সিনেমা হলের গলি

অপু বিশ্বাস থেকে ‘অপু ইসলাম খান’ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা!

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে ঠিক যে ধরনের সাফল্য থাকলে তাকে ‘হিট’ নায়িকা বলা যায়, অপু বিশ্বাসের তা সবই ছিল বলা যায়। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, বাড়তি ওজন(!) বা অভিনয় নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক থাকলেও তার জনপ্রিয়তা নিয়ে তর্ক ছিল না কখনোই। শাকিবের সাথে অপু যতটা জনপ্রিয় ছিলেন, অপুর সাথেও শাকিব ঠিক ততটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তাই অপুর ক্যারিয়ার দাঁড় করিয়েছে শাকিব খান, এটা খুবই অযৌক্তিক কথা সেটা আলাদাভাবে বলার প্রয়োজন দেখি না।

১৬ কোটি মানুষের একটি দেশে তারকা হওয়া এখন যতটা সোজা, অপু বা শাকিবের ক্যারিয়ারের শুরু সময়টা অবশ্যই এমন ছিলো না, তাদের দুইজনকেই পরিশ্রম করতে হয়েছে নিজেদের যোগ্যতায়। অপুর যোগ্যতাই যথেষ্ট ছিল নিজেকে বাকী জীবন অনেক সম্মানের কোন একটি অবস্থানে রাখতে, সে জন্য তার ‘অপু ইসলাম খান’ হওয়ার এই চেষ্টা কি আদৌ প্রয়োজনীয় ছিল?

দেশের অনেক বিখ্যাত নায়ক-নায়িকারা আগেও ঘর বেঁধেছেন, অনেক তারকাই সফল ভাবে একে অন্যের সাথে সংসার করে যাচ্ছেন, কারো কারো ঘর ভেঙ্গেছেও কিন্তু একটি সংসার আর বাচ্চাকে ঘিরে গোড়ে ওঠা নোংরামি, ব্লেইম-গেইম এভাবে জাতীয় সংবাদ আর টক শোর প্রতি সপ্তাহের টপিক ঠিক কবে এই দেশে হয়েছিলো আমার জানা নেই। টিভি চ্যানেল আর সংবাদ পত্রের টি আর পি’র লালসা বহু দিন থেকেই তবে কেউ কারো পুত্রকে দেখতে বাসায় গেলে চার জন সাংবাদিক আর ক্যামেরা ঠিক কোন বিবেচনায় সাথে যেতে পারে সেটা দেশের একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিক হিসাবে ভেবে বের করা কঠিন।

অপু আর শাকিবের বিয়ের আর বিচ্ছেদের এই সিনেমায় দেশের মিডিয়া পাড়ার বেশির ভাগ মানুষেরই সমবেদনা(!) ছিল অপুর প্রতি! অপুর প্রতি অন্যায় হয়েছে, তার বাচ্চার প্রতি অন্যায় হয়েছে, অপুকে মেনে নিতে হবে শাকিবের, ভরন-পোষন দিতে হবে, যথাযথ মর্জাদা দিতে হবে এই সবই ছিল সবার দাবী! 

অথচ এই যে অপুর কাছের(!) মানুষ গুলো যদি অপুকে একবার বলতেন বছর ৫ আগে, ‘যে শাকিব খান আসলে আপনাকে ব্যবহার করেছেন অপু, আপনার সাথে তার জুটিকে তিনি তার সিনেমার সফলতার জন্য ব্যবহার করছেন’ তাহলে কি অপুকে আজ সমবেদনা দেওয়ার প্রয়োজন পড়তো? এই কাছের মানুষরাই যদি অপুকে বোঝাতেন ‘যে মানুষটি আপনাকে ৩টি সন্তানের জীবন পৃথিবীতে আসার আগেই  নিভিয়ে দিতে চাপ দিয়েছেন সে আসলে কোন দিনই আপনাকে ভালোবাসবে না বা আপনাকে সমাজে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চাইবেন না’ তাহলে কি অপুকে আজ প্রত্যেকটি টিভি চ্যানেলে ফোন করে নিজের ইন্ডিয়া ট্রিপের সাফাই দিতে হতো?

অপু বারবার দাবী করেছেন যে তিনি নিজের ভরন-পোষন নিজে করতে পারবেন আবার নিজেই নানা সময়ে নানা মিডিয়াতে এসে শাকিব তাকে কত দামী উপহার দিয়েছেন সেই সাফাই গেয়েছেন, কেন? তিনি বারবার নিজেকে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ দাবী করেছেন আবার তিনিই নানা মাধ্যমে চোখের পানি ফেলে ব্লেইম-গেম জিতে নিতে চেয়েছেন, কেন?

একজন নারী সব দিক থেকে নিখুঁত হলে তবেই এই দেশীয় মিডিয়া তাকে এখানে টিকে থাকার সুযোগ দেয়, আর তাই যদি সত্যি হয় তাহলে অপু একজন রোল মডেল হতে পারতেন, গ্রামের একজন কৃষকের মেয়ে অথবা ঢাকায় সপ্তাহের ৬ দিন গার্মেন্টসে কাজ করা নারীর কাছে অপু বিশ্বাস একজন ‘আইডিয়ল’ অথচ সেই অপু তাদের শেখালেন যে ‘কান্না’ করো, ধর্ম পাল্টাও, স্বামীকে পাওয়ার জন্য বাচ্চাকে ব্যবহার করো, যে মানুষটি তোমাকে দেশ ভরা মানুষের সামনে অপমান করছে প্রতিদিন তার সংসারে থাকার জন্য নিজের সাফাই গাও, প্রেমিক বিখ্যাত কেউ হলে তার কথায় এবোর্শন করে ফেলো, তাই তো?

শাকিব আর অপুর এই সিনেমায় ‘টাকা’ এবং ‘টাকা’ এতটাই মুখ্য যে বাকী সব কিছু যেন ‘অর্থহীন’। শাকিব তার সব দায়িত্বের প্রশ্নে একটি করে টাকার অংক বলে আর অপু সেই অংককে নিয়ে আরো কিছু চোখের পানি ফেলে।  আদৌ কি দরকার ছিল অপু বিশ্বাসের নিজেকে ‘অপু ইসলাম খান’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার? তার ধর্ম, বিবেক, আত্মসম্মান ত্যাগ করে শাকিবের মত কারো স্ত্রী হওয়ার? সাকিব আগে ফেরেশতা ছিলেন, এখন ইবলিশ হয়ে গেছেন এটা তো ঠিক সত্য হতে পারে না, তাই না? তাহলে কেন অপু? কেন আপনি, আপনার মত একজন প্রতিষ্ঠিত এবং প্রভাবশালী অভিনেত্রী সেই মধ্যযুগে অন্ধকারে থাকা নারীদের মতো সিদ্ধান্ত নিলেন?

‘অপু বিশ্বাস’ পরিচয়টিই যথেষ্ট ছিল আপনাকে এই দেশের মানুষের মনে রাখার জন্য! শাকিবের ‘ডেস্পারেট, কুটনামী করা, মুসলিম রীতি মানতে না পারা স্ত্রী’র পরিচয়টা আপনার দরকার ছিল না একদমই!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button