এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডবিবিধ

আনা লিস্টার- সাহসী এক লেসবিয়ানের গল্প!

ইতিহাসের অন্যতম সাহসী এক লেসবিয়ান আনা লিস্টারের নাম আপনারা অনেকে হয়তো না শুনেই থাকবেন। আনা লিস্টার ইংল্যান্ডের প্রথম মহিলা, যিনি কিনা প্রকাশ্যেই বিয়ে করে অন্য আরেকজন মহিলাকে। কিন্তু তৎকালীন সমাজে তো সমকামী প্রথাই ছিল প্রায় নিষিদ্ধ, তার মধ্যে থেকেও কীভাবে প্রকাশ্যে লেসবিয়ানের জীবন কাটাতে পারলো আনা? তার উত্তর সে নিজেই স্পষ্ট ভাষায় লিখে গেছে তার ডায়েরিতে, যেটা কিনা ১৮০৬-১৮৪০ সালের মধ্যে লিখা হয়েছিল।

আনা লিস্টার এর জন্ম ১৭৯১ সালে, পশ্চিম ইয়র্কশায়ার এর হালিফ্যাক্সে। পারিবারিকভাবে প্রচুর ধন সম্পদের মালিক আনা লিস্টারের বাবা জেমস লিস্টার ছিলেন একজন বৃটিশ মিলিটারী অফিসার, আর মা রেবেকা ব্যাটল ছিলেন গৃহিনী। ১৮ শতকের শিল্প বিপ্লবের পরই মূলত প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক হয় তারা।

জেমস লিস্টার
Image Source: bbc

আনা লিস্টারের বেড়ে ওঠা তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিদার বাড়ি শিবডেন হলে। ছোট থাকতেই আনার মা-বাবা ও ৪ ভাই-বোনের মৃত্যু হয়। তার কাছের মানুষের মধ্যে একমাত্র জীবিত ছিল তার বোন মারিয়ান। বাপ-মা হীন মেয়েকে মানুষ করার জন্য ৭বছর বয়সেই তাকে পাঠানো হয় রিপনের এক বোর্ডিং স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই আনার টম বয় সূলভ আচরণ ছিল। পূর্বে সমস্যা না হলেও স্কুল হোস্টেলে তার এরকম আচরণের জন্য প্রায়ই তাকে মার খেতে হতো। এভাবেই কেটে যায় কয়েক বছর।

অত:পর, ১৪ বছর বয়সে, ইয়র্কেরই একটি বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয় তাকে। সেখানেই সর্বপ্রথম এলিজা রায়না নামের সমবয়সী একটি মেয়ের সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয় সে। সেই সময় থেকেই সে তার ডায়েরি লিখা শুরু করে। এলিজা রায়না ছিল একটি হাফ-ইন্ডিয়ান মেয়ে, যার সাথে রুম শেয়ার করতো আনা। বোর্ডিং স্কুলের টিচারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এলিজা আর আনা সম্পর্কে লিপ্ত হলেও বেশিদিন তা চাপা থাকেনি। হাতে নাতে ধরা না পরলেও আনাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় ‘অন্য মেয়েদের নষ্ট করছে’ সন্দেহে। এলিজার সাথে সম্পর্ক ছেদ করে, চাচা-চাচীর সাথে থাকার জন্য শিবডেন হলে একেবারে চলে আসে আনা। আনার সাথে বিচ্ছেদের পর গভীর ডিপ্রেশনে পরে যায় এলিজা। তার মানসিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয় তাকে৷ কোনোদিনও সেই অবস্থা থেকে সম্পূর্ন সুস্থ হতে পারেনি এলিজা।

