রিডিং রুমলেখালেখি

ডিপ্রেসড এই জাতির জন্য একজন আলকেস ভাই চাই!

আলকেস ভাই নামক জনৈক হকার আমাদের গ্রামের বাজারে প্রায় বসতেন। লাল শালুক কাপড়ে ঘেরা ছোট্ট একটা গন্ডির মধ্যে থাকত নানা ধরণের ঔষুধি গাছের ছালবাকল ও গুঁড়ো। সবচেয়ে আকর্ষনীয় যে জিনিসটা থাকত সেটা কাঠের তৈরি। পরপর তিনটি ডামি হিউম্যান পেনিস। একটা আঁকারে বড়, কিছু একটা মেখে রাখায় সেটা হ্যাজাক লাইটের আলোয় চকচক করত। মানুষের চোখকে খুব সহজেই আকর্ষন করত। আরেকটা ছোট, অনেক ছোট। একটা ছিল ত্যাড়া বাঁকা এবং বিশ্রী। যেটা বড় এবং দেখতে সুশ্রী, সবার লক্ষ্য থাকত সেখানে।

আলকেস ভাই উচ্চস্বরে ভুলভাল ছন্দে ছড়া কাটে…

তিল তিশি তালখাখনা
খায় জোয়ানা হয় মর্দনা
চেংড়া খায়, চেংড়ি দেখে
রাজা বাদশা বিয়ে করে
তিনটা করে নিকাহ করে

ছন্দের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো কাঠের ডামি যন্ত্র। বয়স্ক এবং পৌঢ় লোকদের নজর ডামিতে। তাদের জীবনের সমস্ত লেনদেন সেখানে এসেই শেষ হয়। আলকেস ভাইয়ের ছন্দ আর বাকপটুতায় তারা মুগ্ধ হয়। মনের অন্তঃস্থ কুটিরে কাঠের টুকরোর মত হবার সুতীব্র বাসনা জেগে ওঠে। একটা সময় তিলতিশির মিশ্রণ আর বিষাক্ত পারদে মেশা মাদক নামক বিচিত্র জিনিস খেয়ে তারা ঘরে ফেরে। আলকেস ভাইয়ের ঔষুধি মিশ্রণের দাম মাত্র দশ টাকা।

হাট ভেঙে যায়। রাত্রী অন্ধকার হয়। আলকেস ভাইয়ের দোকানে ভিড় কমে না। আমাদের মত ছেলেপুলেরা বড়দের ভেতরে অতিকষ্টে মাথা ঢুকিয়ে নিষিদ্ধ পৃথিবীর সাথে পরিচত হই। আমরা হাত বাড়াই। যেহেতু বয়স আট-দশ, তাই আমাদের বিষাক্ত পারদমিশ্রিত মাদক দেওয়া হয় না। আমরা ভাঙা মন নিয়ে ঘরে ফিরি। আরেক হাট আসবে। আমরা আলকেস ভাইয়ের দোকানে ভিড় করব, নিস্তরঙ্গ জীবনে অল্পসময় ঢেউ উঠবে। এভাবেই জীবন চলে যায়।

একটা সময় বড় হই। আলকেস ভাইয়ের মিথ্যা আশ্বাসের প্রতি সুতীব্র ঘৃণা জেগে ওঠে। মার্কারি (পারদ) যে মানুষের জন্য ভয়ানক একটি মৌল, সে কথা মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। কিন্তু আলকেস ভাইয়ের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন ভালো লাগা কাজ করে। সেটা হতে পারে নিষিদ্ধ জিনিসকে আকর্ষনীয় করে তোলা কিংবা গ্রামের মানুষগুলোর নির্মোহ এবং নিরানন্দ জীবনে সামান্য আনন্দ হয়ে প্রতি হাটবারে দীর্ঘ সময় ক্যানভাসিং করা।

