সিনেমা হলের গলি

না, অর্ণব হারিয়ে যাননি!

শায়ান চৌধুরী অর্ণব- এই মানুষটার সাথে আমাদের হাজারটা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কৈশোরের কোন এক রোদজ্বলা দুপুরে অর্ণবের সঙ্গে পরিচয়, প্রথম গান শোনা ‘সে যে বসে আছে একা একা’… প্রথম পরিচয়ের পরে কেটে গেছে প্রায় এক যুগ, অর্ণবের প্রতি মোহাবিষ্টতা কাটেনি একটুও৷ বরং সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সেটা বেড়েছে বহু গুণে। মোবাইল আর ল্যাপটপের প্লে-লিস্ট জুড়ে এখনও অর্ণবের নাম, ইউটিউবের হিস্টোরিতে তার সরব উপস্থিতি। অর্ণবের ছবি ওয়ালপেপার দেয়ার মতো শিশুতোষ পাগলামি হয়তো এখন আর করা হয় না, তবে রোজ এই কণ্ঠের মায়াবী পরশ কানে না তুললে দিনটাও শেষ হয় না ঠিকমতোন।

অর্ণব আমাদের শুনিয়েছিলেন, ‘হারিয়ে গিয়েছি, এইতো জরুরী খবর…’ কিছুদিনের জন্যে অর্ণবও সেভাবে হারিয়ে গিয়েছিলেন, হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজেকে। নিজের অ্যালবামের নামের মতো অর্ণবেরও ডুব দেয়ার ইচ্ছে হয়েছিল। দুই দশক ধরে গান করছেন তিনি, এমন ডুব বেশ কয়েকবারই দিয়েছেন, তবে এবারের ডুবটা যেন একটু দীর্ঘই ছিল।

কয়েক বছর আগে অর্ণব বলেছিলেন, জনপ্রিয়তার শেকলে বাঁধা পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। তার কাছে মনে হচ্ছিল, অন্যকে খুশি করার জন্যে গান গাইছেন তিনি, একটা মেকি মুখোশ চাপিয়ে রেখেছেন মুখের ওপরে। অর্ণব পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এই প্রত্যাশার চাপের সামনে থেকে, চেয়েছিলেন নিজের মতো করে সঙ্গীতে ডুব দিতে৷ কাউকে কৈফিয়ত দেয়ার, কাউকে সন্তুষ্ট করার ঝামেলায় যেতে চাননি৷

ফোক ফেস্টের ইউটিউব চ্যানেলে অর্ণবের গান শুনছিলাম কিছুদিন আগে। প্রতিটা গানেরই মিনিটখানেক শোনার পরে মনে হলো, শুনতে না বসলেই ভালো হতো বোধহয়। যে অর্ণবের গান শুনে আমরা মোহাবিষ্ট হয়েছি একটা সময়ে, যে কণ্ঠে আমরা বুঁদ হয়ে থেকেছি দিনের পর দিন, যার গানে জীবন খুঁজে পেয়েছি, সেই মানুষটা যেন গাইতে ভুলে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে! গান গাওয়াটা যেন তার কাছে কঠিন একটা কাজ হয়ে যাচ্ছে!

তারও অল্প কিছুদিন আগে একটা টেলিভিশন আড্ডাতেও দেখেছিলাম, গিটার হাতে নিয়ে কণ্ঠ জড়িয়ে যাচ্ছে অর্ণবের, সুরটা যেন লাগছে না ঠিকমতো, গানের লাইনগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কোথাও। গান গাওয়ার পুরো ব্যাপারটাকেই অর্ণব যেন উপভোগ করছেন না আর, মনে হচ্ছিল যেন জোর করে গাওয়ানো হচ্ছে তাকে দিয়ে! ডুব দিয়ে থাকার এই সময়টায় অর্ণব অনেক কিছুই করেছেন, তবে সবচেয়ে কম যেটা করেছেন, সেটা বোধহয় গান।

সেই অর্ণব তার ‘আধেক ঘুম’ ভেঙে ফিরছেন আবারও গানের রাজ্যে, নিজের মুখেই তিনি বলেছেন এই কথা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমার হারানোর স্বভাব আছে, মাঝে মাঝে একটু ডুব মারি। হারানোর সময় শেষ, এখন কাজের সময়। ইতোমধ্যে কাজ তো শুরু করে দিয়েছি। কলকাতায় গিয়ে কাজ করব। কলকাতার মিউজিশিয়ানদের নিয়ে কাজের পরিকল্পনা আছে।’ খবরটা শুনে মনের ভেতরে অন্যরকম একটা খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। ভালোবাসার মানুষগুলোকে ভালো থাকতে দেখলে যে ভীষণ ভালোলাগার অনুভূতি হয়, ঠিক সেরকম!

অর্ণব বলছিলেন, নিকেতনের গানের স্টুডিওতে দমবদ্ধ লাগছিল তার কাছেই, বোতাম টিপে গান করতে আর ভালো লাগছিল না তার। টাইপ করার মতো মিউজিক্যাল প্রসেসটাই বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে তার কাছে, অনেক তো করলেন এসব। এবার ভিন্নকিছুর সন্ধানে নামবেন অর্ণব, অন্যরকম কিছু, যেটা আগে কখনও করেননি। আর তাই শেকড়ের কাছে ছুটছেন তিনি, যাচ্ছেন শান্তিনিকতেনে, যেখানে অর্ণবের শিল্পীসত্ত্বার জন্ম হয়েছিল!

