ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

সেই আল নাহিয়ান খান জয় এখন ছাত্রলীগের সভাপতি!

প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরের বেশি সময় আগের কথা। ২০১৪ সাল, জানুয়ারি মাস।

সেই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে চার শিক্ষার্থীকে মারধোর করা হয়। কেন করা হয়? ‘শিবির’ সন্দেহে।

হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হলের ছাদে চার শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে পেটানোর কাজটি করেন। রড ও স্ট্যাম্প দিয়ে এমন বর্বরের মতো মারা হয়, যে সেই শিক্ষার্থীদের আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করতে হয়েছিল।

আপনি জেনে অবাক হবেন, ‘শিবির’ সন্দেহে চার শিক্ষার্থীকে মারধরের সেই ঘটনার নেতৃত্বে অন্যতম ছিলেন আল নাহিয়ান খান জয়।

সমকালে ২০১৪ সালে প্রকাশিত সেই খবরের অনলাইন সংস্করণ

সেই আল নাহিয়ান খান জয়ই এখন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন!

আল নাহিয়ান খান জয় ২০১৪ সালে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি এই মারধোরের ঘটনায় সাংবাদিকদের বলেছিলেন,

“প্রথমে সন্দেহভাজন হিসেবে রাকিবকে আটক করার পর তার মোবাইল ফোন থেকে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এলাকায় খোঁজ নিয়ে তাদের শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে।”

অর্থাৎ, তার ভাষ্যনুসারে ‘শিবির’ হলেই পিটানো জায়েজ। তিনি সেই দায়িত্ব তাই উৎসাহ নিয়ে পালন করেছিলেন। ‘শিবির’ সন্দেহে যে কাউকে যে পেটানো যায়, এই ট্রেন্ডের অংশীদার আসলে তিনিও।

সেইদিনের নিপীড়নকারী জয় এখন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতির পদে। জয় এমনিতে মেধাবী বলে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তিনি ১৬তম হয়েছিলেন। আবার ২০১৫ সালে হরতালের সময় ককটেলধারী ধরিয়ে ডিএমপির পুরষ্কারও পেয়েছিলেন।

কিন্তু, নিজেই আইন হাতে তুলে নেয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধেই। শিবির সন্দেহে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা বা মারার এখতিয়ার কি তাকে সংগঠন দিয়েছিল নাকি স্বেচ্ছায় করেছিলেন?

আল নাহিয়ান খান জয়
আল নাহিয়ান খান জয় বক্তব্যরত মুহুর্তে

এখন আল নাহিয়ান খান জয়, সংগঠনের সভাপতি। আবরার হত্যার পর একাত্তর টেলিভিশনে তাকে এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে সাক্ষাৎকার দিতে দেখলাম।

উপস্থাপক জিজ্ঞেস করলেন, ছাত্রলীগ কারো গায়ে হাত তুলতে পারে কিনা?

আল নাহিয়ান খান জয় জবাব দেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কখনোই কাউকে মারধোরের নির্দেশনা দেয় না।

প্রশ্ন করা হয়, ভিন্নমত থাকবে, মত দ্বিমত থাকবে। তাই বলে সমালোচনা কেউ করলে তাকে মারতে হবে?

জয় জবাব দিয়েছেন এরকম যে, ছাত্রলীগ কাউকে পেটায় না। ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করে। কেউ বিশৃঙ্খলা করলে প্রতিহত করে।

আল নাহিয়ান জয়কে শেষ প্রশ্ন করা হয়, প্রতিহত করা দায়িত্ব বলছেন। যদি কেউ শিবির করেও তাকে আপনি জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন কিনা?

আল নাহিয়ান খান জয় এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদ করার এখতিয়ার তাদের নেই৷ কিন্তু কেউ বিশৃঙ্খলা করলে তাকে বোঝানোর দায়িত্ব আমাদের আছে।

আবরার
নিহত আবরার

ছাত্রলীগের প্রেস রিলিজ দেয়া হয়েছে। আবরার হত্যাকান্ডে অভিযুক্তদের সংগঠন থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। ছাত্রলীগ বলছে, আল নাহিয়ান খান জয়রা বলছেন, দায় সংগঠন নেবে না। একই সাথে আবার স্বীকার করছেন, জিজ্ঞাসাবাদ করা, পেটানো তাদের অধিকারে নেই।

তাহলে, প্রশ্ন হলো সাড়ে পাঁচ বছর আগে আল নাহিয়ান খান জয় নিজে যে পিটানোর কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জাতীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন আছে, সেই সময় তাকে পেটানোর অধিকার কে দিয়েছিল?

সেই সময় ছাত্রলীগ জয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় নি। কারণ, ঘটনাটি ভাইরাল হয়নি। ভাইরাল না হলে বিচার, বহিষ্কার, তদন্ত- এসব নাটকও হয় না। তখন আল নাহিয়ান খান জয়কে সংগঠন থেকে শৃঙখলা-ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করা হলে, আজকে অন্তত একটা দৃষ্টান্ত সামনে থাকত।

আল নাহিয়ান খান জয়রা এভাবে কালের পর কাল পার পেয়ে যায় বলে, কাউকে ট্যাগ দিয়ে মারাটাকে জায়েজ করে ফেলে বলেই আবরারদের খুনের রাস্তা তৈরি হয়।

আল নাহিয়ান খান জয়, ভেবে দেখুন, আবরার হত্যার পথ তৈরিতে কি আপনারও ভূমিকা নেই? আপনারা আবার বলেন, সংগঠন দায় নেবে না! সংগঠন দায় নেয় না বলে, আপনারা পার পেয়ে যান বলেই আবরারদের খুন হতে হয়…

তথ্যসূত্র – সমকাল ( ২২ জানুয়ারি, ২০১৪)

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button