মেডিকেল কলেজে ঢুকে আমি প্রথম যে জিনিসটা দেখে ভাবতে শুরু করলাম সেটা হল সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্ট। গাইনী, ইন্টার্নাল মেডিসিন এবং স্কিন বহির্বিভাগে শত শত রোগী আসে, অথচ সাইকিয়াট্রি বহির্বিভাগে কেউ নেই। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা অপেক্ষায় থাকেন। মাত্র দশ টাকার টিকেটে লোকজন আসবে, সেবা নিবে সেই অপেক্ষা বসে থাকেন। মানুষ আসে না। সাইকিয়াট্রি ব্যাপারটায় একটা ট্যাবু আছে। সাইকিয়াট্রি মানেই পাগলের ডাক্তার। মাথার সিট খারাপ হলে সেখানে যেতে হয়। দুশ্চিন্তা হলে, ভাল না লাগলে সেখানে যেতে নেই। দুই সন্তান নীতি আমরা প্রত্যেকের মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দিতে পারলেও সাইকিয়াট্রিক ট্রিটমেন্ট মানুষের লাগবে- সেটা এখনো ঢুকিয়ে দিতে পারিনি।

অনেক কারণেই এমন হতে পারে। ইনবক্সে অনেকেই ঢাকা শহরের সাইকিয়াট্রিক স্পেশালিস্টের নাম চান। আমি ঢাকা শহরে অপরিচিত কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় কয়েকজন ডাক্তারের নাম বলি। তারা যান কিন্তু বিরক্ত হয়ে ফিরে আসেন। শেষজন এসে আমাকে বললেন, ডাক্তার তাকে অপমান করেছে। কীভাবে অপমান করেছে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উত্তর পাবার পর আমার মত নিরীহ লোকের মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল। তখন মনে হয়েছিল আমাদের এমন কিছু মানুষের দরকার যারা নিরানন্দ এবং হতাশার জীবনে অল্পসময় হলেও আমাদের মুগ্ধ করে রাখবে। তারা হয়তো অভিনয় করবে না। বেসুরো গলায়, ভুলভাল ছন্দে ছন্দও বলবে না। কিন্তু এমনভাবে কথা বলবে যেন রোগটা শুধু মানুষটার নয়, এখন তারও। একজন রোগী আর একজন ডাক্তার একই সাথে পাড়ি দিবে ভয়ংকর রোগটির সাথে।

বয়স বাড়ে। যৌক্তিক দিক আর বাস্তবতা বুঝিয়ে দেয় সেটাও অসম্ভব। তখন অবাস্তব চিন্তা মাথায় আসে। অলস বিকেলে ভাবতে বসি, আলকেস ভাইদের মত মানুষদের নিয়ে সারাদেশে অনেকগুলো বুথ করে ফেলা যায়। সিনেমা হলের মত। মানুষজন চরম দুর্দশার সময় সেখানে যাবে। আলকেস ভাইরা সবাইকে একসাথে বসিয়ে ঘন্টাখানেক বিনোদিত করবে। তাদের বাকপটুতায় মুগ্ধ রাখবে চরম হতাশাগ্রস্থ মানুষদের। যে মানুষ গ্রামের নিরানন্দ ও ক্ষয়িঞ্চু বৃদ্ধকে কাঠের ডামি পেনিসের স্বপ্ন দেখিয়ে পারদের মত বিষাক্ত জিনিস খাইয়ে ফেলতে পারে নির্দ্বিধায়, সেই মানুষ একজন হতাশাগ্রস্থ মানুষকেও স্বপ্ন দেখাতে পারে নতুন করে বাঁচবার। দরকার শুধু একটু ট্রেনিং। আলকেস ভাইয়ের শো শেষে মানুষ ঘরে ফিরবে। চন্দ্ররাতের গভীরতা বাড়বে। নিভু নিভু চন্দ্রের ক্ষীয়মাণ আলোয় এলোমেলো পথ হাঁটতে হাঁটতে মানুষের মনে সুতীব্র বাসনা জাগবে, লোভ ধরবে- হতাশা কাটিয়ে একটি আনন্দময় জীবন যাপন করবার।

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button