সঙ্গীতের প্রতি মনের ভেতরে অদ্ভুত একটা অভিমান জন্ম নিয়েছিল অর্ণবের, নিজেই স্বীকার করলেন তিনি সেই কথা। অভিমানটা আর নেই, সেটাও জানা গেল তার মুখ থেকে। অর্ণব বলছিলেন পেছনে ফেলে আসা সময়টার কথা, ‘একদম একঘেঁয়ে হয়ে গিয়েছিল সবকিছু। আগেও বললাম, নিকেতনেও স্টুডিওটাকে খাঁচা মনে হচ্ছিল ক্রমাগত। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গান চালিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে। জোর করে একটা জিনিস করছিলাম কিন্তু একদমই ভালো লাগছিল না। টাকার জন্য করছিলাম, না কিসের জন্য করছিলাম- কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এই চাপগুলো এখন কমে গেছে; সেজন্যেই ঢাকা থেকে বের হতে পেরেছি। কলকাতায় গিয়ে অন্য মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে পারছি। স্টুডিওর মধ্যে একা একা বসে কাজ করাটা সত্যিই বোরিং।’

নিজের গান নিয়ে অর্ণবের মতো এত বেশি পরীক্ষা-নীরিক্ষা বাংলাদেশে বোধহয় আর কেউই করেননি। অর্ণবের গানের নিজস্ব একটা ধারা আছে, তার গানগুলো ছোটগল্পের রেশটা ধরে রাখে, শেষ হইয়াও হইলো না শেষ টাইপের একটা অনুভূতির জন্ম দেয়। সুরের দিক থেকে অর্ণব বরাবরই ব্যতিক্রম ছিলেন৷ গানের কথাগুলোও যেন আমাদের মনের গোপনে লুকিয়ে থাকা ভাবের বহিঃপ্রকাশ। অর্ণবের গান মানে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অন্যরকম একটা স্বত্বার সঙ্গে কথোপকথন। যেখানে, যে ফরম্যাটেই গান গেয়েছেন, নিজস্বতাকে বিসর্জন দেননি কোথাও, চেষ্টা করেছেন স্বকীয়তা ধরে রেখে ভিন্নরকম কোন এক্সপেরিমেন্ট করতে। বলা বাহুল্য, গান নিয়ে অর্ণবের সেসব গবেষণার প্রায় সবগুলোই সফল।

গানের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যাপারটাকে অর্ণব কখনোই মেলাতে পারেননি। তার কাছে বরাবরই ভিন্নরকম কিছু করতে চাওয়া, নতুন কিছু আবিস্কার করাটা প্রাধান্য পেয়েছে। বলিউডে কাজের অফার পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক প্রীতম তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্ত বলিউডে সবকিছুই কমার্শিয়ালি ডিল করা হয়, আবেগ বা শুদ্ধ সঙ্গীতচর্চার চেয়ে অনেকসময়ই সেখানে বাণিজ্যটাকে মূল ফোকাসে রাখা হয়। আর তাই ব্যাটে-বলে মেলেনি।

অর্ণব মানেই আমাদের কাছে অন্যরকম এক নস্টালজিয়া, অর্ণবের নামটাই ভীষণ স্পেশাল। একটা গান ক’বার শোনা যায়? দশবার, একশোবার, এক হাজার বার? অর্ণবের একেকটা গান হাজার হাজারবার করে শোনা হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। মন খারাপ থাকলে আমরা অর্ণবের গান শুনেছি, মন ভালো থাকলেও ইয়ারফোনে বেজেছে ‘ভালোবাসা তারপর’, ‘তোমার জন্য’ কিংবা ‘হোক কলরব’। জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এসেছে যখন, অর্ণবের গান তখন আমাদের সঙ্গী ছিল। জীবনকে যখন উপভোগ করেছি, তখনও কানের পাশে অর্ণব ছিলেন তার গান নিয়ে।

অর্ণবের সঙ্গেই আমরা বাতি জ্বেলে সতর্ক হয়ে থাকা গোটা শহর চষে বেড়িয়েছি, কাঠগোলাপের সাদার মায়ায় ভালোবাসা মিশিয়েছি, বর্ষার সুবাসে ভালোবাসা খুঁজেছি, সন্ধ্যার আঁধারে বিষণ্ণ সুর বাজিয়ে বুকে কষ্টের পাহাড় জমিয়েছি। তক্ষক ডাকা নিশুতিতে ডুব দিতে চেয়েছি বারবার, চেয়েছি অনেক দূরের আকাশপথে অচেনা এক ‘তুমি’ কে নিয়ে হারাতে, যাপিত জীবনের সব যন্ত্রণাকে পাশ কাটিয়ে সদর্পে ঘোষণা করেছি- “রাতশেষে দিনে ফিরে এই বেশ বেঁচে আছি…”

আমাদের ভালোবাসার মানুষটা আবার গান নিয়ে ফিরছেন, ফিরছেন তার ভক্তদের জন্যে, আমাদের জন্যে। অনেক ঝড় পেরিয়ে অর্ণব এখন হাসিমুখে বলতে পারেন, ‘নিজেকে নিয়ে আমি এখন পুরোপুরি সুখী।’ এখন কেবল অর্ণবের ফিরে আসার ক্ষণ গোণা বাকী। অপেক্ষার এই প্রহরগুলো যেন খুব বেশি দীর্ঘ না হয়, সেটাই চাওয়া।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button