তারুণ্যপিংক এন্ড ব্লু

আপনি ইন্ট্রোভার্টও না, এক্সট্রোভার্টও না। তাহলে?

কখনো ভেবে দেখেছেন, কিছু কিছু মানুষের সম্পর্কে যা ধারণা করা হয় পরে গিয়ে কেন মিলে না? উদাহরণ দেই। আপনি মানুষের সামনে খুব হাসিখুশি থাকেন বলেই মানুষ আপনাকে ভেবে নিলো, আহ মানুষটা কি দিলদরিয়া, মানুষটা খুব এক্সট্রোভার্ট। কিন্তু, আপনি ভেতরে ভেতরে উপলব্ধি করেন মানুষ আপনাকে যা ভাবে তা আপনি নন। মানুষের সামনে হয়ত কোনোরকমে মানিয়ে নেন, কিন্তু এত হাঙ্গামা আসলে আপনার পছন্দ নয়। আপনি আসলে নিজের ভুবনে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন, নিজস্ব সার্কেলে।

এমন হয় কেন? কিছু মানুষের ভেতর দ্বৈতসত্তা খুব প্রকট। মনের অভ্যন্তরে আর বাহিরের উপস্থাপনার একটা দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। মানুষ আপনাকে যতটা ইন্ট্রোভার্ট ভাবে, মনে করে উঁহু কি ভাব, আসলে আপনি তেমন নাও হতে পারেন। আপনিও যুতসই জায়গা পেলে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে এক্সপ্রেস করতে পারেন। এই যে দ্বৈত একটা বৈশিষ্ট্য নিয়ে মানুষ ঘুরে এটাকে তাহলে কি বলা যাবে? এই ধরণের মানুষগুলো আসলে এক্সট্রোভার্টও না, পুরোপুরি ইন্ট্রোভার্টও না। মাঝামাঝি একটা অবস্থান। এই মানুষগুলোকে বলা এমবিভার্ট! মজার ব্যাপার হলো, প্রচলিত একটা ধারণা আছে যে এক্সট্রোভার্টরা সেলস, কমিউনিকেশনে খুব ভাল হয়, কিন্তু গবেষণায় দেখা যায় উলটা চিত্র। ৩০০ সেলস পারসনের উপর গবেষণায় করে দেখা যায়, যারা ইন্ট্রোভার্ট এবং এক্সট্রোভার্টের মাঝামাঝি, অর্থাৎ এমবিভার্ট তারাই আসলে সেলস ডিপার্টমেন্টে সেরা!

হয়তো আপনার মধ্যেও থাকতে পারে এমবিভার্টদের বৈশিষ্ট্য। সেসব বৈশিষ্ট্যগুলো আসলেই আছে কিনা একটু মিলিয়ে দেখতেই পারেন!

১। নতুন নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হতে সমস্যা নেই, আপনার তবে সময় কাটানোর জন্য আপনি নিজের পুরোনো বন্ধুদের পাশে চান। তারা পাশে থাকলেই আপনি আড্ডা দিতে কমফোর্ট পান।

২। বাইরে যেতে আপনার ভালই লাগে তবে ঘরে ফেরাটা আপনার কাছে স্বস্তিদায়ক ব্যাপার। কোনো পার্টিতে যেতে আপনার সমস্যা নেই। যতক্ষণ ভাল লাগে নিজের মতো আনন্দ করেন। কিন্তু একটা সময় পর আপনি উপলব্ধি করেন, এনার্জি শেষ। আর জোর করে মজা না করে আপনি বাসায় ফিরে যাওয়াটাই প্রেফার করবেন।

৩। উইকেন্ডে নিজের মতো সময় কাটাতে ভাল লাগে, কিন্তু খুব বেশি একাকীত্বের মধ্যে থাকলেও অস্থির অস্থির লাগে। কোনো কোনো ছুটির সময়টায় সব প্ল্যান বাদ দিয়ে নিজের মতো পড়ে থাকেন। আবার কিছু ছুটিতে এমনও হয়, তিন দিনের জন্য ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন, নিজেই ট্যুর প্ল্যান করলেন এবং কয়েকটা সুন্দর দিন কাটিয়ে আসার জন্য যা যা করা দরকার সব আপনিই করছেন।

৪। এমবিভার্টরা খুব দ্রুত পরিস্থিতি পড়তে পারে। তারা ভেতরে যেমনই হোক, দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে পরিস্থিতির সাথে। আপনি প্রোফেশনাল লাইফে একদমই সেখানকার মতো চলেন, সেখানে পেশার খাতিরে নিজের রঙ বদলাতে সমস্যা হয় না। কিন্তু, নিজের বন্ধুদের সামনে আপনি আবার আলাদা, একদম রিয়েল, যা আপনি সেটাই হয়ে যান তখন।

