সিনেমা হলের গলি

একোয়াম্যান- হতাশ ডিসি লাভারদের জন্য ‘আশার আলো’ স্বরূপ যে সিনেমা!

“Aquaman” শব্দটির অর্থ হচ্ছে জলমানব। সুপারহিরো মুভির যারা ভক্ত, তারা সাধারণত আকাশ এবং স্থলে বিচরণকারী সুপারহিরো দেখেই অভ্যস্ত। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এক সুপারহিরোর অভাব অনুভূত হচ্ছিল, যার ক্ষমতা হবে জলকেন্দ্রিক কিংবা সমুদ্রকেন্দ্রিক। ডিসি তার ফ্যানদের কথা ভেবে ঠিক সেরকম এক সুপারহিরোর সাথেই আমাদের পরিচয় করে দিয়েছে এবার, যার নাম অ্যাকোয়ামেন।

সর্বপ্রথম “ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যানঃ ডন অফ জাস্টিস” এ ছোট্ট একটা ক্যামিও রোলে দেখতে পাই আমরা অ্যাকোয়ামেনকে। অন্যান্য সুপারহিরোদের মধ্যে অ্যাকোয়াম্যানের স্ক্রিন প্রেজেন্স অনেক ডিফারেন্ট ছিল বিধায় দর্শকেরা ডিসির কাছে অ্যাকোয়ামেনের সলো মুভির দাবি করতে থাকে। কারণ ডিসির এনিমেটেড মুভিগুলোতে অ্যাকোয়ামেন ছিল অনেক বলিষ্ঠ এবং শক্তিশালী একটা ক্যারেক্টার। দর্শকদের দাবি মেনে ডিসি পরবর্তীতে “জাস্টিস লীগ”-এ অ্যাকোয়ামেনের ক্যারেক্টারটিকে আরেকটু বৃহৎ পরিসরে দেখায়। মুভিটি অবশ্য দর্শকদের মনে তেমন দাগ কাটতে না পারলেও স্ক্রিনে অ্যাকোয়ামেনের মনোমুগ্ধকর পারফরম্যান্স সবার মনে দোলা দিয়েছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ডিসি এক্সটেন্ডেড মুভি ইউনিভার্স অবশেষে অ্যাকোয়ামেনকে নিয়ে সলো একটি মুভি রিলিজ দেয়, যা বহুদিন পরে ডিসি ভক্তদের মনে রাখার মতো কিছু মোমেন্টস উপহার দিয়েছে।

জাস্টিস লীগের ভরাডুবির কারণে দর্শকদের মনে ডিসির প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা যা ছিল, সব উঠেই গিয়েছিল প্রায়। অ্যাকোয়ামেন ছিল ডিসির জন্য একটা লিটমাস টেস্ট, আশাপ্রদ সংবাদ হচ্ছে সিনেমাটি দর্শকমহলে এখন পর্যন্ত বেশ ভালো সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। রিলিজের আগে অবশ্য সবাই ধরেই নিয়েছিল, অন্যান্য মুভির মতো এটাও বক্স অফিসে ধরা খাবে, কিন্তু ডিসি এবার সবদিক ভাবনা চিন্তা করেই অ্যাকোয়ামেনের ভার তুলে দেয় পরিচালক জেমস ওয়ানের হাতে, যিনি এর আগে বিখ্যাত ছিলেন হরর সিনেয়ার দক্ষ একজন পরিচালক এবং প্রযোজক হিসেবে। “Saw”,”Annabelle (2014)”,” Insidious: Chapter 3 (2015),”The Conjuring 2 (2016)”,”Lights Out (2016)”,”The Nun (2018)” ইত্যাদি ব্যবসাসফল হরর মুভির নির্মাতা জেমস ওয়ান তার সৃজনশীলতার সর্বোচ্চটা ঢেলে দিয়েছেন অ্যাকোয়ামেন মুভিতে। বলা যায়, রীতিমত অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন তিনি। সমুদ্রের নিচের জগতটা এত সুন্দরভাবে দেখানোটা বেশ বড় একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার ছিল এবং জেমস ওয়ান সেই চ্যালেঞ্জে বেশ ভালোভাবেই সফল হয়েছেন। সিনেমাটি বড় পর্দায় দেখার সুযোগ যারা পেয়েছে তারা সেজন্য সৌভাগ্যবানই বলবো। সিনেমার দৃশ্যায়নে পরতে পরতে যত্নের ছাপ দেখে মনে হচ্ছিল, ১৫০ মিলিয়ন ডলার বাজেটেই জেমস ওয়ান যা দেখালেন, জাস্টিস লীগের মতো ৩০০ মিলিয়ন বাজেট পেলে তো ধামাকা করতেন তিনি!

