অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

নারী বনাম ধর্মান্ধ জনগণ: লড়াইটা ভীষণ একপেশে!

ধর্ম অবমাননার দায়ে ব্লাসফেমি আইনে ২০১০ সালে আসিয়া বিবিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল পাকিস্তানের আদালত। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন আসিয়া বিবি। কয়েকদিন আগে উচ্চ আদালত আপিলের রায় দিয়েছে, সেখান্ব তাকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। উচ্চ আদালত রায়ে বলেছেন, আট বছর আগে যে রায়ের মাধ্যমে আসিয়াকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়া হয়েছিল, সেটার পুরোটাই ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সংখ্যাগুরু একটা শ্রেণীকে তুষ্ট করতেই মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়া হয়েছিল আসিয়াকে, আর সেটা পুরোপুরি অমানবিক মনে হয়েছে উচ্চ আদালতের বিচারকদের কাছে। আদালত এটাও বলেছেন, আসিয়ার কাছ থেকে যে ধর্ম অবমাননার স্বীকৃতিটা নেয়া হয়েছিল, সেটাও জোরপূর্বক আদায় করা হয়েছিল। সেকারণেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে খালাস দেয়া হয়েছে। তবে এটা মূল ঘটনা নয়, ঘটনা তো শুরু হয়েছে এই রায় দেয়ার পরে।

আটটা বছর কোন অপরাধ না করেও জেলে কাটিয়েছেন আসিয়া, এখন যখন আদালত তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে মুক্তি দিয়েছেন, তখনও তিনি জেল থেকে বেরুতে পারছেন না! বেরুলেই যে প্রাণ সংশয়ে পড়বে তার! পাকিস্তানের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে এসে বিক্ষোভ করছে আসিয়ার ফাঁসির দাবীতে, তাকে দেয়া বেকসুর খালাসের দাবীটা মেনে নিতে পারছে না তারা। 

করাচী থেকে লাহোর, কিংবা রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে পেশোয়ার, সব জায়গাতেই ধর্মান্ধ এই মানুষেরা বিক্ষোভ করছে। দেশ মোটামুটি অচল হয়ে পড়েছে একরকম, অবশ্য পাকিস্তান আর সচল ছিলই বা কবে! তবে অবস্থা এমনই নাজুক যে, সরকার আর এই ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠী, দুইপক্ষ এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে একরকম! ইসলামাবাদে বাড়তি সতর্কতাই জারী করতে হয়েছে সরকারকে! যে মৌলবাদের জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায়, যে মৌলবাদের ঘাড়ে চড়ে ইমরান খান সেদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, সেই মৌলবাদীরাই এখন সেনাবাহিনীর মুণ্ডুপাত করছে, ইমরানের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়ছে! 

আসিয়া বিবির ফাঁসির দাবীতে পাকিস্তানে বিক্ষোভ

ঘটনার সূত্রপাত আজ থেকে নয় বছর আগে। গ্রামের দুই মুসলমান নারীর সঙ্গে পানি খাওয়া নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী আসিয়া বিবির। বালতিভর্তি পানি থেকে এক কাপ পানি খেয়েছিলেন আসিয়া, তখন ওই দুই নারী তাকে গালমন্দ করেন এই বলে যে, তাদের ধর্মে আছে, মুসলমান ব্যতীত অন্য কারো স্পর্শ করা খাবার বা পানি তারা খেতে পারবেন না, যেটা ছিল পুরোপুরি মনগড়া একটা তথ্য। আসিয়া সেটার প্রতিবাদ করলে ঝগড়া বেঁধে যায়, তার গায়েও হাত তোলা হয়। মাফিয়া বিবি ও আসমা বিবি নামের ওই দুই নারী অভিযোগ করেন, ঝগড়ার সময় আসিয়া বিবি নবী মোহাম্মদ (সা) কে নিয়ে কটুক্তি করেন।

কয়েকদিন পরেই আসিয়ার নামে ব্লাসফেমি আইনে ধর্ম অবমাননার মামলা করা হয়। এই কয়েকদিনে গ্রামের মাওলানারা আসিকে ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম হয়ে যাওয়ার জন্যে চাপ দিয়েছিল। আসিয়া সেটাতে রাজী না হওয়ায় তার নামে মামলা করা হয়। যে মামলার মোট সাক্ষী ছিল সাতজন, দুই প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে আরও পাঁচজন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসিয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিল, তারা বলেছিলে, আসিয়া যে নবীকে গালি দিয়েছে, সেটা তারা আসমা এবং মাফিয়ার কাছে শুনেছে। কোন ভ্যালিড ডকুমেন্ট না থাকার পরেও, শুধুমাত্র ওই দুই নারীর কথার ওপরে ভিত্তি করেই আসিয়াকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছিল আদালত! 

