অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

এন্ড্রিউ জোন্স- হার্টবিহীন এক বডিবিল্ডার, কিংবা অনুপ্রেরণার জীবন্ত নায়ক

”প্রথমদিকে আর্টিফিশিয়াল হার্টের ব্যাপারে খুবই হতাশাগ্রস্ত ছিলাম। এবং কিছুদিন পর আমি অনুভব করি এটাই এখন আমার জীবন। হয় আমি কিছুই না করে নিজের জন্য দু:খ প্রকাশ করতে পারি, অথবা সেই কাজগুলো করতে পারি যেগুলো আমি করতে ভালোবাসি- সর্বোত্তম উপায়ে।”

উক্তিটি প্রফেশনাল ফিটনেস মডেল এবং বডিবিল্ডার এন্ড্রিউ জোন্সের। ভাবছেন আর্টিফিশিয়াল হার্ট নিয়ে কেউ আবার বডিবিল্ডার হয় কীভাবে? তবে শুনুন এই অদম্য, দৃঢ়প্রত্যয়ী জোন্সের গল্প, হার্টের পালস ছাড়াই যিনি কাটিয়েছেন প্রায় আড়াই বছর!

ঘটনার শুরু ২০১২ সালে। কোনো এক সকালে জোন্স দৌড়াচ্ছিলেন, হঠাৎ করেই তার শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং হাঁপিয়ে ওঠেন। ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার কিছু মেডিসিন দেন, এর বেশি কিছু না। জোন্সও তেমন একটা গুরুত্ব দেননি ব্যাপারটাকে। ২ বছর কেটে যায় কোনো সমস্যা ছাড়াই। এরপর একদিন জোন্স কাশতে কাশতে লক্ষ করলেন তার মুখ দিয়ে অনবরত রক্ত পড়ছে, ভড়কে গিয়ে দ্রুত তিনি চলে গেলেন হাসপাতালে। চেক আপ করা হলো, ধরা পরলো কার্ডিওমায়োপ্যাথি।

এটি এমন এক রোগ, যার কারণে হার্ট সারা শরীরে রক্ত পাম্প করতে পারে না। সাধারণত হৃদপিন্ডের সংকোচন প্রসারণের জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। হৃদপিন্ডের এই অনবরত সংকোচন ও সম্প্রসারনের কাজ চালাবার জন্য তার নিজস্ব অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের নাম সিনোট্রায়াল নোড। এটা হৃদপিন্ডের ডান পাশের উপরি প্রকোষ্ঠের উপর অংশে অবস্থিত। এটাকে পেস মেকার ও বলে। কার্ডিওমায়োপ্যাথি হলে এই পেস মেকারের কার্যক্ষমতা হারিয়ে যায়, অর্থাৎ সারা দেহে রক্ত পাম্প করতে পারে না। তাই জোন্সের হার্ট রক্ত পাম্প করার সক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে।

ডাক্তাররা তখন ইমেডিয়েট হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে চায়। কিন্তু হার্টের ডোনার না পাওয়ায় তারা জোন্সকে এমন এক যন্ত্র দেয় যা সারা দেহে রক্ত পাম্প করতে সহায়তা করে। এই যন্ত্রটির নাম হলো লেফট ভেন্ট্রিকুলার এসিস্ট ডিভাইস (এল ভি এ ডি), যার ভেতর ব্যাটারি প্যাকসহ কম্পিউটার সেট করা থাকে যথোপযুক্ত প্রোগ্রামিং দিয়ে। এটি অনেকটা কৃত্তিম পেস মেকারের মতো, যেটি চার্জের মাধ্যমে চলে এবং সারা দেহে রক্ত পাম্প করতে সক্ষম হয়। সেই থেকে জোন্সের জীবনযুদ্ধের শুরু। ব্যাগে করে তিনি বহন করতেন তার ‘সেই’ ডিভাইস তথা কৃত্রিম হার্ট! প্রতি রাতে ফোন চার্জ দেওয়ার পাশপাশি জোন্সকে তার হার্টও চার্জ দিতে হতো। এরপরও তিনি দমে যাননি একবিন্দু। বরং নিজের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন স্বাভাবিকভাবেই। আর্টিফিশিয়াল হার্ট ব্যাগে বহন করেও তিনি জিমে গিয়েছেন প্রতিদিন, শরীরচর্চা করেছেন, বিভিন্ন কসরত করে অবাক করেছেন গোটা বিশ্বকে। কিছু ভিডিও তিনি নিজে সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করেছেন, যেখানে তাকে কৃত্রিম হার্ট বহনকারী ব্যাগ কাধে নেওয়া অবস্থায় ভারোত্তোলন করতে দেখা যায়। এভাবেই কেটে যায় প্রায় আড়াই বছর।

২০১৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জোন্সের কাছে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত ফোনকল, যার জন্য তিনি অপেক্ষা করেছেন দীর্ঘদিন- তার হার্টের ডোনার পাওয়ার খবর। বিন্দুমাত্র দেরি না করে জোন্স হাসপাতালে গিয়ে সার্জারির জন্য প্রস্তুত হয়ে নেয়। টানা আট ঘণ্টার সার্জারি শেষে জোন্স ফিরে পায় তার পূর্বাবস্থা। জোন্সের যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না। তিনি যেন পুনর্জন্মগ্রহন করেছেন, তার জীবন ফিরে পেয়েছেন। কোনো কৃত্রিম অঙ্গ নয়, বাস্তব হার্টই তার দেহে রক্ত পাম্প করছে। এরপর তিনি নতুন উদ্যমে শুরু করেন ফিটনেস মডেলিং ও বডিবিল্ডিং। জিমে নিয়মিত হওয়ার ১ মাস পর যখন জোন্সের কাছে তার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়, তিনি বলেন- “আমার হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রায় এক মাস হয়ে গেছে এবং এখন আমি খুবই চমৎকার অনুভব করি। আমাকে এখন আর চিন্তা করতে হয় না যে আমার ব্যাটারিতে চার্জ আছে কি না, আমি এখন নরমাল শাওয়ার নিতে পারি।”

জোন্স যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন, এমনটা যেন আর কারো সাথে না হয়, অর্থাৎ কাউকে যেন তার মতো এত লম্বা সময় ধরে ডোনারের অপেক্ষা করতে না হয়, সেজন্য জোন্স নিজে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। ‘হার্টস আ্যট লার্জ’ নামের ফাউন্ডেশনটি কাজ করে যাচ্ছে ট্রান্সপ্ল্যান্ট রোগীদের জন্য। এছাড়া জোন্স ‘এ জে ফিটনেস’ নামে আরেকটি ব্র‍্যান্ড গড়ে তোলেন, যা স্বাস্থ্য এবং ফিটনেস সচেতনতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। ‘ওয়ার্ল্ড বিউটি ফিটনেস এন্ড ফ্যাশন’ থেকে জোন্স বেশ কিছু এওয়ার্ডও অর্জন করেছেন ইতোমধ্যে।

বর্তমানে জোন্স তার চ্যারিটি কাজ নিয়েই ব্যস্ত। ইন্সট্রাগ্রামে তার প্রায় পঞ্চাশ হাজার ফলোয়ার্স, যারা তার থেকে অনুপ্রেরণা পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফিটনেস মডেলিংকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। একইসাথে জোন্স বর্তমানে অরগান ডোনেশন এবং ফিটনেসের প্রবক্তা হিসেবেও বিভিন্ন সংগঠনের হয়ে কাজ করছেন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button