থমাস সমুদ্রতীরের একজন সাধারণ লাইটহাউজ কিপার। কোনো এক রাতে, ভয়ংকর ঝড়ে তোলপার চলছিল চারদিকে। এমন সময় থমাস সমুদ্রতীরে আটলান্টিসের অবিসংবাদিত রাণী আটলানাকে পেয়ে যান অচেতন অবস্থায়। থমাস তাকে উদ্ধার করে সেবা-শ্রুশুষা করে সুস্থ করে তোলেন। আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে পরস্পরের জন্য জন্ম নেয় মিষ্টি এক ভালোবাসা, যে ভালোবাসার ফসল হিসেবে দুনিয়াতে আসে আর্থার। আর্থার ছিল আটলানার পরম ভালোবাসার ধন। কিন্তু সবার আগে যে তিনি সমুদ্রের রাজধানী আটলান্টার একজন রানী, নিজ রাজ্যের প্রতি তারও যে একটা দায়িত্ব আছে। উপরন্তু, স্থলে আটলানার অবস্থানের কারণে আশংকা ছিল যে কোনো সময় তার শ্ত্রুরা তাকে এবং তার পরিবারকে আক্রমণ করবে। তাই স্বামী থমাস এবং ছেলে আর্থারের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং চলেও যান।

আর্থার কোন সাধারণ মনুষ্য সন্তান ছিল না, জন্মসূত্রে মায়ের কাছ থেকেও কিছু ক্ষমতা পেয়ে যায় সে। অর্ধ মানুষ আর অর্ধ আটলান্টিস হওয়ার কারণে একটু বড় হওয়ার সাথে সাথেই তার বিভিন্ন ক্ষমতা প্রকাশ পেতে থাকে। যেমন- টেলিপ্যাথিক ক্ষমতার মাধ্যমে সে সমুদ্রের প্রাণীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো। এছাড়াও তার গায়ে ছিল অসুরের মতো শক্তি। মা তাকে অকালে ছেড়ে চলে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মায়ের ওপর ছিল চাপা একটা অভিমান। যোদ্ধা হিসেবে সবরকম প্রশিক্ষণ নেয় সে। এর মধ্যেই সমুদ্রের ভবিষ্যৎ রানী কুইন মিরা (আম্বার হার্ড) আর্থারকে জানায়, তার সৎ ভাই ওরম (প্যাট্রিক উইলসন) রাজ্যের শাসনক্ষমতা দখল করে নিয়ে স্থলের মানুষের বিপক্ষে যুদ্ধ শুরু করার তোড়জোড় করছে। আর্থার স্থলে তার শক্তির যথাযথ ব্যবহার করলেও আটলান্টিসে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তার অনীহা ছিল, কারণ যোদ্ধা হিসেবে যথাযত প্রশিক্ষন নেয়ার পরও শুধুমাত্র হাফব্রিফ হবার কারণে সে আটলান্টিসে প্রবেশের অনুমতি পায়নি। কিন্তু হঠাৎ কোন এক রাতে আর্থার এবং তার বাবার ওপর অ্যাটাক হওয়ার কারণে আর্থার বুঝতে পারে, ধীরে ধীরে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। অরম ঘনঘন জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডোর মতো দুর্যোগ সৃষ্টি করে বিপর্যস্ত করে তুলছিল জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা। অরমকে ঠেকাবার একমাত্র উপায় হচ্ছে ‘ট্রাইডেন্ট অফ আটলান’ নামে একটা ত্রিশূল খুঁজে বের করা, যার মধ্যে রয়েছে সকল আটলান্টিসবাসীর মিলিত শক্তির চেয়েও বেশি ক্ষমতা। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের সার্থে আর্থার, ওরমের বিরুদ্ধে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয়।

সিনেমার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ২০১৪ সালে ডিসি এক্সটেন্ডেড ইউনিভার্সের অংশ হিসেবে অ্যাকোয়ামেনের সলো মুভি তৈরী করার সিদ্ধান্ত নেয়। এক ইন্টারভিউতে অ্যাকোয়ামেনের ক্যারেক্টারে অভিনয় করা জ্যাসন মেমোয়া ঘোষণা দেন, জাস্টিস লীগের পর ডিসির চারটি মুভিতে অভিনয় করবেন তিনি এবং সে অনুযায়ী ডিসির সাথে তার চুক্তি সাক্ষরিত হয়। 

