খেলা ও ধুলা

আমার বয়স ৩০, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জেতার বয়স ৩২!

ঈশ্বরদী রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বশির ভাইয়ের বইয়ের দোকান। সেখানে আমি বন্ধুদের সাথে মাঝে মাঝে যাই। মাঝে মাঝে যাই কারণ আমাকে টাকা জমাতে হয় ‘তিন গোয়েন্দা’ নামক কিশোর উপন্যাসের একটা ভলিউম কেনার জন্য। ২+২ = ৪ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা আমি মার কাছে ২০ টাকা একবারে চাইতে পারি না। প্রতিদিনের রিকশা ভাড়ার টাকা থেকে ১টাকা করে করে বাঁচায়ে বই কিনি।

জীবন তখন অনেক সহজ, আমার বয়স ১০।

বশির ভাইয়ের দোকানে একটা লোকের ছবিসহ বই(আসলে ম্যাগাজিন) দেখি, নীল-সাদা জার্সি পরা মোটাসোটা একজন একটা সোনার জিনিসে চুমু খাচ্ছেন। বশির ভাই আমাকে পরিচয় করায়ে দেন সেই মানুষটার সাথে, তাঁর নাম ডিয়াগো ম্যারাডোনা। বশির ভাই অনেককিছু জানেন ম্যারাডোনার ব্যাপারে। তাঁর সাথে খেলায় পেরে না উঠে তাঁকে অন্যদলগুলা মিলে ড্রাগ কেসে ‘ফাঁসায়ে’ দিছে এই তথ্য শুনি। এমন একটা লোককে ফাঁসানোর ব্যাপারটা ১০বছরের আমি মানতে পারি না তবে লোকটাকে ভালো লেগে যায়। তখন আমি ফকনার যুদ্ধ চিনি না, হ্যান্ড অব গড জানি না তারপরও কোনো কারণ ছাড়াই হাজার মাইল দূরের দেশের মানুষটা আমার প্রিয় হয়ে ওঠে, খেলাধুলা নিয়ে আমার জীবনের প্রথম প্রেমে পড়ি। প্রেমের নাম আর্জেন্টিনা, প্রেমিকার নাম ‘সিস্টেম করে’ ফাঁসায়ে দেয়া ম্যারাডোনা।

তখন খবরের কাগজ পড়তে পারি, আরেকটা নাম জানা হয়। বাতিস্তুতা। বশির ভাইয়ের তথ্যমতে এই লোক একটা ‘জিনিস’, চাইলেই গোল করতে পারেন। আমার দেখা প্রথম বিশ্বকাপ, ৯৮ বিশ্বকাপে বাতিস্ততা ছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালের শেষদিকে বার্গক্যাম্প গোল দিলে আমার মনে হয় বাতিস্তুতা গোল করবে কারণ বশির ভাই বলছেন সে চাইলেই গোল করতে পারে। কিন্তু হয় না। আর্জেন্টিনা বিদায় নেয় কোয়ার্টারে। বশির ভাই যা বলেন সবই ঠিক না এই ব্যাপারটা বুঝতে পারি। সেই দলের আরো অনেককেই পরে চিনেছি; সিমিওনে, ভেরন, ক্রেসপো, জানেত্তিদের।

আমার মা-বাবা(এমনকি আমার ছোটভাইও) ব্রাজিল ফ্যান। ৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনাল তাঁরা লাইভ দেখছেন, আমারেও ডেকে তুলে দেখাইছেন। আর্জেন্টিনা না থাকায় বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়াতে এতো রাতে কেন খেলা হচ্ছে সেটাই তখন আমার মূল চিন্তার বিষয়। সেই ফাইনালে টাক মাথার এক লোক হেডে দুইটা গোল করেন। ব্রাজিল অনেকগুলা বিশ্বকাপ জিতছে তাই ঐটাও ব্রাজিল জিতবে ভাবা আমি সেই গোলদাতাকে চিনি না তবে যার জেতার কথা সেই সবসময় জিতবে এই ভুল ভাঙ্গে। তখনও জানি না যে ঐ বিশ্বকাপেই গ্রুপ পর্বে লাল কার্ড খাওয়া টাক মাথার এই লোকটা হিরো হয়ে যাবেন ফাইনালে আর তার অল্পদিনের মধ্যেই হবেন সর্বকালের সেরা মিডফিল্ডারদের একজন যার নাম হবে জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। সেই ফ্রান্স দলের আরো অনেককেই পরে চিনেছি; দেশম, ডেসাই, ভিয়েরা, পেতিত, পিরেস, থুরাম, বার্থেজ, পিরেজদের।

২০০২ বিশ্বকাপে দেখি মাথার সামনে অল্প একটু চুলওয়ালা রোনালদোকে। ডিবক্সের ভেতর সর্বকালের সবচেয়ে ভয়ংকর এই স্ট্রাইকার ইনজুরি নিয়ে মিডিয়ার প্রবল আলোচনা-সমালোচনা অন্যদিকে মোড় নেয়ানোর জন্য এই অদ্ভুত হেয়ারস্টাইল দেন, এই তথ্য তখনো জানতাম না। তেমনি জানতাম না অলিভার কান নামের কিংবদন্তির গোলকিপারের কথা যাকে ফাইনালে রীতিমতো নাকানিচুবানি খাইয়েছিলেন রোনালদো। ব্রাজিলের ৫ম বিশ্বকাপ জয়ের ফাইনালও দেখছি লাইভ। চিনেছিলাম বেকহাম, মাঠে অসম্ভব সব কাজ করা জাদুকর রোনালদিনহোদের।

