খেলা ও ধুলা

উই উইল মিস ইউ জেন্টলম্যান!

ছবিটা আজ থেকে সাদাকালো, গতকালও সেটা রঙিন ছিল। মাত্র একদিন আগেই হাশিম আমলা জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার পথচলার এখানেই ইতি, দক্ষিণ আফ্রিকার জার্সি গায়ে আর কখনও দেখা যাবে না তাকে। এমনটা যে ঘটতে পারে, সেটার ইঙ্গিত ছিল। ব্যাট হাতে ফর্মটা ভালো যাচ্ছিলো না, নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন বেশ কয়েকমাস ধরেই। বিশ্বকাপেও ব্যর্থ তিনি। এই ব্যর্থতার রেশ আর টানতে চাননি আমলা, তাই বিদায় বলে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে।

বিদায়ের এই ক্ষণে চোখে ভেসে উঠলো আমলার ক্রিকেট ক্যারিয়ারটা। আমলার শুরু থেকে শেষ- পুরোটাই তো প্রত্যক্ষ্য করার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের। টেস্ট অভিষেক হয়েছিলো ২০০৪ সালে, ভারতের বিপক্ষে ইডেন গার্ডেনের ঘুর্ণি পিচে। ক্যারিয়ারের শুরুতেই সমালোচিত হয়েছিলেন দুর্বল টেকনিকের কারণে। জাতীয় দলে তখন স্মিথ, ডিপেনার, গিবস, ক্যালিসদের ভিড়ে টপ অর্ডারে জায়গা পাওয়া ভার; নিল ম্যাকেঞ্জিও তখন সুযোগ পেয়ে ডাবল সেঞ্চুরী হাঁকান।

জাতীয় দল থেকে ছিটকে পড়ে ফিরে গিয়েছিলেন কাওয়াজুলু নাটালের দলে; তার আতুঁড়ঘরে। টেকনিক শুধরে দলে ফিরলেন যখন, ক্রিকেটবিশ্ব এক অন্য হাশিম আমলাকে পেল। ক্রিকেটীয় ব্যাকরণের বাধ্য ছাত্র তিনি, গ্রামার মেনে এতটা পারফেক্ট শট এই পাওয়ার ক্রিকেটের যুগে আমলা ছাড়া কে-ই বা করতেন?

প্রথার বাইরে কোন শট খেলতেন না, অথচ উইলোর ছোঁয়ায় বল মাঠের সব কোণেই পৌঁছে যেতো অদ্ভুত সাবলীলতায়। ক্রিস গেইলের মতো গায়ের জোর ছিল না, ডি ভিলিয়ার্সের মতো ক্ষিপ্রতা ছিল না, ছিল না কোহলীর খুনে আগ্রাসনও; অথচ আমলা যতোক্ষন ক্রিজে থাকতেন, রানের চাকা বনবন করে ঘুরতে থাকতো। বলটা লাল হোক কিংবা সাদা, বোলার স্টার্ক হোন কিংবা হেরাথ; মাঠটা দক্ষিণ আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া-কিংবা ভারত- যেখানেই হোক না কেন, আমলার ব্যাটের সাথে রানের স্পিডোমিটার ওপরেই উঠতেই থাকতো।

ধারাবাহিকতা কি, সেটির সংজ্ঞা বোঝাতে কেউ হাশিম আমলাকে দেখিয়ে দিতে পারেন। ওয়ানডেতে দ্রুততম সময়ে দুই, তিন, চার, পাঁচ এবং ছয়, সাত এবং আট হাজার রান সংগ্রহের রেকর্ডগুলো তার নামের পাশে, পেছনে ফেলেছেন ক্যারিবিয়ান গ্রেট স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস এবং সমসাময়িক বিরাট কোহলীকে। প্রথম আফ্রিকান ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরী করেছেন, প্রথম আফ্রিকান অধিনায়ক হিসেবে সেঞ্চুরী হাঁকিয়েছেন শ্রীলংকার বিপক্ষে।

২০১০ সালে একই পঞ্জিকাবর্ষে টেস্ট এবং ওয়ানডে দুই ঘরানার ক্রিকেটেই নামের পাশে যোগ করেছিলেন হাজারের বেশি করে রান। ফাফ ডু প্লেসির সাথে ২০১৫ বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে গড়া ২৪৭ রানের জুটিটা দক্ষিন আফ্রিকার হয়ে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানের জুটি। আগের বছরই ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ডি ভিলিয়ার্সকে নিয়ে গড়েছিলেন ৩০৮ রানের পার্টনারশীপ; চতুর্থ উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে যেটি সর্বোচ্চ।

আমলার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সাথে বাংলাদেশের নামও জড়িয়ে আছে। ৯ মার্চ ২০০৮, চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিপক্ষেই রঙিন জার্সিতে অভিষেক হয়েছিলো তাঁর। পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে আগমনটা একটু দেরীতে, আর তাই হয়তো এই ভার্সনের সব রেকর্ড নিজের নামে লিখিয়ে নিতেই মাঠে নামতেন তিনি।