মুভির প্লটটা অত আহামরি মনে না হলেও ভিজ্যুয়াল এফেক্টস এবং বিজিএমের জন্য সাফল্যের সাথে লেটার মার্ক্স দেওয়াই যায় একে। জেমস ওয়ান তার স্ক্রিনপ্লে সরল ভাবে পরিচালনা করার সুবিধার্থে জটিল কোনো প্লটকে বেছে নেননি। বরং সহজ সরল একটা গল্পকেই বেছে নিয়ে এটাকে বিভিন্ন লেয়ারে ভাগ করে বিভিন্ন ভাগে তিনি অনেক চমক ঠেসেঠুসে দিয়েছেন যা সিনেমা চলাকালীন সময়ে দর্শকেরা প্রত্যক্ষ করবেন এবং জাস্টিস লীগের মতো যে মুভির মাঝেই বোরিংনেসের জন্য হাই আসবে না, এটা নিশ্চিত করে বলাই যায়। মার্ভেলের সুপারহিরো মুভিগুলোতে যেমন কমেডিক এলেমেন্ট থাকে, এই মুভিতেও সেটা ছিল তবে পরিমিত হারে তার ব্যবহার করা হয়েছে। সিনেমার কিছু দুর্দান্ত ভিজ্যুয়াল সিন এখনও চোখে লেগে আছে বলবো। জলে, স্থলে দু জায়গাতেই প্রচুর অ্যাকশন সিকোয়েন্স ছিল, সাথে বোনাস হিসেবে ছিল অপূর্ব ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। বিজিএমের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল গ্রেগসন-উইলিয়ামসকে, যারা এর আগে “ওয়ান্ডার ওম্যান” সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরেও কাজ করেছিলেন।

সিনেমায় জ্যাসন মেমোয়ার পাশাপাশি কুইন মিরার চরিত্রে হার্ডের অভিনয় ছিল আইস অফ ট্রিট। অ্যাকশন সিন গুলোতে তার পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কিউটনেসের এক্সট্রা ডোজ দর্শকদের স্ক্রিনের দিকে আটকে রাখবে সেটা বলাই বাহুল্য। এছাড়াও, রানী আটলানার চরিত্রে অভিনয় নিকোল কিডম্যানের স্বল্প সময়ের স্ক্রিন প্রেজেন্স ছিল ভালোই। অ্যাম্বার আর নিকোড কিডম্যানের সৌন্দর্যের ছিটা ছিল পুরো মুভি জুড়েই। মুভির বাকি চরিত্রগুলোও নজর কেড়েছে | বিশেষ করে অল্প সময় পেয়েও ২ ভিলেন ওশেন মাস্টার আর ব্ল্যাক ম্যান্টা সবার মন জয় করে নিয়েছে। আমার মতে, ডিসির উচিত এখন বার্ডস অফ প্রে, সুইসাইড স্কোয়াড ২ এর মত অপ্রয়োজনীয় মুভি বাদ দিয়ে এরকম মূল হিরোদের সলো মুভি নিয়ে আসা। জ্যাক স্নাইডার, ডেভিড আইয়ার, জশ উইডনদের ভুলের জন্য যে DCEU ক্রমশ তলানি আর নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছিল এবং ক্রমাগত ট্রল ও হাসাহাসির স্বীকার হচ্ছিল, সেখান থেকে একেবারে জলে পড়া থেকে আটকানো, মানে যাকে বলা হয় ক্রমশ কোণঠাসা হতে থাকা DCEU কে প্রায় উদ্ধারই করল অ্যাকোয়াম্যান। আশা করি দর্শকদের কথা ভেবে ভবিষ্যতে এরকম ভালো ভালো কিছু মুভি উপহার দেবে ডিসি।

এখন পর্যন্ত ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করা ১৪৩ মিনিটের এই মুভিটি আইএমডিবি রেটিং এ ৭.৭ এবং মেটাক্রিটিকে ৫৫% ফ্রেশ রেটিং পেয়েছে। রেটিং কম থাকার কারণ হিসেবে সমালোচকেরা বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন, যেমন- ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে একটু বেশি তাড়াহুড়ো করা হয়েছে। আর প্লটেও বলার মতো সেভাবে কোনো টুইস্ট ছিলো না। সিনেমার কিছু কিছু স্থানে ক্যারেক্টার গুলোকে বেশ সিরিয়াস মনে হয়েছে, আবার দুই মিনিট পরেই দেখা যায় তারা হিউমারের আশ্রয় নিয়ে সিরিয়াস মোমেন্টস গুলো ফানি করে দিয়েছে। এই একটা জায়গাতেই জেমস ওয়ানের খুঁত চোখে পড়েছে যেখানে তিনি কমিক টাইমিংগুলোর যথাযথ প্লেসমেন্ট করতে পারেননি। তবে সিনেমাটি দর্শকদের সময় উসুল করে দেবে এটা নিঃসন্দেহে বলাই যায়। প্রার্থনা কেবল এতটুকুই, ডিসি যেন পরবর্তীতে ভিএফএক্সের পাশাপাশি স্টোরিতেও একটু মনোযোগ দেয়।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button