এলিজার সাথে বিচ্ছেদের পর দ্বিতীয় সম্পর্কে জড়ায় আনা লিস্টার। মেয়ের নাম- মারিয়ানা বেলকম্ব। এই মেয়েটিকেই ধরা হয় আনার জীবনের সত্যিকার ভালোবাসা হিসেবে। তাদের সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে প্রতিদিন হালিফ্যাক্স থেকে ইয়র্কশায়ার এর ৪০ মাইল পাড়ি দিত তারা একজন আরেকজনকে দেখার জন্য। ভালোবেসে আনা মারিয়ানাকে বিয়ে করতে চাইলো। কিন্তু তখনো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি পায়নি বিধায় স্বাধীনভাবে বাস করার জন্য যথেষ্ট টাকা পয়সা আনার ছিল না। আর সমাজ তো কখনোই মেনে নিবে না এই সম্পর্ককে। সুতরাং, ১৮১৫ সালে, এক আমির বিপত্নীক লোককে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয় মারিয়ানাকে। মারিয়ানার প্রতি ক্রোধে, রাগে ফেটে পরে আনা। কিন্তু তবুও, মারিয়ানার বিয়ের পরেও লুকিয়ে তার সাথে সম্পর্ক রেখে চলে আনা। কিন্তু দিনকে দিন মারিয়ার ব্যবহার অন্যরকম হয়ে পরে। লোক জেনে ফেলার ভয় আর লোকের হাসি-ঠাট্টার ভয় পেতে থাকে সে। ধীরে আনার সাথে সব রকম সম্পর্কের ইতি টানে মারিয়ানা।

সমকামীতা তখন ছিল মারাত্মক ঘৃণ্য অপরাধ।
Image Source: bbc

পরবর্তীতে চাচার মৃত্যুর পর একমাত্র উত্তরাধিকার হিসেবে সব সম্পত্তির মালিক হয় আনা। ইউরোপের হাই সোসাইটিতে তার চলাফেরা। আভিজাত্য জীবনের এই অংশেও সে অনেক নারীর সংস্পর্শে আসে। তাদের মধ্যে ডেনমার্কের কুইন ম্যারিও ছিল। কিন্তু আনা থিতু হতে পারেনি তাদের কারো সাথেই। ইয়র্কশায়ার এ ফেরত এসে, ১৮৩২ সালে আনার সাথে পরিচয় হয় আন ওয়াকার নামের এক মহিলার। যথারীতি যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয় তারা। পরিচয়ের দুই বছর পর, ১৮৩৪ সালে এই দুই নারী ইয়র্কের হলি ত্রিনিতি চার্চে, ইস্টার সানডের দিন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়৷ ওয়াকারের পরিবারের অমতেই বিয়ে করে তারা এবং শিবডেন হলেই নতুন সংসার শুরু করে। ১৮৪০ সালে, আনার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একসাথেই ছিল এই দুই নারী।

যাই হোক, যে সময়টায় সমকামীতা ঘৃন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো, সেই সময়ে আনা লিস্টারের এরকম জীবনধারা তাকে সাহসী, স্বাধীন নারী হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দেয় সত্যিকার অর্থে।

শিবডেন হলের অন্দর
Image Source: bbc

আরো কিছু তথ্য:

১. আনা লিস্টার সবসময় কালো পোশাক পরতেন এবং তার পুরুষসুলভ আচরণের জন্য ‘জেন্টেলম্যান জ্যাক’ ডাকনামে পরিচিত ছিলেন তার এলাকায়।

২. আনা তার ডায়েরি লিখেছেন তার আবিষ্কৃত কোড ভাষায়, আনুমানিক ৪০লক্ষ শব্দে। সেক্সুয়াল জীবন ছাড়াও আনার জীবনের অন্যান্য পর্যায়গুলোও স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে এটিতে।

৩. তার ডায়েরি তার বংশধরদের দ্বারা লুকায়িত ছিল, যা তার মৃত্যুর অনেক বছর পর প্রকাশিত হয়।

৪. হেলেনা হুইটব্রেড নামের এক ইতিহাসবিদ ৬বছর গবেষণা করে আনার কোডিং ভাষার মর্মার্থ খুঁজে বের করেন এবং ‘আই নো মাই ওউন হার্ট: দ্য ডায়েরিজ অফ আনা লিস্টার ১৭৯১-১৮৪০’ নামক বই প্রকাশ করেন।

৫. আনা লিস্টারের জীবনী নিয়ে বিবিসি ওয়ান চ্যানেলে একটি শো প্রদর্শিত হচ্ছে ১৯ মে, ২০১৯ থেকে, নাম- জ্যাক জেন্টলম্যান। যার শ্যুটিং হয়েছে আনার বাড়ি শিবডেন হলে। ড্রামাটির ট্রেইলার দেখুন এই লিঙ্কে ক্লিক করে।

(Source: bbc)

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button