সিনেমা হলের গলি

অঞ্জন দত্তের জানালায় এক চিলতে আকাশ কিংবা শিল্পের মানচিত্র যখন গোটা পৃথিবী!

উইলি লোওম্যান পেশায় সেলসম্যান। দুই পুত্র আর স্ত্রীকে নিয়ে সংসার। বুড়ো হয়ে গেছেন, এখন আর আগের মতো দূর দূরান্তে গিয়ে পণ্য বেচতে পারেন না। ফলে গত পাঁচ বছর ধরে কোম্পানিকে লাভ এনে দিতে পারছেন না। কোম্পানি তার উপর খুশি না। কিন্তু তার অহংকার সেই আগের মতোই আছে। তিনি ভাবেন, তিনি সাধারণ কেউ না। সমাজের অসাধারণ একজন।

লোকে তাকে চিনে, খুব গণ্য করে। নুন আনতে পান্তা ফুরায় টাইপের সংসার। কিন্তু অহমিকায় টনটনে। তিনি এটাও চান যে, এবার কোম্পানি তাকে মাঠেমাঠে না পাঠিয়ে একটা রুম দিক, একটা টেবিল, একটা টেলিফোন আর সপ্তাহে ১০ ডলার অন্তত? বড় ছেলে এটা সেটা নানা কাজ করে বেড়ায়। কিন্তু কোথাও থিতু আর হতে পারেন না। বাবা চান, ছেলে তার মতোই সেলসম্যান হোক। বড় হোক একদিন, টাকা কামাক অনেক।

ছেলের ওসব ভাল লাগে না। তার আকাশ ভাল লাগে, বিকেলে হলদে হয়ে আসা বৃক্ষ ভাল লাগে, হুট করে পাহাড়ের গায়ে নেমে আসা সন্ধ্যা ভাল লাগে। সে কিছু একটা করতে চায়, কিছু একটা আর পুরনো বন্ধুবান্ধবদের সাথে কয়েক পেগ হুইস্কি? সাধারণ একটা জীবন থাকুক। কেটেতো যাবে…কিছু একটা, কিন্তু ওই বিরাট দেয়ালের বাইরে কিছু একটা। সেলসম্যান নয়। ওটা তার জন্য না।

বাবা তা হতে দিতে চান না। তিনি ভাবেন, ছেলে ভুল পথে আছে। বুঝতে পারছে না। একদিন ঠিক বুঝে যাবে। ছেলে সেদিন ঠিকঠাক ঘুরে দাঁড়াবেই। আর যেদিন বুঝতে পারবে, সেদিন যেন ছেলে খেই হারিয়ে না ফেলে, ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তার জন্য বাবা ছেলের জন্য কিছু সঞ্চয় রেখে যেতে চান। সেই সঞ্চয় যেদিন ছেলের হাতে পড়বে, সেদিন ছেলের চিন্তাটাই পাল্টে যাবে। কারণ দুটো জ্ঞান আর শিল্প দিয়ে পেট চলে না। আর মা, এই দুইয়ের মাঝে ব্যালেন্স করতে চায়। মা চায়, বাপ ছেলে মিলে যাক। কেউ অন্তত কারো কথা শুনুক?
এই নিয়ে বাবা ছেলের সেই পুরনো ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্ধটা দুটো আলাদা প্রজন্মের এক হতে না পারার। যে যার জায়গায় থেকে নিজের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করার চিরায়ত সংগ্রাম। যেই সংগ্রামটা প্রতিটা ঘরের। প্রায় সব বাবা-ছেলের!
এরকম গল্প নিয়ে আর্থার মিলারের নাটক ‘দ্য দেথ অব সেলসম্যানে’র বাংলা রূপ, ‘সেলসম্যানের সংসার’।

