ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

দুধে অ্যান্টিবায়োটিক এবং একজন বিপন্ন অধ্যাপক!

১৯২৮ সালে স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং যখন বিশ্বের প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক ‘পেনিসিলিন’ আবিষ্কার করলেন- সেটি ছিল বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রের জন্য একটি বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী ঘটনা। তারপর থেকে জীবাণুর দ্বারা জটিল রোগাক্রান্ত হলে আমরা সেই জীবাণুর সংক্রমণরোধ এবং অসুখ সারাতে ওষুধ হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন আছে। খেয়ালখুশিতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অর্থাৎ- অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের কোর্স সম্পন্ন না করলে, ঘনঘন বা অধিক পরিমাণে মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে, অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক নিলে তখন মানবদেহে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি হয় অর্থাৎ- মানবদেহের জীবাণুগুলো সেই অ্যান্টিবায়োটিক- প্রতিরোধী হয়ে উঠে; তখন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে আর জীবাণু মরবে না, রোগীও সুস্থ হবে না, বংশবিস্তার করতে থাকবে, পরিণতি- সামান্য রোগেই একের পর এক অঙ্গ বিকল হয়ে রোগী মারা যাবে।

এই ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ এর ব্যাপারটি এখন মোটামুটি অনেকেরই জানা, কিন্তু মানবদেহে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরির ক্ষেত্রে সম্প্রতি যে আরো একটি নতুন ও ভয়াবহ কারণ চিহ্নিত হয়েছে সেটি খুব ভয়ংকর একটি বাস্তবতা আমাদের সামনে হাজির করেছে- তা হলো খাবারের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অনুপ্রবেশ!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক ও তাঁর সহগবেষকেরা সম্প্রতি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে জানিয়েছেন- বাজারে সহজলভ্য দেশের শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির সাত ধরণের পাস্তুরিত গরুর দুধের নমুনায় ‘অ্যান্টিবায়োটিক’ পাওয়া গেছে!

নিশ্চয়ই কৌতূহল হচ্ছে- মানুষের অ্যান্টিবায়োটিক গরুর দুধে কীভাবে এলো?

গরু-ছাগল-হাঁস- মুরগি ইত্যাদি গবাদি পশু-পাখিরও মানুষের মতোই জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে; অসুখ হতে পারে। অসুখ হলে “প্রাণির জন্য সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক” প্রয়োগ করতে হবে, কোনভাবেই “মানব চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক” প্রয়োগ করা যাবে না। কিন্তু কোনো কোনো অসাধু ওষুধ কোম্পানি ও দুর্নীতিবাজ প্রাণিচিকিৎসক মানুষের চিকিৎসায় নির্দেশিত অ্যান্টিবায়োটিকের অনেকগুলোই অতি মুনাফার লোভে ও নিয়ম বিরুদ্ধভাবে প্রাণিচিকিৎসায় ব্যবহার করছেন।

এছাড়াও অনেক ব্যবসায়ী প্রাণির খাবার, পোলট্রি ফিড ও ফিশ- ফিডে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দিচ্ছে গবাদিপশু-হাঁসমুরগি বা মাছের কোনো রোগ না হওয়ার আশায়। কোনো রোগ না থাকা সত্ত্বেও এসব প্রাণিদেহে অ্যান্টিবায়োটিক ঢুকার ফলে সেগুলো ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি করছে। এসব প্রাণির মাংস, দুধ ইত্যাদির মাধ্যমে এই অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে প্রবেশ করছে এবং ওই প্রাণির মতোই মানবদেহেও ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি করছে। আর এই ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ কী ভয়ংকর প্রাণঘাতী ব্যাপার, সেটিতো ইতোমধ্যে আমাদের জানা হয়েছে।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়! গবেষণায় পাস্তুরিত দুধে ‘অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে’- এই খবর প্রকাশ হওয়ার পরে গবেষক দলের প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক জনাব আ ব ম ফারুক এর উপর দুধ কোম্পানিগুলো এবং সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব খুব নাখোশ হয়েছেন, এই অধ্যাপককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, প্রকাশ্যে আপত্তিকর ভাষায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের অন্য কোথাও এমন আবিষ্কার হলে- সেটির জন্য গবেষক অভিনন্দিত হতেন, পুরস্কৃত হতেন, মানবখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক মেশানোর গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা শাস্তি পেতো। কিন্তু কী আশ্চর্য ব্যাপার- আজ প্রথম আলো মারফত জানা গেলো- এই অধ্যাপক এখন বিপন্নবোধ করছেন! জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে সেই সচিব ও মন্ত্রির যেখানে পদত্যাগ করা দরকার ছিল, সেখানে উলটো গবেষকের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি!

অধ্যাপক ফারুকের কাজ গবেষণা করা। উনি সেটি করেছেন। এই গবেষণার ফলাফল ভুয়া প্রমাণ করতে চাইলে সেটি শুধু সম্ভব আরেকটি নতুন গবেষণা করার মাধ্যমে। জনস্বার্থের কোনো বিষয় নিয়ে গবেষণার ফল প্রকাশের জন্য যদি গবেষককে ফাঁসিকাষ্ঠে চড়তে হয় সেটি আমাদেরকে সেই বর্বর সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয় যখন জ্ঞান প্রচারের মাধ্যমে যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করার দায়ে দার্শনিক সক্রেটিসকে হেমলক পানে হত্যা করা হয়েছিল।

‘পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে’– এই বৈজ্ঞানিক সত্য কথা বলার অপরাধে চার্চ জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে অভিযুক্ত করেছিল ‘ধর্মদ্রোহিতার’ অভিযোগে- ১৬৩৩ সালে। অসুস্থ ও বৃদ্ধ এই বিজ্ঞানীকে জোর করে ফ্লোরেন্স থেকে রোমে নিয়ে যাওয়া হয়, হাটু ভেঙ্গে সবার সামনে জোড় হাতে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে বলতে বাধ্য করা হয়- এতদিন গ্যালিলিও যা প্রচার করেছিলেন তা ধর্মবিরোধী, ভুল ও মিথ্যা। তাঁকে বলতে বাধ্য করা হলো- ‘পৃথিবী অনড়; সূর্যই পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে’। প্রাণ বাঁচাতে বৃদ্ধ গ্যালিলিও তাই করলেন। শোনা যায়, এর মধ্যেও একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ গণিতজ্ঞ-জ্যোতির্বিদ স্বগতোক্তি করেছিলেন- ’তারপরেও কিন্তু পৃথিবী ঠিকই ঘুরছে’ !

প্রফেসর আ ব ম ফারুক বিপন্নবোধ করছেন কিন্তু মাথানত করেননি। ৫টি কোম্পানির ১০টি পাস্তুরিত দুধের নমুনা তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা দ্বিতীয় দফায় আবার পরীক্ষা করেছেন। এবার তাতে ১০টি নমুনার ১০টিতেই শরীরের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে বলে অধ্যাপক ফারুক জানিয়েছেন। এখন ক্ষমতাবান সচিব সাহেব কী করবেন?

প্রফেসর ফারুক স্যারকে জেলে পাঠাবেন? নিশ্চয়ই এই গবেষক জেলের ভেতর থেকে গ্যালিলিওর মতোই স্বগতোক্তি করে বলবেন- “তারপরেও কিন্তু দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ঠিকই মিশছে”!

কীর্তিমান গবেষক প্রফেসর আ ব ম ফারুক স্যারের সাথে সংহতি প্রকাশ করছি। স্যার, আপনি একা নন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button