২০০৯ সালে গ্রেফতার হবার পর থেকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটছে আসিয়ার। বরাবরই তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবী করে এসেছিলেন। দরিদ্র‍্য এই মহিলার সামর্থ্য ছিল না উকিল রেখে মামলার খরচ চালানোর। কয়েকটা খৃষ্টান এনজিও সাহায্য করেছে তাকে, নিরাপত্তার খাতিরে এনজিওগুলোও নিজেদের নাম প্রকাশ করেনি, প্রকাশ্যে এসে আসিয়ার প্রতি সমর্থন জানাতে পারেনি। এমন কিছু করলেই তো গুলি খেতে হবে, নইলে বোমায় উড়ে যেতে হবে! দেশটার নাম যে পাকিস্তান! সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার দিন আদালতে আনা হয়নি আসিয়াকে, মুক্তির খবরটা শুনে বিশ্বাসই হচ্ছিল না তার, মনে হচ্ছিল, কোন স্বপ্ন দেখছেন বুঝি! হুট করেই হয়তো সেই স্বপ্নটা ভেঙে যাবে আবার।

মায়ের মুক্তির অপেক্ষায় আসিয়া বিবির মেয়েরা

তবে মুক্তি পেলেও, নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে এখনই বের করতে পারছে না কারা কর্তৃপক্ষ। আসিয়ার মুক্তির আদেশ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে রায়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কট্টরপন্থীরা তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেছে। পাকিস্তানের কট্টরপন্থী ইসলামী গোষ্ঠীগুলো ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগের জন্য কঠোর সাজার পক্ষে। সেই দাবীতেই তারা রাস্তাঘাট অচল করে দিয়েছে। তারা ওখন বিচারকদের খুন করার হুমকি দিচ্ছে, ইমরান খানকে পদত্যাগ করতে বলছে, আবার কখনও বা এই রায়ের পেছনে সেনাবাহিনীর জেনারেলদের হাত আছে উল্লেখ করে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান ঘটানোর আহবান জানাচ্ছে! অথচ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীই নিজেদের স্বার্থে মৌলবাদের প্রতিষ্ঠা করেছিল, এই মৌলবাদীদের সঙ্গে আঁতাত করেই ইমরান খান রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন। 

পাকিস্তানে এখন যে অবস্থা, আসিয়া বিবি সেই দেশে কোনভাবেই থাকতে পারবেন না, একটা দিনও না। জেলখানা থেকে বের হলেই তাকে মেরে ফেলা হবে, কোন সন্দেহই নেই তাতে। তার আইনজীবির পক্ষ থেকে তাই সরকারের কাছে দাবী জানানো হয়েছে, কারাগার থেকে নিরাপদে বিমানবন্দর পর্যন্ত আসিয়াকে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা যেন নেয়া হয়। পশ্চিমা কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যেই আসিয়া বিবিকে আশ্রয় দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলোর কোন একটিতেই হয়তো চলে যাবেন আসিয়া। পাকিস্তানের মতো নিকৃষ্ট রাষ্ট্রে বসবাসের মতো পরিস্থিতি তো এখন তার আর নেই। 

ধর্মান্ধদের বিক্ষোভ চলছে

লড়াইটা একেবারই একপেশে। একদিকে হাজার হাজার, কিংবা লক্ষ লক্ষ ধর্মান্ধ মানুষ, যারা ভালোমন্দ বোঝে না, যাদের ব্রেইনওয়াশ করা হয়েছে ভালোভাবে। এরা নামেই মুসলমান, অথচ ধর্মের নিয়ম-নীতি তারা জানে না, নবীর আদর্শ সম্পর্কে এদের কোন ধারণাই নেই। এরা চায় শুধু প্রতিশোধ নিতে। তায়েফের অধিবাসীরা যখন পাথর মেরে নবীজিকে আহত করেছিল, তখন নবীজি তাদের অভিশাপ দেননি, বরং তাদের জন্যে প্রার্থনা করেছেন আল্লাহ’র কাছে।

মক্কার লোকেরা মহানবীকে কত কষ্ট দিয়েছে, কত গালমন্দ করেছে। কই, কোনদিন তো তিনি এসবের পাল্টা জবাব দিতে যাননি, বরং সবাইকে ক্ষমার মহত্ব সম্পর্কে বলেছেন। আর এই মাথামোটা মানুষগুলো নবীর নাম নিয়ে অসহায় এক নারীর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে! বাংলাদেশেও তো এমন মাথামোটা মানুষের সংখ্যা কম নয়, যারা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ব্লগারদের কুপিয়ে হত্যা করে, কিংবা সেই হত্যাকে জায়েজ করার মিশনে নামে। এমন উম্মত তো নবীজি চাননি নিশ্চয়ই! 

আরও পড়ুন-

 

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button