অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

বাংলাদেশি কন্যার অক্সফোর্ডে অসামান্য কীর্তি!

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় দুনিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। বিশ্বের অগণিত স্বপ্নালু তরুণ তরুণীর স্বপ্ন থাকে, একদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন তারা। কিন্তু কিছু কিছু ছাত্র-ছাত্রী তাদের স্বপ্নের সীমারেখাকেও ছাড়িয়ে যান। তেমনি এক শিক্ষার্থীর কথা বলছি। তার নাম আনিশা ফারুক, ডাক নাম পদ্মা। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত তরুণী। তিনি যে শুধু অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েছেন তা নয়, সেখানে গিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের নাম অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিলেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ আছে, যেমনটা আমাদের দেশেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে। এই ছাত্র সংসদের পদগুলো খুবই প্রেস্টিজিয়াস। কারণ, এখানে যারা নেতৃত্ব দেন তারা গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করেন। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন, ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপার স্যাপার নিয়ে, অধিকার নিয়ে সবার সামনে ফ্রণ্টে গিয়ে কথা বলেন। যাহোক, সেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এইবছর ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে। ২২ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে, সকল শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব যার, সেই প্রেসিডেন্ট পদে এবছর ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। আর কেউ নন, যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের কন্যা আনিশা ফারুক!

আনিশা ফারুক, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এটা এক ঐতিহাসিক মাইলস্টোন হয়ে থাকবে। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তো বটেই আনিশা দক্ষিণ এশিয়ারই প্রথম প্রতিনিধি যিনি অক্সফোর্ড ছাত্র সংসদের শীর্ষ পদে নেতৃত্বে আসলেন! গত ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় অক্সফোর্ডের ওয়েস্টন লাইব্রেরিতে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। তিন দফায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চূড়ান্ত পর্বে ১৫২৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন আনিশা ফারুক। সর্বমোট ৪৭৯২ ভোটে জয়ী হন তিনি। প্রেসিডেন্ট পদের আরেক প্রার্থী এস্পায়ার প্যানেলের এলি মিলনে-ব্রাউন অবশ্য দ্বিতীয় দফায় বাদ পড়ে যান। তবে ফাইনাল রাউন্ডে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় স্বতন্ত্র প্রার্থী আইভি ম্যানিংয়ের সাথে। এই প্রার্থী ভোট পান ১৪১৬ ভোট।

বাংলাদেশও আনিশার এই সাফল্যে গর্বিত। তবে আনিশা ফারুক এই পর্যায়ে আকাশ থেকে এসে পড়েননি। এর আগে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মুখপাত্র পত্রিকা ‘অক্সফোর্ডস্টুডেন্ট’ এর চিফ-এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লেবার ক্লাবের কো-চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এই ক্লাবের পক্ষ থেকে বিতর্ক, সোশ্যাল ক্যাম্পেইন ইত্যাদি কাজকর্ম পরিচালনার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তিনি।

নির্বাচনী অঙ্গীকারে আনিশা ফারুক সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। বর্তমান পৃথিবী একটা বড়সড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সকলের মধ্যেই এক প্রকার বিভ্রান্তি। আমাদের সামনে লক্ষ্য কি হওয়া উচিৎ, কাকে অনুসরণ করা উচিৎ, কি আমাদের খুশি করবে – সব কিছু নিয়েই আমরা একটু বিভ্রান্ত। ফলে, সময়ের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন ডিপ্রেশন, মানসিক অসুস্থতা প্রকট হচ্ছে। বাড়ছে সুইসাইড। আনিশা কি ঠিক এই বিষয়টিই চিন্তা করে তার প্রায়োরিটি ঠিক করেছেন কি না জানি না, তবে তার মেনিফেস্টোতে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারটি বেশ প্রাধান্য পেয়েছে। ‘মাইন্ড ইউর হেড’ নামে একটি ক্যাম্পেইনের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন যা মানসিক অসুস্থতা জয় করার জন্য কাজ করবে। এছাড়া একটি ওয়েলফেয়ার ফান্ড গঠন নিয়ে কাজ করার কথা বলেছেন যার মাধ্যমে অক্সফোর্ডের অধীনে কলেজ এবং সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে আনা যায়।