আমার বয়স তখন ১৪, ম্যারাডোনার ৪২।

২০০৬ এ চিনলাম শান্ত, সৌম্য, নায়কের মতো চেহারার এক মিডফিল্ডারকে, নাম আদ্রেয়া পিরলো। তাঁর ডাকনাম যে ‘দ্যা আর্কিটেক্ট’ বা ‘দ্যা প্রফেসর’ সেটা জানি আরো অনেক পরে। বিকালে প্লেস্টেশন খেলে সন্ধ্যায় বিশ্বকাপ জেতা এই মিডফিল্ডারের আত্মজীবনী ‘I think, therefore I play’ পড়ছি এই সেইদিন। কি অদ্ভুত, অসাধারণ এক ফুটবলার। আরো চিনি নায়কের মতো দেখতে গিয়ানোলুইজি বুফনকে; আমি শৈশবে-কৈশর পার করে ছেলে থেকে পুরুষ হয়ে গেলাম অথচ তিনি আগের মতোই আছেন, এখনো খেলে যাচ্ছেন ক্লাবে। চিনি মিরোস্লাভ ক্লোসা, মাইকেল বালাক, বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগার, দেল পিয়েরোদের। ফাইনালে জিদানকে দেখলাম ঢুশ দিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফির খুব কাছ দিয়ে হেঁটে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে।

২০১০ বিশ্বকাপের সময় ক্লাব ফুটবল দেখি, তখন অনেক প্লেয়ারকে চিনি। স্পেন দলের মিডফিল্ড আর এ্যাটাকতো প্রায় পুরাটাই আমার প্রিয় ক্লাবের, ডিফেন্সেও পিকে আর ‘এল কাপিতান’ কার্লোস পুয়েল। ভিসেন্তে দেল বক্সের অধীনে সর্বজয়ী এই দলটাকে ০৮’র ইউরোতেও দেখছি। নতুন করে তেমন কাউকে চেনা লাগে না। ১৪’র বিশ্বকাপেও তাই। তখন মেসি পুরোদস্তর মেসি, প্রায় ভাঙ্গাচোরা একটা দলকে নিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছেন তিনি, অপরদিকে সেমিতে ব্রাজিলকে ৭ গোল দিয়ে আসা জার্মানি। ৮৬’র পর জার্মান জুজু আমাদের কাটেনি কোনোদিনই, সেবারও কাটলো না। বিশ্বকাপের খুব কাছে গিয়েও হারা, ০৬’র জিদানের মতো ১৪’র মেসিকে বিশ্বকাপের খুব কাছ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখলাম। কি অদ্ভুত মিল, কি অদ্ভুত হাহাকার দুইটা ছবিতেই।

আমার বয়স তখন ২৬, মেসির ২৭।

১৮’র বিশ্বকাপ খুব অদ্ভুত আমার জন্য। ১৪’তে যাদের কাছে আর্জেন্টিনা হেরেছিল ফাইনালে, সেই দেশেই আমি থাকি এবং ফুটবল রিলেটেড একটা এ্যাপ কোম্পানিতেই চাকরি করি। ফুটবল রিলেটেড অফিসে কাজ করার কারণে উত্তাপটা টের পাই বিশ্বকাপের। আবারো মেসি যাচ্ছেন বিশ্বকাপে, দল আগের চেয়ে একটু ভালো হলেও গতকালের ইনজুরির খবরগুলা বিধ্বস্ত করে দিয়েছে আর্জেন্টিনার সাথে তাঁর ভক্তদেরও।

ইদানিং দেশি ফ্যানদের মতো কথায় কথায় তর্ক করতে ভাল্লাগে না। ফুটবলটা আমার কাছে তর্কের জায়গা না, গায়ের জোরে কিছু প্রতিষ্ঠার জায়গা না; এইটা আমার ভালোবাসার জায়গা। একটা কালো, মোটা, লেখাপড়ায় খারাপ ছেলে/মেয়েকে ভালো লাগলে ‘কেন ভাল্লাগে?’র যেমন কোনো উত্তর নাই তেমনি দীর্ঘদিন শিরোপা না জেতা দলকেও ভালো লাগতে পারে। সমাজের চোখে সুন্দর ছেলেমেয়েকে বা ট্রফির হিসাবে ফেবারিটকেই সবাই ভালোবাসবে এমন না। ইউরোপে থাকায় ফুটবল বিষয়ে সবচেয়ে বড় বোধটা সম্ভবত আমার কাছে এটাই, ট্রফি/সাফল্য দিয়ে প্রিয় দল সাপোর্ট করা যায় না, সাপোর্টটা মনের ব্যাপার। ভালো করলেও সাপোর্ট করবো, খারাপ করলেও।

গোলই যে সবকিছু না এটা বুঝতে কেটে গেছে অনেকগুলা বছর। আমি এখন এই খেলাটা বুঝতে চাই, গোল হওয়ার চেয়ে কেনো গোল হচ্ছে বা হচ্ছে না সেটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কাউকে ছোট করতে না, সবাইকেই ভালবাসতে চাই, সম্মান করতে চাই; ফুটবল ব্যাপারটাই তো ‘ইটস অল এ্যাবাউট রেসপেক্ট’। শুধু মেসির জন্য না, আর্জেন্টিনার জন্যই আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিততে দেখতে চাই।

এখন আমার বয়স ৩০, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতার ৩২।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button