৫। এমবিভার্টরা সব বিষয় নিয়ে কথা বলে না। যখন নিজের পছন্দের টপিক আপনি পান, আপনি সেই সময়ে নিজের মতামত বলেন, গল্প করেন। যখন টপিক ঘুরে যায়, আপনি চুপচাপ বসে কথা শুনতেই পছন্দ করেন। নিজেকে অযথা জাহির করার চেষ্টা থাকে না।

৬। আপনি খেয়াল করবেন ইন্ট্রোভার্টদের নিয়ে কোনো লেখা পড়লে আপনি মিল খুঁজে পান, কিন্তু একই সাথে আপনার মধ্যে এক্সট্রোভার্ট হওয়ারও গুণাবলী থাকে। আপনি অন্তর্মুখী হয়েও বাইরের জগতকে খুব বেশি অপছন্দ করেন না। দুইটার ব্যালেন্স করেই চলে আপনার জীবন।

৭। আপনি খুব সহজে কোনো কিছুর প্রতি বিরক্ত হতেই পারেন। ভীষণ সেনসিটিভ একটা মন আপনার। কিন্তু, একই সাথে কোনো কিছুর প্রতি সহজে আগ্রহীও হয়ে যান। একদম একা থাকতে যেমন ভাল লাগে, আবার কখনো কখনো একাকীত্ব ছুঁড়ে ফেলে প্রোডাক্টিভ কোনো কাজ করার প্রতি আপনার মধ্যে তাড়না কাজ করে।

৮। আপনি বেশিরভাগ সময়ে বুঝতে পারেন কখন কী বলা উচিত। শুধু সবার সাথে মিশতে পারেন এজন্যে এমন না আপনি খুব লেইম লেইম কথাবার্তা বলেন। কখন কী বলা উচিত, বলার আগে সেটা ভেবেই বলেন। তবে, মাঝে মধ্যে একদম অবচেতন মনের প্রভাবে দুই একটা অর্থহীন কথাও আপনি বলে ফেলেন। এটা হয় কারণ, মানুষের ভেতরে কিছু অর্থহীন কথা বা চিন্তা জমা হয়েই থাকে। সেগুলো কোনো না কোনো ভাবে প্রকাশ হয়েই যায়। ইন্ট্রোভার্টরা প্রাণপণ চেষ্টা করে, এগুলো এড়াতে, এক্সট্রোভার্টরা ভাবেই না একদম কে কি মনে করলো কোন কথায়। আপনি দুইটার মধ্যবর্তী বলেই এমন হয়।

৯। খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এমবিভার্টরা আসলে বন্ধু হিসেবে বেশ ভাল। ধরেন, আপনার পাশে এমন কেউ আছে যে অনেক কথা বলে, চিৎকার চেঁচামেচি করছে, আপনি সেই শোরগোলে যুক্ত না হয়ে চুপচাপ থাকবেন বেশিরভাগ সময়ে। আবার যদি আপনার পাশে খুব শান্ত, নীরব, কথা একেবারেই কম বলে এমন কেউ থাকে আপনি কথা বলে তাকে সঙ্গ দেয়ার চেষ্টা করেন। এজন্যে এমবিভার্টরা ভাল বন্ধু হতে পারে।

১০। ইন্ট্রোভার্টরা চুপচাপ সব কিছু দেখে, পর্যবেক্ষণ করে যায়, কিছুই বলে না। আবার এক্সট্রোভার্টরা এত কিছু সচেতনভাবে খেয়াল করে না, সব সময় কিছু না কিছু নিয়ে মেতে থাকে। এই জায়গাতেই এমবিভার্টরা আলাদা। এই মানুষগুলো আশ্চর্যজনকভাবে ব্যালেন্স করতে পারে, তারা পর্যবেক্ষণ যেমন করে যেতে পারে চুপচাপ, আবার তার পাশাপাশি যখন কোনো কিছুতে অংশগ্রহণ করা দরকার সেখানে থাকেন এরা। ফলে, তারা অনেক কিছু খেয়াল যেমন করতে পারে, আবার অভিজ্ঞতার ঝুলিও এদের সমৃদ্ধ! এ কারণেই এমভিবার্টরা সেরা!

তবে এত ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের মধ্যেও হতাশা আছে। কারণ, এমবিভার্টরা কোনো কোনো সময় ভীষণ দোটানায় ভুগেন। দ্বিধাদ্বন্দ্বের জীবনে কী উচিত, কী করা দরকার, কোনো কিছু কী ভুল হয়ে যাচ্ছে এসব চিন্তায় এমবিভার্টদেরও নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় কখনো! তবুও এমভিবার্টরা সবার কথা ভেবে সব কিছুর ব্যালেন্স করতে চেষ্টা করে, হয়ত এতে নিজেরও খানিকটা ক্ষতি হয়ে যায়, তবুও…

আরও পড়ুন-

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button