এছাড়া প্রশাসনের সাথে লবি ঠিক রেখে ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার এসেছে তার মেনিফেস্টোতে। রুম বুকিং কিভাবে সহজতর করা যায়, কিভাবে স্টুডেন্ট সোসাইটির সাথে সম্পৃক্ততা ঠিক রেখে কাজ করা যায় ইত্যাদি বিষয়গুলো উঠে এসেছে। ১৯৬১ সালে অক্সফোর্ড ছাত্র সংসদের যাত্রা শুরু হয়। বিভিন্ন সময় এই ছাত্র সংসদটি শিক্ষা এবং ছাত্রদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। ইতিহাস সৃষ্টি করে সেই ছাত্রসংসদের  নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হলেন আনিশা ফারুক!

আনিশা ফারুক, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিজয় বাংলাদেশের জন্যে অনেক যেমন গর্বের তেমনি এটি আমাদের দেশের ছাত্র সংসদগুলোর অকার্যকারিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশে বসে অক্সফোর্ড ছাত্র সংসদের এই জয় নিয়ে যেমন অভিনন্দন জানাচ্ছি তেমনি একটু হতাশারও ব্যাপার যে আমাদের দেশেও ছাত্র সংসদগুলো একসময় ছাত্রদের পক্ষে, বাংলাদেশের পক্ষে ভূমিকা রাখত। আজও ছাত্র সংসদ আছে, নেই নির্বাচিত কোনো প্রতিনিধি। আনিশা ফারুক নিজ যোগ্যতায়, নিজ মেধায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন জয় করলেন। তিনি এখন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এখানে তার জাতীয়তা মুখ্য ব্যাপার থাকবে না আর, তিনি এখন অক্সফোর্ডের ২২ হাজার ছাত্রছাত্রীদের প্রতিনিধি।

কিন্তু, আমাদের দেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো বন্ধ করে ছাত্রদের অধিকার, ছাত্রদের নিয়ে কথা বলার প্ল্যাটফর্মগুলো বোবা করে রাখা হয়েছে। এটার দায় সবারই। যদি ছাত্রদের ভাল চাইত, যদি শিক্ষাব্যবস্থার ভাল চাইত সবাই তাহলে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে শিক্ষার্থীদের এই প্ল্যাটফর্মের ধারাবাহিকতা রক্ষাটা সবার প্রায়োরিটিতে থাকত। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শেষপর্যন্ত কি হয় তার জন্য অপেক্ষা থাকবে তো অবশ্যই, নির্বাচন হওয়ার পর কেবল কথা বলা যাবে। এখন পর্যন্ত অবস্থা এমন যে, নির্বাচনের উদ্যোগ এসেছে, এটাই অনেক কিছু। অথচ, ধারাবাহিকতা ঠিক থাকলে আমাদের এখন চিন্তা করার প্রায়োরিটিতে থাকত, কিভাবে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। শিক্ষার্থীবান্ধব কোন সিদ্ধান্ত শিক্ষা, শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক হবে সেটা নিয়ে কথা বলাটা এখন প্রায়োরিটিতে থাকত।

যাইহোক, আনিশা ফারুককে অভিনন্দন! আপনি বাংলাদেশকে জিতিয়েছেন অক্সফোর্ডে, এবার বাংলাদেশ নিজ দেশে জিতে কিনা তার অপেক্ষা করি! নিশ্চয়ই এবার ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল ছাত্রসংসদ নির্বাচন হবে, যোগ্য নেতৃত্ব কথা বলবে ছাত্রদের কণ্ঠস্বর হয়ে…

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button