা বলি। ২০১২ এশিয়া কাপে যখন ২ রানে হেরেছিলাম, গলা দিয়ে খাবার নামছিল না। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা ছিল মনের ভেতরে। জানতাম না, কবে আবার এমন সুযোগ আসবে, কবে আবার আমরা ফাইনালে উঠবো, কবে আবার জিতবো! এখন আমি জানি, এই দলটা খুব শীগ্রই বড় কিছু একটা জিতবে। হয়তো মাশরাফি থাকবেন না সেদিন, তার জন্যেই সবচেয়ে বেশি করে একটা শিরোপা জিততে চেয়েছিলাম আমরা। কিন্ত মাশরাফি তো নিজেই বলেছেন, শিরোপা দিয়ে তাকে জাজ না করতে। মাশরাফিকে জাজ করার ক্ষমতা আমাদের নেই, আমরা করতেও চাই না। আমরা শুধু জানি, টাইগারেরা জিতবে, খুব দ্রুতই জিতবে। প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না। এতগুলো ফাইনাল হারের ব্যথা প্রকৃতি অবশ্যই পূরণ করে দেবে, এটা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি…

ছবি কৃতজ্ঞতা- রিজভী শেখ

আরও পড়ুন- 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button