সিনেমা হলের গলি

সিনেমার চেয়েও সিনেম্যাটিক যে ভালোবাসা!

দশ বছরের প্রেম, পঁয়ত্রিশ বছরের সংসার জীবন- সব মিলিয়ে একসঙ্গে সাড়ে চার দশকের পথচলা। এখনও তারা নতুন প্রেমিক জুটির মতো খুনসুটি করেন, একজন রাগ করলে অন্যজন আয়োজন করে রাগ ভাঙান। ক’দিন আগেই নিজেদের বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এই জুটি, অথচ তাদের রোমান্টিকতা দেখে তরুণ-তরুণীরা ঈর্ষায় ভুগতে পারে এখনও। একজন সিনেমা জগতের মানুষ, দাপিয়ে অভিনয় করছেন এখনও। অন্যজন মডেলিং করতেন, পরে সংসারে থিতু হয়েছেন। বলছি অনিল কাপুর আর তার স্ত্রী সুনীতা কাপুরের কথা। হাতে হাত রেখে জীবনের ৪৫টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন তারা, অথচ দুজনের পরিচয়টা হয়েছিল কি অদ্ভুতভাবে! একটা প্র‍্যাঙ্ক কল থেকে পরিচয়ের সূত্রপাত হয়েছিল দুজনের। চলুন, সেই গল্পটা শোনা যাক অনিল কাপুরের মুখেই!

******************************

আমার এক বন্ধু সুনীতাকে আমার ফোন নম্বর দিয়েছিল, মজা করার জন্যে। এবং ও আমাকে ফোনও করেছিল, সেই প্রথমবার আমি ওর কণ্ঠস্বর শুনি, এবং মুগ্ধ হবার জন্যে ওইটুকুই যথেষ্ট ছিল। কয়েক সপ্তাহ বাদে একটা পার্টিতে আমাদের দেখা হলো, এবং আমরা সামনাসামনি পরিচিত হলাম। ওর মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল, যেটা আমাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছিল।

আমরা নিজেদের মধ্যে প্রচুর কথা বলতাম, ভালো একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল দুজনের মধ্যে। আমি তখন একটা মেয়েকে পছন্দ করি, সেই মেয়েটার ব্যাপারেও ওর সঙ্গে কথা হতো। আমি তাকে কতটা পছন্দ করি, সেই মেয়ে আমাকে কতটা ভালোবাসে, এগুলো নিয়ে কথা বলতাম আমরা। কিন্ত হঠাৎই সেই মেয়েটা আমাকে ছেড়ে চলে গেল, হৃদয়ভঙ্গের বেদনা নিয়ে আমি সুনীতার দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়লাম। দুজনের বন্ধুত্বটা আরও গভীর হলো।

কিছুদিন পরেই আমি বুঝতে পারলাম, ওকে ছাড়া আমার চলবে না৷ আমরা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো চলতে শুরু করলাম। এটা অবশ্য সিনেমার মতো কিছু ছিল না, আমি কখনও ওকে বলিনি আমার প্রেমিকা হবার জন্যে, সেও বলেনি। কিন্ত আমরা জানতাম, উই আর মেড ফর ইচ আদার। আমি কি করি, কত টাকা কামাই, এগুলো সুনীতার কাছে কখনোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

প্রেম করার সময়ে এমনও হয়েছে যে আমার হাতে একটা পয়সাও নেই, সুনীতা ট্যাক্সি ভাড়া করে এসে আমাকে তুলে নিয়েছে, লাঞ্চের খরচটাও সে বহন করেছে, তারপর আমাকে ঘরের সামনে ড্রপ করে গেছে৷ এগুলো একদিন-দুইদিনের গল্প নয়, বছরের পর বছর ধরে এগুলো ঘটেছে, তখনও আমি পায়ের নিচে শক্ত মাটি খুঁজে ফিরছি, অনিল কাপুরকে তখনও কেউ চেনে না, চিনতো শুধু সুনীতা।

দশ বছর ধরে আমরা প্রেম করেছি, একসঙ্গে ঘুরেছি, একটু একটু করে আমাদের বয়স বেড়েছে। সম্পর্কের শুরু থেকেই প্রতিটা ব্যাপার নিয়ে ও ভীষণ স্বচ্ছ্ব ছিল আমার সঙ্গে, যেমন, ও বলেই দিয়েছিল যে কোনদিন রান্নাঘরে ঢুকতে পারবে না। আমি যদি ওকে রাঁধতে বলি, তাহলে নাকি ও আমাকে লাথি মারবে৷ আমি জানতাম, ওকে নিজের করে নিতে হলে একটা জায়গা পর্যন্ত আমাকে অবশ্যই যেতে হবে। আমার হাতে তখন কাজ নেই, পয়সা নেই, এবং এই ব্যাপারগুলো আমি ওর সঙ্গে শেয়ার করাতাম। ওর দিক থেকে কোন চাপ ছিল না, বরং সাপোর্ট ছিল সবসময়ই। সেই সমর্থনটা ছিল নিঃশর্ত।

কাজেই আমি যখন ‘মেরি জং’ সিনেমা দিয়ে আমার প্রথম ব্রেক-থ্রু টা পেলাম, তখন আমার প্রথমেই মনে হলো, একটা ভালো ঘরের চিন্তা আমি এখন করতেই পারি। আমি সুনীতাকে বললাম, আগামীকাল আমরা বিয়ে করবো। বিয়েটা হয় আগামীকাল হবে, নয়তো কখনোই না। পরদিন সত্যি সত্যিই দশজন মানুষের উপস্থিতিতে আমরা বিয়ে করে ফেলেছিলাম। বিয়ের দিন তিনেক পরে আমি শুটিঙে গেলাম, আর ম্যাডাম গেলেন হানিমুনে, তাও আমাকে ছাড়াই!

একটা কথা মন থেকে বলি, আমি নিজেকে যতটা জানি, যতটা বুঝি, তারচেয়ে আমাকে বেশি বোঝে সুনীতা। আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একসঙ্গে নিজেদের জীবন গড়েছি, নিজেদের বাড়ি তৈরি করেছি। জীবনের সব উত্থান-পতন সামলে তিনটে ছেলে-মেয়েকে বড় করেছি। কিন্ত আমার মনে হয়, আমাদের ডেটিং পিরিয়ড বুঝি মাত্রই শুরু হলো! এখনও আমরা রোমান্টিক ওয়াকে বের হই, ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের আয়োজন করি।

আমরা ৪৫ বছর ধরে একসঙ্গে আছি, বন্ধুত্ব, প্রেম আর বিয়ে মিলিয়ে সাড়ে চার দশক তো কম সময় নয়। একজন পারফেক্ট মা, আর পারফেক্ট স্ত্রী বলতে যা বোঝায়, সুনীতা আসলে সেটাই। প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার পরেই ওকে দেখে আমি কাজের অনুপ্রেরণা পাই, কেন জানেন? যখন ও আমার কাছে টাকা চায়, আর আমি জিজ্ঞেস করি, কাল না এতগুলো টাকা দিলাম, কি করেছো সব? তখন ও হাসতে হাসতে বলে, সেগুলো সব কেনাকাটায় শেষ হয়ে গেছে। তখন আমার মনে হয়, নাহ, কাজ তো করতেই হবে! সেজন্যেই এভাবে ছুটে চলা…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button