দ্রুততম রান সংগ্রহের কথা তো বলা হলোই, সবচেয়ে কম ইনিংসে ১০, ১৫, ২০ এবং ২৫তম সেঞ্চুরীর রেকর্ড আমলার দখলে। বিদায় যখন বলছেন, তখন নামের পাশে ওয়ানডে সেঞ্চুরীর সংখ্যা ২৭টি; মাত্র ১৭৮ ইনিংসে। ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে সবগুলো টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে করেছেন সেঞ্চুরী।

ক্রিকেটটা একসময় ভদ্রলোকের খেলা ছিলো। বাজিকর, জুয়াড়ি- কমবেশী সব যুগেই ছিল খেলাটার আশেপাশে, কিন্ত খেলাটায় প্রাণ ছিলো। তারপর আইপিএল এলো, শ্রীনিবাসনের মতো লোকেরা আইসিসির গদিতে বসলেন। বিনোদন জগৎ আর ক্রিকেট মিলেমিশে ব্যাবসায় পরিণত হয়ে গেলো। এখন সবাই যুদ্ধাংদেহী মনোভাব নিয়ে মাঠে নামে, ব্যাটসম্যানদের একেকটা শটে যতটা না ক্রিকেট থাকে, তার চাইতে বেশী থাকে অর্থের ঝনঝনানি। ক্রিকেটে এখন খেলোয়াড় আছে, পারফর্মার আছে, ভুরি ভুরি স্টার আছেন; কিন্ত ভদ্রলোক? দু’চারজন যারা মুমূর্ষু অবস্থায় বেঁচে আছেন, তাঁদের মধ্যে হাশিম আমলাকেই সবার আগে চোখে পড়তো এতদিন।

নামের পাশে বিতর্ক নেই, কাউকে অসম্মান করে কিছু বলেছেন বলে দাবী করেনি কেউ আজ পর্যন্ত; ক্রিকেটারদের মোক্ষম অস্ত্র স্লেজিং শব্দটা তো আমলার অভিধানেই নেই। দারুণ একটা শট খেলেই বোলারের দিকে তেড়ে যাননা, তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেননা প্রতিপক্ষকে। তাঁর মধ্যে যেটা আছে সেটা পরিপূর্ণ বিনয়, প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা। ২০০৬ এর পর ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে ছাড়া বড় আকারের রানখরায় ভোগেননি কখনও। শেষটা ভালো হলো না, এই আক্ষেপটা নিশ্চয়ই বাকী জীবনটা একটু হলেও পোড়াবে তাকে।

ওয়ানডেতে প্রায় পঞ্চাশ গড়ে আট হাজারের বেশী রান, টেস্টে সেটা নয় হাজারের বেশি। গড় ছেচল্লিশ; সেঞ্চুরী ২৮, হাফসেঞ্চুরী করে ব্যাট উঁচিয়ে ধরেছেন ৪১ বার। ইনি হাশিম আমলা, যাঁকে ডিন জোন্স মজা করে টেরোরিস্ট ডেকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছিলেন। ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে মদ স্পর্শ করতেন না, জার্সিতে নেশাজাতীয় পানীয় প্রস্ততকারী প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার নিয়েও আপত্তি করেছিলেন। যার ব্যাটটা তুলি হয়ে সবুজ মাঠের বুকে মায়াবী আলপনা আঁকতো, আর কলম হয়ে রেকর্ডের পাতায় রেখে যাতো তার কীর্তিগুলোর স্বাক্ষর।

এখন তরুণ ক্রিকেটারেরা বিরাট কোহলী হতে চায়, গেইলের মতো মাঠের বাইরে নিতে চায় বল, কিংবা ভিলিয়ার্সের মতো বাহারী শটের ফুলকি ছোটানোর স্বপ্ন দেখে। তারা যতটা ক্রিকেটার হত চায়, তারচাইতে বেশী হতে চায় স্টার। আমলার মতো নিখুঁত টেকনিক বা অসাধারণ ফুটওয়ার্ক তাঁদের সিলেবাসের বাইরে পড়ে থাকে। আরেকজন হাশিম আমলার জন্যে ক্রিকেটের অপেক্ষাটা তাই দীর্ঘই হবে; আমাদের ভাগ্য ভালো, দর্শক হিসেবে এই প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানের নান্দনিক শটের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পেরেছি পুরোপুরি।

ক্রিকেট আপনাকে মিস করবে হাশিম আমলা, দারুণ একজন ব্যাটসম্যানের চেয়েও আপনার নিপাট ভদ্র স্বভাবটাকেই আমরা মিস করবো, আপনার মতো জেন্টলম্যান তো ক্রিকেট খুব বেশি পায়নি, ভবিষ্যতেও খুব একটা পাবে কিনা সন্দেহ আছে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button