আমাদের বেড়ে উঠার ক্রাশ, ‘গায়ক’ অঞ্জন দত্তের মঞ্চনাটক সেলসম্যানের সংসার। মূল ভূমিকায় অভিনয় করা ছাড়াও এই নাটকের নির্দেশকও তিনি। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রবল বাধার মুখে, শেষমেশ ভেন্যু পালটে মহিলা সমিতির মঞ্চে নাটকের মঞ্চায়ন হয়ে গেল। মঞ্চ দাপানো অভিনয় ছাড়াও, আলোক প্রক্ষেপণ, আবহ সংগীত আর খুব সরল কিন্তু অর্থবহ মঞ্চসজ্জা এই নাটকের প্রধান শক্তি। সাকুল্যে ছয়টা ক্যারেক্টার। প্রায় প্রত্যেকে একে অপরকে ছাড়িয়ে গেছেন অভিনয়ে। বাবা আর বড় ছেলের কেউ কাউকে ছেড়ে না দেয়ার দ্বন্দ্ব, মিনিটের পর মিনিট দর্শক রূদ্ধশ্বাসে উপভোগ করেছেন। এতোটাই মজে গেছেন যে, নাটক শেষ হওয়ার বহুক্ষণ পরে, আলো জ্বলে উঠার বেশ খানিকটা সময় পার হয়ে গেলেও কেউ আসন ছেড়ে উঠছে না। গোটা হলে পিনপতন নিরবতা।

অঞ্জন দত্তের নাটক

অঞ্জন আমাদের ছেলেবেলার ক্রাশ। অঞ্জনের গান শুনে বড় হয়েছি আমরা। আমরা আকাশ দেখেছি, পাড়ার মেয়েটার সাথে প্রেম করেছি কিংবা সহপাঠীর বইয়ের পাতার ভাঁজে গোলাপ গুঁজে দেয়াটা অঞ্জনের কাছে শিখেছিলাম। মধ্য শহরে খুব গ্রীষ্মকালে প্রেমিকার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে খুব অসম্ভব একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন যে, যেকোন বয়সে দেখা যায়, সেসব অঞ্জনের কাছে শেখা! কিন্তু অভিনেতা অঞ্জনকে কয়জনের আর চেনা হলো? বিশেষ করে মঞ্চের অঞ্জন দত্ত? অথচ অঞ্জন সবসময় বলে গেছেন, মঞ্চই তার মেধা শক্তির মূল ভিত্তি!

সেই অঞ্জন দত্ত যখন মাত্র কয়েক হাত দূরত্বে দাড়িয়ে গলার রগ ফুলিয়ে তার সেলসম্যানশিপের বন্দনায় মাতোয়ারা, আমাদের শরীর কাঁপতে থাকে। আমাদের কাছে মনে হয় এটা স্বপ্ন, এটা সত্যি নয়!

নাটকের বাণিজ্যিকীকরণ, হ্যানাত্যানার দোহাই দিয়ে শিল্পকলা কিংবা শিশু একাডেমিতে নাটকটার মঞ্চায়ন করতে দেয়া হয়নি। এসব শিল্পের ঠিকাদারদের চোখ রাঙ্গিয়ে, মহিলা সমিতি যে শেষমেশ রাজি হলো, তারজন্য অশেষ অভিনন্দন। শিল্পের দেশ নাই। শিল্পের দেশতো ‘গোটা পৃথিবী’!

নাটকের সাথে বড় পাওয়া, শো’র শুরুতে, গিটার হাতে অঞ্জনের গলায়, ‘আমার জানালা দিয়ে একটুখানি আকাশ দেখা যায়…’ এই গানটা মনে হয় এইদেশের শিল্পকলার হোমড়াচোমরাদেরই গিফট করেছেন, কারণ গানের শেষেও ঘুরেফিরে এই কথাটাই আসলো যে, শিল্পের কোন দেশ নাই। এই গানটারওতো মূল বক্তব্য এটাই!

ঢাকার মঞ্চ যে দেড় ঘণ্টাজুড়ে শিহরণটা দিয়ে গেল গোটা শরীরে, সারা মনজুড়ে, যে অদ্ভুত মুগ্ধতায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা সন্ধ্যাটা, সেই মগ্নতার নিমজ্জন কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না। বহুদিন থেকে যাবে।

লেখক: রাজু নুরুল ( ডিরেক্টর, প্রোগ্রাম এন্ড পলিসি, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ)

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button