খেলা ও ধুলা

‘অ্যালিস’ ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড!

বিপিএলে অভিষেক ম্যাচ, নার্ভাসনেস তো ছিলই। সেই নার্ভাসনেসেই কিনা, পরপর দুই বলে দুটো ক্যাচ ছাড়লেন, তাও ‘ডালভাত’ টাইপের ক্যাচ! এরপরে আরও একটা ক্যাচ হাত ফসকেছে। দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে যাওয়া ম্যাচটাতেই আবার দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক, মোট চার উইকেট! ঢাকা ডায়নামাইটসের অধিনায়ক সাকিব আবার শেষ ওভারটায় বল তুলে দিলেন তার হাতে, প্রথম দুই বলে দুটো চার হজমের পরে আবার ফিরে আসা, দলকে জেতানো- এত উত্থান-পতন অ্যালিস ইসলাম নিজের জীবনেও দেখেছেন কিনা সন্দেহ! বিশ ওভারের একটা ম্যাচেই ভাগ্য তাকে যে পরিমাণ রংবদল দেখালো, এরপরে তিনি বলতেই পারেন- ‘ক্রিকেট, ইউ আর অ্যা ফাকিং বিউটি!’

গতকালের আগে অ্যালিস ইসলামের নামটা তার পরিচিতদের বাইরে মেরেকেটে বাংলাদেশের শ’দুয়েক মানুষও জানতেন কিনা সন্দেহ। সন্ধ্যার আগে সেই অ্যালিসই কিনা টক অফ দ্য টাউনে পরিণত করলেন নিজেকে! অবাক হয়েছে সবাই, এমনকি বিপিএল কাভার করা সাংবাদিকদের অনেকেও প্রকাশ করেছেন বিস্ময়। অ্যালিসকে নিয়ে যে জানাশোনা ছিল না তাদের অনেকেরই! বিপিএলে অভিষেক হলো গতকাল, সুনীল নারাইনের হাত থেকে ক্যাপটা নিলেন। অ্যালিস তখন নিজেই ভাবেননি যে, পুরো ম্যাচের সবটুকু আলো কেড়ে নিতে যাচ্ছেন তিনি!

সাভারের বলিয়াপুরে জন্ম নেয়া অ্যালিসের ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসাটা কৈশর থেকেই। কলাবাগান গ্রিন ক্রিসেন্ট ক্লাবের হয়ে শুরু, সেখান থেকে জায়গা হয়েছিল প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে। সেখান থেকে প্রথম বিভাগ, শাইনপুকুর হোল্ডিংসের হয়ে। খালেদ মাহমুদ আবার সেই দলের কোচ। ঢাকা ডায়নামাইটসের সঙ্গেও জড়িত তিনি। তার মাধ্যমেই ঢাকার নেট প্র‍্যাকটিসে আগমন অ্যালিসের। বাকিটা তো ইতিহাস!

ছিলেন ঢাকা ডায়নামাইটসের নেট বোলার। বিপিএলে খেলবেন, এই স্বপ্ন তো ছিলই। কিন্ত সেটা এভাবে পূরণ হয়ে যাবে, অভিষেক এমন দারুণভাবে রাঙাবেন- এতকিছু কল্পনার সীমানাতেও ছিল না। আগের দিনই ইঙ্গিত পেয়েছিলেন, দলে জায়গা পেতে পারেন তিনি। বলা হয়েছিল, শারিরীক আর মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে। কিন্ত প্রস্তত হতে চাইলেই কি আর হওয়া যায়? গতকাল ছুটির দিনে শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছিল পঁচিশ হাজার দর্শক, এত মানুষের সামনে জীবনে কোনদিন খেলেননি অ্যালিস- তাই নার্ভাসনেস তো কাজ করছিলোই!

শুভাগত হোমের এক ওভারেই শর্ট ফাইন লেগে দাঁড়িয়ে পরপর দুই বলে দুটো ক্যাচ ছাড়লেন অ্যালিস, দুবারই ব্যাটসম্যান ছিলেন মোহাম্মদ মিথুন। সেগুলোও এমন লোপ্পা ক্যাচ ছিল যে, মিস করতে দেখে হাসিই পেয়েছে। এক বন্ধুর সাথে খেলা দেখছিলাম, আজই অ্যালিসের বিপিএল অভিষেক হয়েছে শুনে তার মন্তব্য ছিল- ক্যারিয়ার তাহলে আজকেই শেষ এই ছেলের! এই মন্তব্যের খানিক পরে আরও একটা ক্যাচ মিস করেছেন অ্যালিস!

তবে জাদু দেখানো শুরু করেছেন এরপরেই। খুলনাকে তখন জয়ের বন্দরে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন রুশো আর মিথুন, দুজনের জুটিটা লম্বা হচ্ছে ক্রমশ। তখনই রুশোকে বোকা বানিয়ে স্ট্যাম্পিঙের ফাঁদে ফেললেন তিনি, ঢাকাও ফিরলো ম্যাচে। আর আঠারোতম ওভারে যেটা করলেন, সেটাকে তো অবিশ্বাস্য বললেও বোধহয় কম বলা হয়! পরপর তিন বলে তুলে নিলেন মিথুন, মাশরাফি আর ফরহাদ রেজার উইকেট, হ্যাটট্রিক! ম্যাচটাকে তখন ঢাকার দিকে টেনে নিয়ে এসেছেন অ্যালিস একাই!

শেষ ওভারের সমীকরণ মেটাতেও সাকিব বেছে নিলেন অ্যালিসকেই, তার হাতে তুলে দিলেন বল। হ্যাটট্রিক হিরো-কে পরপর দুটো চারে স্বাগতম জানালেন শফিউল, খুলনার জয়ের জন্যে তখন চার বলে ছয়টা রান লাগে। সেই রানটাই আর করতে দিলেন না অ্যালিস। শেষ চার বলে দিলেন মাত্র তিন রান, শেষ বলটা যেভাবে মাথা খাটিয়ে বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যাটসম্যানের পায়ের ওপরে ফেলেছেন, সেটা দেখেই অদ্ভুত একটা মানসিক শান্তি পাওয়া গেল! এমন পারফরম্যান্সের দিনে অ্যালিস ছাড়া আর কাকেই বা ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার দেয়া যায়?

গতকালও তার নাম কেউ জানতো না, আজ সবার মুখে মুখে অ্যালিসের কথা, গুগলে সার্চ দিলেই একশো একটা আর্টিকেল তাকে নিয়ে- জীবন এভাবেই বদলে যায়, মূহুর্তের ব্যবধানে! বদলে দেয়ার চাবিকাঠিটা নিজের হাতে, অ্যালিস সেটা প্রমাণ করেছেন। রবার্ট ব্রুস সাতবারের হারে থেমে যাননি, অ্যালিসও তিনটা ক্যাচ মিস করে নিজেকে দমে যেতে দেননি, ফিরে এসেছেন দুর্বার গতিতে, ধ্বংসস্তুপ থেকে উড়েছেন ফিনিক্স পাখির মতো। ক্রিকেট নামের ওয়ান্ডারল্যান্ডে ‘অ্যালিস’-এর আগমনটা তাই স্মরণীয় হয়েই রইলো!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button